দ্য ওয়াল ব্যুরো: তিন বছরের উমেশের হাড়-জিরজিরে শরীরটা দেখলে যেন ভয় লাগে। মনে হয়, তিন বছর হতেই পারে না বয়স, বড় জোর এক বছর হবে। ওজন তার মাত্র ৮ কেজি। উচ্চতাও অনেক কম। এই চরম অপুষ্টির কারণ, গত কয়েক মাস স্কুল বন্ধ থাকা। সে কারণে বন্ধ মিড-ডে মিলও। সেই খাবারের বিকল্প সন্ধান বাড়িতে নেই। গোটা পরিবারের একবেলাও ভরপেট খাবার জোটে না।
উমেশ একা নয়, এ সমস্যা মহারাষ্ট্রের পালঘর জেলার তরলপদ এলাকার ঘরে ঘরে। সৌজন্যে লকডাউন। উপজাতি অধ্যষিত এই এলাকার বেশিরভাগ মানুষেরই জীবিকা ছিল আশপাশের থানে, ভিওয়ান্ডি এসব শহরে মজুরের কাজ করা। এলাকার ৯০ শতাংশ মানুষই ছিলেন পরিযায়ী শ্রমিক। লকডাউনে বন্ধ উপার্জন। ঘরে উনুন জ্বলে না। তার উপর যে বাচ্চারা স্কুলে মিড-ডে মিল পেত, তারাও বাড়িতে।

মুম্বই থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরের এলাকার এই চরম সংকটের কথা সামনে এসেছে সম্প্রতি। করোনার জেরে সুদীর্ঘ লকডাউনে সারা দেশের নানা প্রান্তে যে হাজারো অসুবিধা ঘনিয়ে উঠেছে, তারই একটা নির্মম ছবি ফুটে উঠেছে এখানে।
“এখন আমরা চারজন ঘরে আছি। আগে উমেশ আর ওর দাদা স্কুলে খেত দুপুরে। ওদের বাবা তো বাইরেই থাকত। এখন চারটে পেটই ঘরে। তার ওপর কোনও রোজগার নেই। ছেলেদের শরীরের অবস্থা দেখে আমার তো ভয় লাগছে। ওদের খাওয়াতে পারছি না কিছু।”—বলছিলেন উমেশের মা প্রমীলা ভাম্বরে।
করোনা সংক্রমণ শুরুর গোড়ায় ভিওয়ান্ডি থেকে গ্রামে ফিরে চলে এসেছিলেন অশোক ভাম্বরে, উমেশের বাবা ও প্রমীলার স্বামী। উপায় ছিল না কোনও। কিন্তু এত দিন ঘরবন্দি থাকার পরে যখন আনলক শুরু হয়েছে, তখনও কাজ ফেরেনি তাঁর।

অশোকগের কয়েকটা বাড়ি পাশেই থাকেন রূপেশ ও রূপালি। ওঁদের ১৩ মাসের যমজ বাচ্চার বৃদ্ধিও থমকে গেছে খেতে না পেয়ে। দুজনেরই ওজন ও উচ্চতা বয়সের তুলনায় অনেক কম। যেখানে অন্তত ৯ কেজি ওজন হওয়ার কথা বাচ্চাদের, সেখানে ওদের মাত্র ৫ কেজি করে ওজন। সামান্য শুকনো চিঁড়ে ছাড়া খাবার জুটছে না বললেই চলে।
রূপেশের মা জাই তরল বলেন, “পয়সা কোথায় খাব যে! বাচ্চাদের কী খাওয়াব! কোথাও কোনও সব্জি পেলে আমরা খাই না, বাচ্চাদের দিই। সব মিলিয়ে আট জন সদস্য পরিবারে। ছেলে আগে মিস্ত্রির কাজ করত। কয়েক মাস সব বন্ধ। আমার ছোট মেয়ে জুনকা ক্লাস সেভেনে পড়ে, ও আগে হোস্টেলে থাকত। পেট ভরে ভাত-ডাল-তরকারি খেতে পেত। সব বন্ধ এখন। আমরা একবেলা খেয়ে কোনও রকমে থাকি, বাচ্চাদের অন্তত দুবেলা কিছু খেতে দিই। জানি না কতদিন চলবে এভাবে।”
মহারাষ্ট্রের নারী ও শিশু উন্নয়ন দফতর সূত্রের খবর, পালঘর এমনিতেই অপুষ্টির আঁতুরঘর। এখানকার উপজাতির পরিবারগুলিতে কম ওজনের বাচ্চা থাকার ঘটনা বিরল নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক লকডাউনে আরও বেড়ে গেছে অপুষ্টির মাত্রা। এপ্রিল মাস পর্যন্ত যেখানে ২৩৯৯টি অপুষ্ট শিশু ছিল, জুনে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪৫৯। চরম অপুষ্ট শিশুর সংখ্যা এপ্রিল পর্যন্ত ছিল ৬০০, তা দুমাসে বেড়ে হয়েছে ৬৮২।

নারী ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রী যশোমতী ঠাকুর বলেন, “আমরা সকলকে খাবার পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি।” পালঘর এলাকায় কর্মরত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলি অবশ্য বলছে, সরকারি রেশন মোটেই যথেষ্ট নয়।
এলাকাবাসীদেরও অভিযোগ, এক এক জনের জন্য সরকার ২ কেজি শস্য দেয় মাসে।এক জন মানুষ অন্তত দুবেলা খেলে তার একমাসে ২ কেজি খাবারে কুলোনো সম্ভব নয় বলেই জানিয়েছেন তাঁরা। ফলে খিদে ও অপুষ্টি থেকে মুক্তি নেই।