দ্য ওয়াল ব্যুরো: বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে চারটেয় ব্রহ্মপুরীর ঘিঞ্জি কলোনিতে হাজার লোকের ভিড়। পনেরো বছরের ইতমিনান আহমেদের দেহ নিয়ে যাওয়া হবে মসজিদে। ছেলের দেহ আঁকড়ে পাথরের মতো বসে মা। চোখের জলও যেন শুকিয়ে গেছে। অস্ফুটে বলে চলেছেন, “ছেলেটা খেলাধূলা পছন্দ করত। ডাক্তার হতে চেয়েছিল। কেন মারা হল ওকে। ও তো কোনও দোষ করেনি!”
মঙ্গলবার বিকেলে বাড়ির কাছেই দোকানে দুধ আনতে গিয়েছিল ইতমিনান। তারপর আর ফিরে আসেনি। “অনেকবার বারণ করেছিলাম বেরোতে না। শুনল না। বলল তাড়াতাড়ি ফিরে আসব,” বলেছেন ইতমিনানের বাবা। ছটফটে ছেলেটা বাড়িতে বেশিক্ষণ বন্দি থাকতে পারত না। বাড়ি থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বেই দুধের দোকান। ওইটুকু রাস্তাতেও ওকে ছাড়ল না দাঙ্গাবাজরা? কান্না থামছেই না ইতমিনানের বাবার।
গত পাঁচদিন ধরেই অশান্তির আগুনে জ্বলছে উত্তর-পূর্ব দিল্লি। মৌজপুর, ব্রহ্মপুরীতে একাধিক অ্যাসিড হামলার খবরও পাওয়া গিয়েছে। এলোপাথাড়ি গুলিতে জখম অনেক। ব্রহ্মপুরীরই এক মুসলিম কলোনিতে বাড়ি ইতমিনানের। বাড়ির কাছেই মসজিদ। ইতমিনানের কাকা ইরশাদ আহমেদ বলেছেন, দিনকযেক ধরে মসজিদে নমাজ পড়তে যাওয়া হচ্ছে না। ঘরবন্দি সব মানুষ। ছেলেটা বাড়ি থেকে বেরনোর সময় বলে গিয়েছিল কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফিরে আসবে। একঘণ্টা হয়ে যাওয়ার পরেও না ফেরায় আশপাশের বাড়িতে খোঁজ শুরু করেন তাঁরা। বিকেল সাড়ে ৫টা নাগাদ খবর আসে ইতমিনানকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

কাকা ইরশাদের কথায়, “তখনও কী হয়েছে বুঝতে পারিনি। হাসপাতালে গিয়ে দেখি স্ট্রেচারে শোয়ানো ইতমিনান। জামা-কাপড় ভেসে যাচ্ছে রক্তে। মাথায় বিঁধে রয়েছে গুলি।” এর পরের কয়েকটা ঘণ্টা ট্রমার মধ্যে চলে গিয়েছিল গোটা পরিবার। ইরশাদ বলেছেন, মৃত্যুর সঙ্গে অনেকক্ষণ লড়াই করেছিল ছোট্ট ছেলেটা। কিন্তু জীবন ধরে রাখতে পারল না। রাত ২টোর সময় ডাক্তাররা খবর দেন, মৃত্যু হয়েছে ইতমিনানের।
এই ধর্মের রোষ কী, সেটা বোঝেনা ব্রহ্মপুরীর ইতমিনানের কলোনির ছাপোষা মানুষগুলো। সেখানে হিন্দু-মুসলিমের পাশাপাশি বাস। ইতমিনানের মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিতে এসেছেন হিন্দু মায়েরাও। তাঁদের ছেলের সঙ্গেই খেলা করত ইতমিনান। প্রতিবেশী রাজিয়া বলেছেন, “এখানে আমরা সবাই এক। কোনও বিবাদ নেই। ছেলেটাকে চোখের সামনে বড় হতে দেখেছি। ডাক্তার হবে বলেছিল। ওর কোনও দোষ নেই। বিনা কারণে মেরে ফেলা হল ওকে।”
পণ্ডিত মদন মোহন লাল স্কুলের নবম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রকে শেষবারের মতো দেখতে মহল্লায় এসেছেন প্রধান শিক্ষক থেকে স্কুলের সহপাঠীরাও। “আমরা একসঙ্গে ক্রিকেট খেলতাম। এখন স্কুল বন্ধ। খেলাও হচ্ছে না। গত শুক্রবার ইতমিনানের সঙ্গে শেষ দেখা হয়, ” বন্ধু যে আর নেই মানতেই পারছে না তার সহপাঠীরা। কেন এমন ভয়ঙ্কর মৃত্যু হল, সেই কারণও অজানা চোদ্দ-পনেরোর ছেলেগুলোর কাছে।
আরও দুই বোন আছে ইতমিনানের। শোকার্ত মা বলেছেন, "১৯৮৪ সালের দাঙ্গা দেখেছি। অনেক প্রাণ গিয়েছিল। ছেলেকে হারিয়েছি। আরও মৃত্যু হোক চাই না। হিংসা থামুক। আমার মতোই মায়েদের যেন কোল ফাঁকা না হয়।"