.jpeg)
লন্ডন ট্যুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফাইল চিত্র।
শেষ আপডেট: 3 April 2025 19:09
সম্প্রতি লন্ডন সফরে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee London)। তাঁর সেই সফরে সফরসঙ্গী হয়েছিলেন কলকাতার বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক। মুখ্যমন্ত্রীর এই সফরকালেই কেউ কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় রটিয়ে দেয়, এই সাংবাদিকরা সরকারি অর্থানুকূল্যে লন্ডন সফর করে এলেন। স্বাভাবিক ভাবেই এ নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে অনেকের মনে। আবার অনেকে ধরেই নিয়েছেন, সমাজ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া এই তথ্যই সঠিক।
প্রশ্ন হল, সত্যিটা কী? প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি বা মুখ্যমন্ত্রীর বিদেশ সফরে সাংবাদিকরা কি নিখরচায় তথা বিনা পয়সায় ঘুরে আসার সুযোগ পান? সংবাদমাধ্যমগুলোই বা কেন পাঠায় তাঁদের সাংবাদিকদের?
প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রসঙ্গ থেকেই শুরু করি। ব্যক্তিগত ভাবে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহর সঙ্গে দু’বার সফরের অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার। একবার রাশিয়া। পরের বার মেক্সিকো, ব্রাজিল ও সাউথ আফ্রিকা। তবে এ ব্যাপারে তথ্যগত জ্ঞান রয়েছে অটল বিহারী বাজপেয়ী জমানা থেকে। তখন যে বাংলা সংবাদপত্র সাংবাদিকতা করতাম, দিল্লিতে সেই খবরের কাগজে আমার সহকর্মী দুই সাংবাদিক বাজপেয়ীর সফরসঙ্গী হয়েছিলেন একাধিক বার।
বাজপেয়ী তুলনায় একটু লম্বা সফরে যেতেন। সে সময়ে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি বিদেশ সফরে যেতেন এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিমানে। সেই বিমানটির সামনের দিকের ইন্টেরিয়ার বদল করে প্রধানমন্ত্রীর জন্য বিমানেই একটি শয়নকক্ষ তৈরি করা হত। থাকত একটা মিটিং রুম। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর সচিবলায় ও বিদেশ মন্ত্রকের আমলাদের জন্য বরাদ্দ থাকত প্রথম শ্রেণির আসন।
সাধারণত বোয়িং ৩৮০ বা সেই গোত্রের বিমানে সফর করতেন প্রধানমন্ত্রীরা। তার ফলে আমলা, নিরাপত্তা কর্মী ও সাপোর্ট স্টাফদের জন্য আসন রেখেও প্রচুর আসন খালি থাকত বিমানে। প্রধানমন্ত্রীর সফর কভার করার জন্য ওই বিমানেই যাত্রা করতে নির্দিষ্ট সংখ্যক সাংবাদিককে ‘আমন্ত্রণ’ জানানো হত। তাঁদের জন্য বরাদ্দ হত বিজনেস ক্লাসের আসন।
কত জন সাংবাদিককে নিয়ে যাওয়া হবে এবং কোন কোন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিককে নিয়ে যাওয়া হবে তা স্থির করত প্রধানমন্ত্রীর সচিবলায়। ইংরেজি, হিন্দি এবং ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আঞ্চলিক সংবাদপত্র তথা সংবাদমাধ্যমকে আমন্ত্রণ পত্র পাঠানো হত। কোন সাংবাদিককে পাঠানো হবে, তা স্থির করত সেই সংবাদপত্রের কর্তৃপক্ষ।
