
শেষ আপডেট: 1 February 2024 22:51
অমল সরকার, বহরমপুর
লালগোলা থেকে সবে ভগবানগোলার দিকে রওনা দিয়েছে রাহুলের গাড়ি বহর। হুডখোলা লাল রংয়ের জিপে বসে কংগ্রেস নেতা। বেলা ১০’টা-১১’টা থেকেই ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের দু’পাশে শয়ে শয়ে মানুষ অপেক্ষায়। রাহুল গান্ধীকে দেখতে অধীর অপেক্ষার অবসান হওয়ার মুখে সেই ভিড় যেন অস্থির হয়ে উঠল।
রাহুলের জিপের আগে-পরে কম করে গোটা কুড়ি গাড়ির সারি। সামনে মিডিয়ার ভ্যান। কোন গাড়িতে রাহুল, যাঁকে দেখতে অধীর অপেক্ষা, খানিক দূর থেকেও তা ঠাওর করা যাচ্ছিল না। ভগবানগোলায় বাড়ির ছাদে অপেক্ষমান মহিলাদের ভিড় থেকে তরুণী বধূ গলা চড়িয়ে বলে উঠলেন, ‘জিপ গাড়িটার দিকে তাঁকাও। ওই তো, ওই তো, সাদা গেঞ্জি গায়ে, হাত নাড়ছে।’ রাহুল সেই ভিড়ের দিকে হাত নাড়লে গ্রামের মেয়ে-বউদের সলজ্জ হাসি আর চাপা থাকে না।
কয়েক কিলোমিটার আগে লালগোলার নেতাজি মোড়ে সকাল থেকে অপেক্ষায় ছিলেন বছর সত্তরের এনামুল শেখ। বলছিলেন, ‘ইন্দিরা, রাজীবকে দেখেছি। ইন্দিরার বউমা, নাতি-নাতনিদের দেখা হয়নি। রাহুলকে দেখার সুযোগ হারাতে চাই না।’ সঙ্গে যোগ করেন, ‘আমাদিগের রক্তে কংগ্রেস, বুঝছেন কিনা!’
মুর্শিদাবাদে যে দুটি পঞ্চায়েত সমিতি কংগ্রেসের দখলে তাঁর একটি বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া এই লালগোলা। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে তুমুল লড়াই করে বাম-কংগ্রেস এই পঞ্চায়েত সমিতি তৃণমূলের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। এলাকায় কংগ্রেসের জনসমর্থন টের পাওয়া যাচ্ছিল রাহুলকে দেখার ভিড় এবং উচ্ছ্বাসে। ব্লক কংগ্রেস সভাপতি যদুরাম ঘোষ, মহকুমা সভাপতি মরতুজা হোসেন বেলা বারোটা থেকে ট্রাফিক পুলিশের মতো ভিড় সামলাচ্ছিলেন।
বৃহস্পতিবার বাংলায় ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রার দ্বিতীয়দিনে রাহুল যাত্রা শুরু করেছিলেন মালদহের সুজাপুর থেকে, যে বিধানসভা কেন্দ্রটিকে একটা সময়ে কংগ্রেসের গড় বলা হত। প্রয়াত বরকত গণিখান চৌধুরীর নির্বাচন কেন্দ্র ছিল আধা মফস্বল জনপদটি। সেই সুজাপুরে ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে লজ্জার হার স্বীকার করতে হয় কংগ্রেসকে।
লোকসভা ভোটে সুজাপুরের হাওয়া ঘোরাতে বুধবার রাহুল সেখানেই কর্মসূচি শেষ করে রাত্রিবাস করেন। বৃহস্পতিবার সেখান থেকে শুরু করেন দ্বিতীয় পর্বের দ্বিতীয় দিনের সফর। সকাল আটটায় শুরু করে সেই যাত্রা থামে সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ বহরমপুরে জেলা কংগ্রেসের দফতরের সামনে। বলাইবাহুল্য, সারাক্ষণ রাহুলের পাশে ছিলেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী।
মালদহ থেকে যাত্রা শুরু হলেও বেলা ১১’টার পর থেকেই তা জাতীয় সড়ক ধরে মুর্শিদাবাদের ভিতর দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। রাহুলকে নিয়ে গাড়ির বহর যত এগিয়েছে ততই যেন চওড়া হয়েছে লোকসভায় কংগ্রেসের দলনেতা তথা বহরমপুরের সাংসদ অধীরের হাসিমুখ।
মাঝে লাঞ্চ ব্রেক ছাড়াও জঙ্গিপুরে রাহুল বেশ কিছু সময় সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, দলের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। কংগ্রেস সূত্রে জানানো হয়েছে, রাহুলের যাত্রা উপলক্ষে সিপিএম নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেই বৈঠকের সিদ্ধান্তে স্পষ্ট, তৃণমূল যতই সিপিএমের বিরুদ্ধে কংগ্রেসকে বিপথে চালিত করার কথা বলুন না কেন, স্বয়ং রাহুল সেই বক্তব্যকে তেমন গুরুত্ব দিলেন না। বরং ইন্ডিয়া জোটের শরিক সিপিএমের রাজ্য নেতাদের যথেষ্টই গুরুত্ব দিলেন। তবে রাহুলের সঙ্গে এক গাড়িতে দেখা যায়নি বাম নেতাদের।
