চৈতালী চক্রবর্তী
উত্তপ্ত গ্যাসীয় পিণ্ড। গনগনে তেজ। আড়েবহরে অনেকটাই আমাদের সৌরমণ্ডলের বৃহস্পতি গ্রহের মতো। কিন্তু এর স্বভাব অশান্ত। এই গ্রহের সংসারে চোখ রেখে চমকে গেলেন বিজ্ঞানীরা। আবহাওয়ার একি বৈচিত্র্য। ঝড় বইছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তাপমাত্রার পারদ উঠছে চড়চড়িয়ে। আকাশ থেকে নেমে আসছে আগুনে বৃষ্টি। মেঘ ভেঙে টুপটাপ ঝড়ে পড়ছে গলিত লোহা। আবার রাত নামলেই হিমশীতল নিস্তব্ধতা। ঝিরঝিরে হাওয়ায় এলোপাথাড়ি ছুটে চলেছে লোহা ও ধাতব উপাদান। গ্যাসের মেঘ উঠছে কুণ্ডলী পাকিয়ে।
ভিন্ গ্রহের সন্ধানে মহাশূন্যে চোখ রেখে বসেছিল
ইউরোপ সাদার্ন অবজারভেটরির (ESO) ‘ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ’ (VLT)। সৌরমণ্ডলের বাইরের তারামণ্ডল ও
ভিন গ্রহদের (Exoplanet) খুঁজে বার করাই ভিএলটি-র কাজ। আমাদের পড়শি কোনও গ্রহের পরিবেশ যদি মনোরম হয়, বেশ হাওয়া-বাতাস খেলে, তাপমাত্রাও অনেকটা পৃথিবীর মতোই হয় তাহলে সেই গ্রহের আতিপাঁতি বিশ্লেষণ করে সেখানে প্রাণ ধুকপুক করছে কিনা সেটা তদন্ত করে দেখা অবজারভেটরির মূল লক্ষ্য। তেমন কাজই বছরের পর বছর ধরে করছে চিলির ভিএলটি। তবে এবার তার লেন্সে ধরা পড়েছে এক অদ্ভুত এক্সোপ্ল্যানেট। এমনিতে সে বাধ্য গ্রহের মতোই তার সূর্য অর্থাৎ এখনও নাম না জানা এক নক্ষত্রের চারপাশে নির্দিষ্ট কক্ষপথে পাক খাচ্ছে। তবে চমকে দওয়ার মতো বিষয় হল এই গ্রহের অন্দরে ঘটে চলা আবহাওয়ার পরিবর্তন। এমন খামখেয়ালী আবহাওয়া এর আগে কোনও ভিন্ গ্রহের মধ্যে খুব একটা দেখা যায়নি।
দিনের বেলা তাপমাত্রা ২৪০০ ডিগ্রি, গলে গলে পড়ছে লোহা
ওয়াস্প-৭৬বি (WASP-76b)— এই এক্সোপ্ল্যানেটের এমনই নামকরণ করেছেন ইউনিভার্সিটি অব জেনেভার বিজ্ঞানীরা।
অধ্যাপক-জ্যোতির্বিজ্ঞানী ডেভিড এহেরেনরেইচ বলেছেন, পৃথিবী থেকে কম করেও ৬৪০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে রয়েছে এই গ্রহ। তবে এর দূরত্ব নিয়ে অনেকরকম মতামত দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। এই গ্রহ তার সূর্যের চারপাশে পাক খাচ্ছে মাত্র ৪৩ ঘণ্টায়। দিনের বেলায় জ্বলন্ত পরিবেশ গ্রহের অন্দরে। চারদিক যেন জ্বলছে। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগুনে হাওয়ার স্রোত বইছে চারদিকে।
ওয়াস্প-৭৬বি গ্রহের সবচেয়ে চমকে দেওয়ার মতো বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘লোহা বৃষ্টি’। কখনও তাপমাত্রার পারদ উঠছে গনগনিয়ে, আর পর মুহূর্তেই আকাশ কালো করে দমকা হওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি নামছে। এই বৃষ্টি প্রাণ জুড়ায় না, শরীরের সংস্পর্ষে এলে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিতে পারে। বিজ্ঞানী ডেভিড এহেরেনরেইচ বলছেন, ‘‘ভিএলটি টেলিস্কোপ দেখিয়েছে, গ্রহের আকাশ থেকে নেমে আসছে লোহার ধারা। গলিত লোহা ঝরে পড়ছে বৃষ্টি হয়ে। তাপমাত্রাও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। হাওয়ার গতিতে লোহার টুকরো ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। আবহাওয়ার এমন গতিপ্রকৃতি আগে কখনও দেখা যায়নি।’’