ওই বিমানে সফরের জন্য সাংবাদিকদের কোনও ভাড়া দিতে হত না। তা ছাড়া অনেক সময়েই প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া ডেলিগেশনের জন্য ভিসা ফি-ও মকুব করে দিত দূতাবাসগুলি। তবে বিদেশে গিয়ে থাকার জন্য সাংবাদিকদের হোটেল ভাড়া দিতে হত। সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের জন্য কোনও একটি অভিজাত হোটেলে রুম বুক করতে সাহায্য করত সে দেশে ভারতীয় দূতাবাস। তবে ভাড়া দিত সাংবাদিকদেরই তথা সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমকে। আবার সেই দেশে বা শহরে সরকারি কর্মসূচি কভার করার জন্য সাংবাদিকদের লোকাল গাড়ি বা বাসের ব্যবস্থা দূতাবাসই করে দিত। তার জন্যও কোনও খরচ হত না।
ইউপিএ জমানায় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে এভাবেই দুবার সফর করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তা ভিন্ন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে অন্তত ৮টি দেশে সফরের অভিজ্ঞতা রয়েছে এই প্রতিবেদকের। সে ক্ষেত্রেও নিয়ম ছিল একই রকম। কোন কোন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিকে নিয়ে যাওয়া হবে তা স্থির করত রাষ্ট্রপতির সচিবালয়। সবটাই ছিল আমন্ত্রণভিত্তিক। বিমান ভাড়া লাগত না, তবে হোটেল ভাড়া ও খাওয়াদাওয়া বাবদ খরচ বহণ করতে হত সাংবাদিকদের তথা সংবাদমাধ্যমগুলিকে।
প্রণব মুখোপাধ্যায় যখন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন, ঠিক সেই সময়েই ব্রাজিল থেকে চারটি এমব্রেয়ার বিমান কিনেছিল ভারত। আসলে সেই ক্রয় চুক্তি হয়ে গেছিল বাজপেয়ী জমানাতেই। বিমানগুলির ডেলিভারি হয় মনমোহন জমানায়। ওই চারটি বিমানের তিনটি ছিল বায়ুসেনার কাছে। একটি ছিল বিএসএফ তথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে। প্রণববাবু যেহেতু কার্যত সরকারের দু’নম্বর ব্যক্তি ছিলেন, তাই প্রতিরক্ষা, বিদেশ এবং অর্থমন্ত্রী হিসাবে ওই এমব্রেয়ার বিমানে তিনি দেশের মধ্যে বা বিদেশে সফরে যেতেন।
এমব্রেয়ারটি ছিল ১৬ আসনের। পিছনের দিকে মুখোমুখি ছিল চারটি বড় আসন। সেখানে মন্ত্রী ও তাঁর সচিব বসতেন। সামনের দিকে ছিল আরও ১২টি আসন। বিদেশ মন্ত্রী থাকাকালীন ওই বিমান নিয়ে ফ্রান্স, জার্মানি, সাউথ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, মায়ানমার, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ সফরে গিয়েছেন। সেই সময়ে তিনিও তিন চার জন সাংবাদিককে আমন্ত্রণ জানাতেন। ওই সফরেও সাংবাদিকদের এমব্রেয়ারে চড়ার জন্য ভাড়া দিতে হত না। তবে হোটেল ভাড়া ও অন্যান্য খরচ বহন করতে হত।
মনে পড়ে প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, বিদেশ মন্ত্রী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বিদেশ সফরে আমন্ত্রণ পাওয়ার জন্য সাংবাদিক তথা সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে কার্যত যেন প্রতিযোগিতা হত। বাংলায় বরাবরই সর্বাধিক বিক্রিত দু'টি সংবাদপত্রের সাংবাদিককে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হত। একটি সফরে এক নম্বর ডাক পেল তো পরের সফরে দু’নম্বর। সার্কুলেশন কম হলেও অন্য বাংলা সংবাদপত্র তথা তাদের সাংবাদিকরাও কয়েকবার সুযোগ পেয়েছিলেন। সেই সময়ে এই ধরনের সফরে ডাক পাওয়াটাও মর্যাদার বলে মনে করা হত। সংবাদপত্রে সাংবাদিকের বাইলাইন দিয়ে লেখা হত, ‘প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী’।