২০১৬-র বিধানসভা ভোটে বাম-কংগ্রেস জোটের হয়ে পার্ক সার্কাস ময়দানে যৌথ সভা করেছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং রাহুল গান্ধী। কংগ্রেস কর্মীদের আলোচনায় সেই জনসভার প্রসঙ্গ ফিরে ফিরে এসেছে।
সেই বৈঠকের আগে সেলিম সাংবাদিকদের কাছে স্পষ্ট করে দেন বাংলায় এবারও তাঁরা কংগ্রেসের সঙ্গে আসন বোঝাপড়া চান। তাই জয়রাম রমেশ-সহ কংগ্রেসের সর্ব ভারতীয় নেতারা যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জোট ভাঙার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের জন্য পীড়াপীড়ি করছেন তখন সেলিম স্পষ্ট করে দিয়েছেন তাঁরা কী চান। মমতার জোট না করার সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক তথা দলের পলিটব্যুরোর সদস্য সেলিম বাম-কংগ্রেস জোটের পক্ষে সওয়াল করেছেন। বস্তুত রাহুলের সঙ্গে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের নেতাদের বৈঠকের ফলেও বাম-কংগ্রেস জোট বার্তা শক্তিশালী হয়েছে বলে ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে।
শুধু তাই নয়, রাহুলের যাত্রা পথে বহু জায়গায় বৃহস্পতিবার সিপিএমের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের দলের পতাকা হাতে দেখা গিয়েছে। তাঁদের মুখেও শোনা গিয়েছে ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা ও রাহুলের নামে জয়ধ্বনী।
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি তথা বহরমপুরের সাংসদ অধীর সেটাই চাইছিলেন। রাহুলের সামনে মুর্শিদাবাদে কংগ্রেস তথা নিজের শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি তিনি বামেদের পাশে থাকার দৃষ্টান্তও তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। আর সেই লক্ষ্যপূরণে তিনি ষোলআনা সফল বলা চলে। আসলে অধীর যে তৃণমূলের সঙ্গে জোট চান না তা অজানা নয়। এখন দেখার কংগ্রেস নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত জোটের প্রশ্নে আর কতদিন তৃণমূল নেত্রীকে পীড়াপীড়ি করেন। কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রাহুলের অভিমত বাড়তি গুরুত্ব পাবে, বলাইবাহুল্য।
শুধু জেলা নয়, বহরমপুর অর্থাৎ অধীরের নির্বাচনী কেন্দ্রে রাহুলের সান্ধ্য রোড-শো’য়ে বিপুল সংখ্যায় মানুষকে হাজির করে অধীর বোঝাতে চেয়েছেন, তৃণমূলের সঙ্গে জোটের ভাবনা অনাবশ্যক। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যয় বহরমপুরে রাহুলের রোড-শো’য়ের যাত্রাপথে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। কোনও হাত ফাঁকা নেই। কারও হাতে জাতীয় পতাকা ও কেউ ধরে আছেন দলেরটি। বাকিরা মোবাইলে রাহুল এবং তাঁকে ঘিরে মানুষের উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনা ভিডিও বন্দি করতে ব্যস্ত। রাহুল ছাড়াও মল্লিকার্জুন খাড়্গে, সনিয়া গান্ধী, প্রিয়ঙ্কা গান্ধীদের পাশপাশি জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধীদের মতো প্রয়াত নেতাদের কাটআউট, পোস্টার ব্যানারে ছেয়ে আছে বহরমপুর শহর। রঘুনাথগঞ্জ থেকে গোটা যাত্রা পথেই রাহুলের পাশাপাশি গোটা গান্ধী পরিবারের সব মুখের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গিয়েছে কংগ্রেসের প্রচারে। শুক্রবার সকালে রাহুল বহরমপুর থেকে রওনা হয়ে বীরভূমের নলহাটি হয়ে ঝাড়খণ্ড তাঁর অভিযাত্রীদের নিয়ে প্রবেশ করবেন।