দ্য ওয়াল ব্যুরো: সাধারণ মানুষের আরও সাধারণ জীবনে কখনও কখনও বাঁচার মাধ্যম হয়ে ওঠে শিল্প এবং শিল্পচর্চা। জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে গান, কবিতা, সিনেমা, ছবি সবকিছুরই ভূমিকা বিশাল। করোনা সংক্রমণে কারণে বিশ্বজুড়ে জারি হওয়া লকডাউন পর্বেও দেখা যাচ্ছে, একঘেয়ে জীবনে মুক্তির স্বাদ আনতে সেই শিল্পচর্চাই ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তবে ইতিহাস বলছে, এমনটা নতুন নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে যতবার মহামারী এসেছে, শিল্পচর্চায় মানুষ ততই মন দিয়েছে। আর সেই সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিল্পেও ঘটেছে সার্বিক উন্নতি।
ঠিক যেমনটা ঘটেছিল বিশ্বের অন্যতম ভয়ঙ্কর মহামারী প্লেগের ক্ষেত্রে।
দেখা যায়, সে সময়ে কখনও ধর্মীয় ভাবাবেগ থেকে, আবার কখনও সমকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকেই শিল্পীদের তুলি কথা বলে উঠেছিল যেন। সময়টা চতুর্দশ শতক। শিল্পে নবজাগরণের প্রাক্কালে ইউরোপে প্লেগ দেখা দিল মহামারী হয়ে। লাখ লাখ মানুষ মারা যেতে শুরু করল। অজানা শিল্পীদের আঁকা ছবিতে ফুটিয়ে তোলা হল প্লেগ সম্পর্কে সচেতনতার গল্প, যাতে লেখাপড়া না জানা মানুষেরও বুঝতে অসুবিধা না হয়। কোনও ছবিতে শয়তানের হাতে তির, সামনে মৃত মানুষের ভিড়। তিরগুলি আসলে সেই ভয়াবহ রোগের ইঙ্গিত। রূপকের মাধ্যমে বলে দেওয়া হল একটি গল্প। মানুষের বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হল সেই রূপক।

ছবিটি পরে বিখ্যাত হয়ে ওঠে বিশ্বশিল্পের দরবারে। এ ছবি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে শিল্প বিশারদ মার্শাল জানান, এই ছবির রূপকটি কেবল কোনও সম্প্রদায়ের ছিল না, বরং গোটা বিশ্বের ধ্বংসের কথা বলেছিল।
তবে শুধু অসুখ নয়, প্লেগ ছিল শাস্তিও। সে সময়ে বহু অপরাধীকে শাস্তি স্বরূপ প্লেগ উপহার দেওয়া হতো কারাগারে। শিল্পীর চেতনায় ফুটে উঠল কারাগারে তিন জন প্লেগ আক্রান্তের ছবি। যাদের ক্ষত চাটছে কিছু কুকুর। তৎকালীন ইতিহাসের দলিল এই শিল্পকর্ম।

আবার কখনও শিল্পীর নিজস্ব চেতনাতে ফুটে ওঠা মহামারীর ভয়াবহতার ছবিও পাওয়া যায়। যেমন ১৬ শতকে শিল্পী মারক্যান্টনিও রাইমন্ডির আঁকা ছবি। প্লেগের যন্ত্রণা ফুটে উঠেছে সেই ছবিতে। মার্কিন শিল্প বিশেষজ্ঞ শিলা বারকারের মতে এই ছবিতে মানবিকতার ইঙ্গিত মেলে। ছবিটি দেখলে দর্শকও যেন সমব্যথী হয়।

প্লেগকে মৃত্যুদূত হিসেবে দেখাচ্ছেন আরও এক শিল্পী আরনল্ড বোকলিন। তাঁর ছবি নাম “প্লেগ”। এক ভয়াবহ দূত হিসেবে সেই ছবিতে চিত্রায়িত হয়েছে প্লেগ। ততদিনে অবশ্য শিল্প তাঁর নিজের ছন্দেই অনেকটা পথে এগিয়ে গেছে। ১৬৩০ পরবর্তী ইতালির প্লেগের ছবি এঁকেছেন নিকোলাস পৌসিন। এটিও শুধু নিছক ছবি না, বরং প্লেগের সেই যন্ত্রণা ফুটে উঠেছে গোটা চিত্রে। সেই সঙ্গে আছে তাঁর সাথে লড়াই করার ইঙ্গিত।
আবার জাপানি শিল্পী সুকিওকা ইয়োশিতশির ছবিতে মেলে প্রত্যয়ের কথা। ১৮৯২ সালের জাপানের প্লেগের চিত্র। একজন যোদ্ধাকে খুঁজে পাওয়া যায় সেখানে যে মহামারীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত।

এখন আরও এক মহামারী কাল এশেছে পৃথিবীতে। সকলে ঘরবন্দি। মানসিক অবসাদ কাটাতে কমবেশি সকলেই শিল্পের দ্বারস্থ। কেউ গাইছেন গান, কেউ আঁকছেন ছবি। নানা সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়াল জুড়ে। পৃথিবীর ইতিহাসে প্যান্ডেমিক যেমন নতুন নয়, তেমনই মহামারীকালে এই শিল্পচর্চার ঘটনাও নতুন না।
১৯১৮ সালে যেমন এসেছিল সবচেয়ে ভয়াবহ স্প্যানিশ ফ্লু। আক্রান্ত হয়েলেন শিল্পী এডভার্ড মুঞ্চ। গৃহবন্দি দশায় অসুস্থ শিল্পী এঁকেছিলেন নিজের পোর্ট্রেট। ছবিতে ফুটে ওঠে তাঁর যন্ত্রনা, ক্লান্তি, একাকীত্ব। সাথে গোটা অনুভুতি প্রকাশ পায় অদ্ভুত রঙের বিন্ন্যাসে।

নিজের ছবি দিয়ে রোগের যন্ত্রণা তুলে ধরেছেন আরও এক শিল্পী। নাম ডেভিড ওজনারোউইচ। তিনি নিজেকে পুঁতে দেন কবরে! বাস্তবে নয়, ছবিতে। একই সময়ে সেই ফ্লু-র যন্ত্রণার, ভয়াবহতার কথা বললেন আরও একজন। এগোন শিলি, ছবির নাম “পরিবার”। একটি পরিবারের যন্ত্রণার গল্প ছিল সেই ছবিতে।

আজকের সময়ে পৌঁছে এই ছবিগুলি যেন সে সময়ের কথা বলে। কে বলতে পারে, সাম্প্রতিক শিল্পচর্চাও কখনও হয়তো ইতিহাসের পাতায় এই সময়টার প্রতিনিধিত্ব করবে!