দ্য ওয়াল ব্যুরো: চারহাত এক হল। সাত পাকে বাঁধা পড়ল দু’টি মন। ভালবাসার শপথের সঙ্গেই আরও একটি শপথ নিলেন সৌম্য ও তুলিকা। বিয়ের আসরেই হাতেকলমে মরণোত্তর অঙ্গদানের অঙ্গীকার করলেন বর-কনে। অঙ্গদানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে রাজি করালেন আরও অনেককেই। নবদম্পতির এই প্রয়াসকে কুর্নিশ জানাল সমাজ। বাঙালি বিয়ের আসরে এক অন্য নজির তৈরি হল।
এই অঙ্গীকার ছিল দীর্ঘদিনের। এমনটাই জানিয়েছেন সৌম্য। অঙ্গদানে সচেতনতার কথা বলেছেন নানা সময়ে। বন্ধুদের আড্ডায়, আত্মীয়দের মাঝে মরণোত্তর অঙ্গদানের কথা বুঝিয়েছেন। সৌম্য শুধু নন, একই কাজ করেছেন তুলিকাও। সৌম্য বলেছেন, তাঁদের সম্পর্কের বাঁধন যত মজবুত হয়েছে লক্ষ্যের পথ ততই দৃঢ় হয়েছে। সংস্কারবদ্ধ আরও অনেক মানুষকে মরণোত্তর অঙ্গদানে রাজি করানোটা খুব একটা সহজ ছিল না। তার জন্য লড়াই করতে হয়েছে বিস্তর। অঙ্গদানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলার জন্য বিয়ের দিনের চেয়ে বড় দিন আর হয় না। বহু অতিথির সমাগমে সচেতনতার কথা ছড়িয়ে দেওয়া যাবে সার্বিক স্তরে।
দত্তবাগানের বাসিন্দা সৌম্য পেশায় গ্রাফিক্স ডিজাইনার। তাঁর স্ত্রী তুলিকা কাজ করেন একটি বেসরকারি স্কুলে। সৌম্যের কথায়, ‘‘ঠিক করেই রেখেছিলাম যে দিন বিয়ে করব, সে দিনই দেহদানের অঙ্গীকার পত্রে সই করব। আরও অনেককে এগিয়ে আসার কথা বলব। সেই উদ্দেশ্য অনেকটাই সফল।’’ ১০-১২ জন সঙ্গে সঙ্গেই এগিয়ে এসেছিলেন দেহদানের অঙ্গীকারপত্রে সই করতে। সৌম্য বলেছেন, তাঁর নিজের পরিবার তো বটেই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের অনেকেই মরণোত্তর অঙ্গদানে রাজি হয়েছেন। বিয়ের আসরে হাজির অতিথিদের অনেকেই রাজি। আবার কেউ কেউ একটু সময় চেয়েছেন।
‘‘আমাদের পরিবার ভেগান। বিয়েতে নিরামিষ মেনুই ছিল। অতিথিদের উপহার আনতে বারণ করেছিলাম। শর্ত ছিল একটাই, উপহার নয় বরং অঙ্গদানের অঙ্গীকার করুন। সমাজের ভাবনা বদলান।’’ বেঙ্গল অর্গান ডোনেশন সোসাইটির সঙ্গে আগেই যোগাযোগ করা হয়েছিল, বলেছেন সৌম্য। সেখান কর্তৃপক্ষ তাঁদের এই পরিকল্পনা শুনেই রাজি হয়ে যান। সাধুবাদ দেন এই মহৎ উদ্দেশ্যকেও।
ভারতের মতো দেশে অঙ্গদানের সচেতনতা অনেক কম, বলেছেন সৌম্য। এ রাজ্যে তো বটেই। মৃতপ্রায় রোগীর বাঁচার জন্য বিশেষ কোনও অঙ্গের প্রয়োজন হলে জীবিত বা মৃত দাতা জোটানো কঠিন। পরিসংখ্যান বলছে, মস্তিষ্কের মৃত্যু হয়েছে, এমন কারও শরীরের নানা অঙ্গের সাহায্যে ১২টি মানুষের প্রাণ বাঁচতে পারে। সৌম্যের কথায়, অনেকেই শোকার্ত পরিবারই ভাবে প্রিয়জনের শরীর থেকে অঙ্গ নিয়ে নিলে সেই দেহ বিকৃত হয়ে যাবে। আসলে তেমনটা কখনওই হয় না। ভয় এবং সংস্কারও আছে অনেকের মনে। সৌম্য বলেছেন, ‘‘এমনও অনেকে আছেন যাঁদের ধারণা মৃত্যুর পরে চোখ দান করলে, পরজন্মে অন্ধ হয়ে জন্মাতে হবে। এইসব সংস্কারবদ্ধ ধারণাকেই বদলে দিতে চাইছি আমরা। কাজ এখনও শেষ হয়নি। বরং শুভ সূচনা হয়েছে। আরও অনেক পথ চলা বাকি।’’