ওই সব সফর নিয়ে সাংবাদিকদের উৎসাহ ও উদ্দীপনাও থাকত খুব। তার প্রথম কারণ হল, সফর সেরে ফেরার সময়ে প্রধানমন্ত্রী বাধ্যতামূলক ভাবে বিমানে একটি সাংবাদিক বৈঠক করতেন। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীকে নিজের ও সংবাদমাধ্যমের পরিচয় দিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করার সুযোগ থাকত। দুই, সফররত আমলাদের সঙ্গে অনেক ঘরোয়া ভাবে কথা বলার ও যোগাযোগ তৈরির সুযোগ হয়ে যেত। এবং তৃতীয়ত, দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, শীর্ষ সম্মেলন, কূটনৈতিক কর্মসূচি কভার করার মধ্যে দিয়ে সাংবাদিকদের জ্ঞান ও ধারণার পরিধি বাড়ানোর সুযোগ হত।
অবশ্য নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর বিমানে মিডিয়া ডেলিগেশন নিয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এমন নয় যে বিমানে আসন সংখ্যা কমে গেছে বা কমানো হয়েছে। সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিয়েই তিনি সাংবাদিকদের সফরসঙ্গী করেন না। অনেকে মনে করেন, প্রথা মেনে ফেরার পথে সাংবাদিক বৈঠক করতে হবে, তাই সংবাদমাধ্যমকে এড়ানোর জন্যই এই কৌশল। তবে হ্যাঁ, প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফরে গেলে কিছু সংবাদমাধ্যম নিজেদের মতো করে তাঁদের সাংবাদিকদের সেই কর্মসূচি কভার করতে পাঠায়। সেক্ষেত্রে বিদেশ মন্ত্রক বা প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় কিছু লজিস্টিক্স সাহায্য করে। অনেক সময়ে সাংবাদিকদের জন্য মিডিয়া সেন্টারের ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয়।
এবারে চলে আসা যাক, মুখ্যমন্ত্রীর সফরের প্রসঙ্গে। বিশেষ করে এবার মুখ্যমন্ত্রীর লন্ডন সফরের প্রসঙ্গে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সরকারি ঘরোয়া সফরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেক আগেই হয়েছে। তখন কেন্দ্রে বাজপেয়ী জমানা। তিনি রেলমন্ত্রী। বড় রেল প্রকল্পের উদ্বোধন বা শিলান্যাসের জন্য তিনি মাঝে মধ্যে অন্য রাজ্যে সফরে যেতেন।
তাঁর সঙ্গে বিদেশ সফরের অভিজ্ঞতা এই প্রথম। এই সফর প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির সফরের মতো নয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কোনও বিমান নেই। কিংবা মুখ্যমন্ত্রীর বিদেশ সফরের জন্য গোটা বিমান ভাড়াও নেয় না সরকার। তাই সাংবাদিকদের বিনামূল্যে বিদেশ সফর করানোর মতো কোনও সুযোগ নেই, কোনও নিয়ম বা সরকারি বরাদ্দও নেই। তবে হ্যাঁ, মুখ্যমন্ত্রীর এই সফরে কোন কোন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি সামিল হতে পারবেন তা ছিল একদা প্রধানমন্ত্রীর সফরের মতই আমন্ত্রণভিত্তিক। নবান্ন থেকে কিছু সংবাদমাধ্যমের কাছে আমন্ত্রণ পত্র পাঠানো হয়েছিল।
যেহেতু সফরের দিনক্ষণ একেবারে শেষ মূহূর্তে চূড়ান্ত হয়, তাই স্বাভাবিক ভাবে ব্রিটিশ ভিসার আবেদন করার মতো সময় ছিল না। রাজ্যের শিল্পোন্নয়ন নিগম এক্ষেত্রে কিছুটা সাহায্য করে। তবে জরুরি ভিত্তিতে ভিসা পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত মাশুল গুণতে হয় সাংবাদিকদের। এই প্রতিবেদকের ব্রিটিশ ভিসা ছিল। তাই অতিরিক্ত মাশুল দেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি।
