
শেষ আপডেট: 24 February 2023 05:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিলিংসের আকাশে সাদা গোল বলের মতো জিনিসটা আগেই দেখেছিলেন মার্কিন গোয়েন্দারা। আকাশ পরিষ্কার, ঝলমলে রোদ। সাদা মেঘের মধ্যে থেকে বেলুনটা আলাদা করা মুশকিল হয়ে যাচ্ছিল। গোলাকার বস্তুটা বেলুনই তো? বার বার কন্ট্রোল রুমে ফোন করে সতর্ক করা হচ্ছিল। নজরদারি চালানোর শতাব্দী প্রাচীন এই অস্ত্রের (spy balloon) কথা অজানা নয়। আমেরিকার আকাশে সেই নজরদারি অস্ত্রই কি উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে, সন্দেহটা আরও গাঢ় হচ্ছিল।

বিলিংস বিমানবন্দরের উপরে ৫০ মাইল রেডিয়াসের মধ্যেই ছিল সেই বেলুনের মতো বস্তুটা। বিমান ওঠানামা থামিয়ে দিয়েছিল এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল। কিছুক্ষণ পরে দেখা গিয়েছিল, বেলুনটা ভাসতে ভাসতে আমেরিকার পারমানবিক কেন্দ্রগুলোর কাছাকাছি হাজির হয়েছে। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের লোকজন প্রথমে মনে করেছিলেন ইউএফও (UFO) বা ভিনগ্রহীদের যান। পরে ভাবগতিক দেখে ধারণা বদলে যায়। পেন্টাগন বিবৃতি দেয়, কোনও ভিনগ্রহীর যান নয়, চিনের তৈরি গুপ্তচর বেলুন (spy balloon) আমেরিকার স্পর্শকাতর এলাকাগুলোর উপর দিয়ে উড়ছে। পারমানবিক কেন্দ্রগুলোতে নজরদারি চালানোর চেষ্টা করছে।
বেলুনটিকে গুলি করে নামায় মার্কিন সেনা। কীভাবে আকাশসীমার নিয়মকানুন লঙ্ঘন করে আমেরিকায় ঢুকে নজরদারি চালাতে পারে চিনা গুপ্তচর বেলুন সে প্রশ্ন উঠতেই বেজিং বিবৃতি দিয়ে জানায়, আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি জানতে ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজেই বেলুনটিকে ওড়ানো হয়েছিল। তারা দুঃখিত যে সেটি আমেরিকার সামরিক কেন্দ্রগুলোর কাছাকাছি চলে গেছে। চিনের সাফাই বিশ্বাসযোগ্য না হলেও, মার্কিন গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বিলক্ষণ বুঝেছিলেন, নজরদারির জন্য সেই সুপ্রাচীন কৌশলই প্রয়োগ করার চেষ্টা করছে চিন। অতএব অনেক বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নজরদারির জন্য অনেক আধুনিক এরিয়াল ভেহিকল তৈরি হয়েছে, ড্রোন তো আছেই, এমনকি স্যাটেলাইটও আকাশে বসে চুপিচুপি নজরদারি চালাতে পারে। তাহলে বেলুন কেন? তার আগে জানতে হবে এই গুপ্তচর বেলুন আসলে কী, এর একটা লম্বা ইতিহাসও আছে।
গুপ্তচর বেলুন (spy balloon) কী?
হিলিয়াম গ্যাসে ভরা বেলুন যা চলে সৌরশক্তিতে। খুব কায়দা করে বেলুনে সৌর প্যানেল জুড়ে দেওয়া হয় যা বেলুনকে ওড়ার শক্তি জোগায়। আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি জানতে একটা সময় বেলুনকে কাজে লাগাতেন আবহাওয়াবিজ্ঞানীরা, এখনও তা হয় বটে, কিন্তু বেলুন দিয়ে যে গুপ্তচরবৃত্তিও করা যায় তার ধারণা বহুকাল আগেই মানুষের মাথায় এসেছিল।

সার্ভিল্যান্স স্যাটেলাইট, ড্রোন, এরিয়াল ভেহিকল আবিষ্কার হওয়ার বহু বছর আগে এমন গ্যাসে ভরা বেলুনই ছিল নজরদারি চালানোর অন্যতম উপায়। ইচ্ছামতো বেলুনকে উপরে ওঠানো বা নীচে নামানো যায়। খুব কাছ দিয়ে উড়ে খবর জোগার করা একেবারেই কঠিন কাজ নয়। এখনকার সময়ও বেলুনকে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্য একই আছে। শুধু তার পদ্ধতি আর প্রযুক্তি বদলেছে। এখনকার গুপ্তচর বেলুন (Spy Balloon) অনেক বেশি আধুনিক।
এতে সেন্সর, রেডার লাগানো আছে। হাই-রেজোলিউশন ক্য়ামেরা ফিট করা থাকে বেলুনের সঙ্গে যা পরিষ্কার, ঝকঝকে ছবি তুলতে পারবে। এর সেন্সরে ধরা পড়বে কোথায় অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে, কোথায় গোপনে সামরিক কার্যকলাপ চলে। পারমানবিক অস্ত্র তৈরির কারখানা কোথায় রয়েছে, সেখানে কী কী কাজ চলছে তারও আভাস দিতে পারে এখনকার গুপ্তচর বেলুনের প্রযুক্তি। এর সঙ্গে দিকনির্দেশক যন্ত্র (guiding apparatus) লাগানো থাকে যার সাহায্যে বেলুন কোথায় ভেসে যাবে, কত উঁচুতে উড়বে, কোথায় নামবে--সবই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