‘নেচার’ বিজ্ঞানপত্রিকায় এই ভিন্ গ্রহের কথা জানিয়েছেন সুইস বিজ্ঞানীরা।
ইউনিভার্সিটি অব জেনেভার এক্সোপ্ল্যানেট-রিসার্চার ক্রিসটোপ লোভিস বলেছেন, ‘‘সৌরমণ্ডলের বাইরে এমন গ্রহের মতিগতি এখনই বোঝা যায়নি। দিনের বেলা যেখানে
৪৩৫০ ফারেনহাইট (২৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রা, রাতে সেই গ্রহের তাপমাত্রা নেমে হচ্ছে
২৭৩০ ফারেনহাইট (১৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। কখনও সেটা নামছে দপ করে নামছে হিমাঙ্কের নীচে।’’
একপিঠে ঘন আঁধার, অন্যপিঠে মেঘলা দিন, বাষ্প হয় লোহার স্তর, বেলা গড়াতেই বৃষ্টি হয়ে নামে
ওয়াস্প-৭৬বি গ্রহকে অনেকে চাঁদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এর রুক্ষ-বন্ধুর পরিবেশের সঙ্গে চাঁদের নাকি বিস্তর মিল। কিন্তু জেনেভা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বিজ্ঞানী ডেভিড বলেছেন, এই গ্রহের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর একটা দিকই তার নক্ষত্রের দিকে মুখ করে থাকে। তাই এর একপিঠে সবসময় দিন, অন্যপিঠে ঘন আঁধার। তাপমাত্রাও তাই গ্রহের সবদিকে সমান নয়। এই ধরনের গ্রহকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় বলে
Tidally-locked planets।

ইউরোপিয়ান সাদার্ন অবজারভেটরির ভিএলটি-র
‘এক্সপ্রেসো ইনস্ট্রুমেন্ট’ (ESPRESSO instrument)-এ ধরা পড়েছে এই গ্রহের মধ্যে সবসময় একটা রাসায়নিক পরিবর্তন চলছে। মাটির গঠন বদলাচ্ছে। মূলত লোহার স্তর ছড়িয়ে আছে এই গ্রহের মাটিতে। প্রবল উত্তাপে বাস্প হয়ে সেই লোহা মেঘ হয়ে জমছে আকাশে। তাপমাত্রা নামলে সেই ধাতব-বাষ্পের স্তর ঘণীভূত হয়ে বৃষ্টি হয়ে নামছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রায় সারাদিন ধরেই ‘লোহা বৃষ্টি’ হচ্ছে গ্রহে।
সেই সঙ্গে প্রবল হাওয়ার স্রোত বইছে এলোমেলো। হাওয়ার গতি ১১ হাজার এমপিএইচের (১৮,০০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা) কাছাকাছি। হাওয়ার সঙ্গেও ছুটছে ধাতব উপাদান। চক্রাকারে ঘূর্ণিঝড়ের চেহারা নিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন এমন গ্রহে প্রাণ থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে এই গ্রহের রাসায়নিক গঠন এখনও পুরোপুরি বোঝা সম্ভব হয়নি। সেই রহস্য সামনে এলে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে অনেক অজানা রহস্যের পর্দা খুলে যাবে।