সাংবাদিকদের বিমান ভাড়া বাবদ খরচও বহন করতে হয় সেই সব সংবাদমাধ্যমকেই। বরং এবার মমতার যাত্রায় খরচ তুলনায় একটু বেশিই ছিল। ২২ মার্চ সকালের বিমানে লন্ডন যাত্রা করার কথা ছিল। কিন্তু ২১ মার্চ হিথরো বিমানবন্দরে আগুন লাগে। তাই প্রচুর ফ্লাইট বাতিল হয়ে যায়। নবান্ন একবার স্থির করে সেক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী ২৪ তারিখ সফর করবেন। তাই প্রথমে টিকিট বদলে ২৪ তারিখের টিকিট কাটতে হয়। হিথরোর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসায় নবান্ন ফের স্থির করে, মুখ্যমন্ত্রী ২২ মার্চই রাতের ফ্লাইটে সফর করবেন। তার ফলে আরও একবার আগের টিকিট বাতিল করে পুনরায় টিকিট কাটতে হয়। এই সব খরচই বহন করতে সংবাদমাধ্যমগুলিকে। সরকার এই খরচ বহন করেনি।
লন্ডনে সেন্ট জেমস কোর্ট হোটেলে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। ওই হোটেলেই বাণিজ্য সম্মেলন ও বাণিজ্য বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। তাই সাংবাদিকরাও সবাই ওই হোটেলেই ছিলেন। তবে সেক্ষেত্রেও হোটেলে থাকার খরচ বহন করেন সাংবাদিকরা তথা তাঁরা যে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি সেই প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ বিনামূল্যে সফরের তথ্যটি ভ্রান্ত এবং সত্যের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই।
তবে হ্যাঁ, দিল্লিতে ঠিক যেমনভাবে সংবাদমাধ্যমগুলি প্রধানমন্ত্রীর সফরে প্রতিনিধি পাঠাতে আগ্রহী থাকত, আঞ্চলিক ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রীর সফরে সাংবাদিক পাঠানোর ব্যাপারে সমান আগ্রহ থাকে সংবাদমাধ্যমগুলির। বিশেষ করে এক্ষেত্রেও বিষয়টা যেহেতু আমন্ত্রণ ভিত্তিক, তাই সংবাদমাধ্যমগুলি তা রক্ষার চেষ্টা করে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের মতোই মুখ্যমন্ত্রীর সফর নিয়েও সাংবাদিকদের স্বাভাবিক উৎসাহ ও উন্মাদনা থাকে। কারণ, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়। সফরসঙ্গী আমলা বা প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঘরোয়াভাবে আলোচনার সুযোগ পাওয়া যায়। বিভিন্ন বিষয়ে ধারণাগত পরিধি বাড়ে। বড় কথা হল, আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদেরও বিদেশে সরকারি কর্মসূচি কভার করার মধ্যে দিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা হয়। যা দীর্ঘমেয়াদে সাংবাদিকতায় কাজে লাগে।
প্রবীণ সাংবাদিকদের অনেকে মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীর বিদেশ সফর কভার করাটা সংবাদমাধ্যমের কাছে খুব স্বভাবিক ব্যাপার। বিদেশ সফরে গিয়ে দেশ বা রাজ্যের প্রধান প্রশাসক কী করছেন, কী ধরনের বৈঠক হচ্ছে, তাতে দেশ বা রাজ্যের কতটা উপকার হতে পারে— তা জানার আগ্রহ মানুষের থাকে। সেই কৌতূহল এতে নিবৃত্ত হতে পারে। তা ছাড়া মুখ্যমন্ত্রীর সফর নিয়ে স্বচ্ছতা থাকে। অতীতে বহু সময়ে সেই স্বচ্ছতা ছিল না।