গুপ্তচর বেলুনের লম্বা ইতিহাস আছে, দুই বিশ্বযুদ্ধেও কাজে লাগানো হয়েছিল
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিনের গুপ্তচর বেলুন আগেও বহুবার হানা দিয়েছিল আমেরিকায়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় ২০১৭ ও ২০২১ সালে আমেরিকার আকাশে এমনই গুপ্তচর বেলুন দেখা গিয়েছিল। সেবারও সন্দেহ ছিল চিনের দিকেই।

লাতিন আমেরিকার আকাশেও দেখা গেছে রহস্যময় বেলুন। কলম্বিয়ার বায়ুসেনার তরফে জানানো হয়েছে, বেলুনটিকে ১৭ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়তে দেখা গেছে। কয়েকদিন পর দেশের আকাশসীমা থেকে বেরিয়ে গেছে ওই বেলুন। তবে নিরাপত্তাজনিত কোনও সমস্যা হয়নি বলেই দাবি করেছে কলম্বিয়া। লাতিন আমেরিকার অন্য কোনও দেশ থেকে অবশ্য এই বেলুন দেখতে পাওয়া যায়নি।

১৮০০ সাল থেকে গুপ্তচর বেলুনের প্রয়োগ শুরু হয়েছে। ১৮৫৯ সালে ফ্রাঙ্কো-অস্ট্রিয়ান (Franco-Austrian war ) যুদ্ধের সময় ফ্রান্স এই ধরনের গ্যাস ভরা বেলুন গুপ্তচরবৃত্তির জন্য পাঠিয়েছিল। ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সাল অবধি আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময়েও এই ধরনের বেলুনের ব্যাপক প্রয়োগ হয়েছিল।
তুরস্কে ভয়াল ভূমিকম্পের পূর্বাভাস এসেছিল তিনদিন আগেই, কীভাবে ভূকম্প আগাম টের পাওয়া যায়

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হাইড্রোজেন ভরা বেলুন বড় ভূমিকা নিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে গুপ্তচর বেলুনের ব্যবহার আরও বাড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকা বেশি উচ্চতায় উড়তে পারে এমন বেলুন তৈরি করা শুরু করে। শোনা যায়, হাজার হাজার এমন বেলুন তৈরি করে শত্রুঘাঁটির খবর জোগাড় করার কাজে লাগিয়েছিল আমেরিকা। সেই মিশনের নাম দেওয়া হয়েছিল 'প্রজেক্ট জেনেট্রিক্স' (Project Genetrix)।
স্যাটেলাইটের থেকেও নাকি বেশি কার্যকরী গুপ্তচর বেলুন
বিমানের থেকেও বেশি উচু দিয়ে উড়তে পারে এই নজরদারি বেলুন। একটি বেলুন ৬৫ হাজার থেকে ১ লাখ ফুট উচ্চতায় উঠতে পারে।
স্যাটেলাইট সেই সুদূর মহাকাশে পৃথিবীর কক্ষপথে বসে নজরদারি চালায়। কিন্তু গুপ্তচর বেলুনকে একেবারে শত্রুঘাঁটিতে পাঠিয়ে খুব কাছ থেকে ছবি তোলা সম্ভব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) দিয়ে চালনা করা যায় এইসব বেলুন। যখন তখন এর গতিপথ বদলানো যায়।
পৃথিবী থেকে কিংবা মহাকাশ থেকে স্যাটেলাইটে আঘাত করা খুবই সহজ। কিন্তু বেলুনের ক্ষেত্রে তা সবসময়ে সম্ভব নয়। আরও একটা সুবিধা হল, গুপ্তচর বেলুন এমনভাবে তৈরি করা হয় যা রাডারে সবসময় ধরা পড়ে না। দেখে সাধারণত ওয়েদার বেলুন মনে হতে পারে। কিন্তু ভেতরে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ক্যামেরা, রেডার বসানো থাকে। এমনকি দরকারে অস্ত্রশস্ত্র ভরেও পাঠানো যায় এইসব বেলুন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি বেলুন চাইলে একই জায়গাতে এক মাস পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। কিন্তু স্যাটেলাইট পৃথিবীর চারপাশে প্রদক্ষিণ করতে থাকে। এক জায়গায় থিতু হয় না। ফলে চরবৃত্তির জন্যে স্যাটেলাইটের থেকে বেলুন অনেক বেশি কার্যকরী বলেই মত প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের।