
শেষ আপডেট: 13 February 2019 18:30
বিষয়টা খুলেই বলা যাক। প্রেম দিবসে এই কলেজে পা দিলেই দেখা যাবে অন্য মেজাজ। গোটা কলেজেই হই হই, রই রই, রীতিমতো উৎসবের আবহ। কলেজের মূল বাড়ির কাছাকাছি হোস্টেল লাগোয়া এলাকায় রয়েছে একটা ঝুপসি গাছ। চোখ আটকে যাবে সেখানেই। গোটা গাছের গায়ে নানা রঙের ফিতে, বেলুন দিয়ে সাজানো। ডালপালা থেকে সার বেঁধে ঝুলছে জল ভরা কন্ডোম। আর গাছের গুঁড়ির গায়ে ভালো করে সাঁটা রয়েছে বলিউডের জনপ্রিয় কোনও নায়িকা বা মডেলের ছবি। ছবির গায়েও লাগানো রয়েছে বেলুন বা কন্ডোম। এই গাছই হল ‘ভার্জিন-গাছ’ আর ওই নায়িকা বা মডেল হলেন ভালোবাসার দেবী। এই দেবীর একটা নামও রয়েছে। পড়ুয়াদের ভাষায় ‘দমদমি মাঈ’। তারই পুজো চলে গোটা সপ্তাহ ধরে।
সে পুজোর আয়োজনও বিরাট। গেরুয়া পোশাক পরে পুরোহিত সাজে কলেজেরই কোনও পড়ুয়া। ধূপ, ধুনো, লাড্ডু দিয়ে মন্ত্র আওড়ে চলে পুজো। পুজোর শেষে হয় ঢালাও প্রসাদ বিলি। তবে ‘দমদমি মাঈ’-এর পুজো আর ভার্জিন গাছের সাজসজ্জার দায়িত্বে থাকে ছাত্ররাই। পুজোর উদ্যোগ-আয়োজনও তাদের। কখনও-সখনও হোম-যজ্ঞও হয় গাছের সামনে। পুজো শেষে সন্ধে, রাত অবধি চলে উল্লাস। এ তো গেল, অনুষ্ঠানের কথা। এই পুজোর পিছনে কারণটাও বড়ই আজব। পড়ুয়াদের থুড়ি ছাত্রদের বিশ্বাস নিষ্ঠা ভরে ভার্জিন-গাছ আর ভালোবাসার-দেবীর পুজো দিলেই জীবনে প্রেম আসবে মাত্র ছ’মাসের মধ্যে। আর মহিলারা যারা এই পুজোয় অংশ নেবে এবং প্রসাদ খাবে, তারা খুব তাড়াতাড়ি কুমারিত্ব (‘ভার্জিনিটি’)হারাবে।
হিন্দু কলেজের মতো নামজাদা কলেজের ভিতর এমন একটা রেওয়াজ বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে, অথচ কলেজ কর্তৃপক্ষ নীরব, এই বিষয়ে নানা মহল থেকে আওয়াজ উঠেছিল অনেক আগেই। এ বছর সেই প্রতিবাদ বড় আকার নেয়। কলেজ চত্বরেই বিক্ষোভ শুরু করে ছাত্রছাত্রীরা। মহিলা বিক্ষোভকারীদের দাবি, অশ্লীল একটা রেওয়াজ আস্কারা পাচ্ছে কলেজে। গাছের গায়ে অর্ধনগ্ন অভিনেত্রী, মডেলের ছবি টাঙিয়ে রাখা হয় সপ্তাহভর। তার সামনে দাঁড়িয়ে দিনে-রাতে আরতি করে ছেলেরা। মন্ত্র এবং আরতির গানের কথাও অত্যন্ত কুরুচিকর। নারী শরীরের বর্ণনা দিয়ে গান বাঁধে ছেলেরা।

‘‘পিতৃতন্ত্র চলছে কলেজে। নোংরা ছবি, নোংরা গান, এটাই চলে আসছে বছরের পর বছর। কেউ কিছু বলে না। মেয়েদের জোর করা হয় পুজোয় অংশ নিতে। অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে গোটা কলেজে,’’ জানিয়েছেন অশি দত্ত নামে বছর কুড়ির এক ছাত্রী। আন্দোলনের নেতৃত্বেও রয়েছেন তিনি। অশির দাবি, গাতে গোনা কিছু ছাত্রী এই পুজোয় অংশ নেয়। সেটা মেরেকেটে পাঁচ শতাংশ হবে। তাঁর কথায়, ‘‘শুধু নির্দিষ্ট গাছ নয়, কলেজের ভিতর যত্রতত্র লাগানো হয় কন্ডোম। স্বল্প বসনা নায়িকাদের ছবির দিকে তাকানো যায় না। পড়াশোনার কোনও পরিবেশই নেই কলেজের ভিতর।’’
মহিলা বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ অবশ্য মানতে নারাজ বেশিরভাগ ছাত্রই। প্রেম দিবস উদযাপনের দায়িত্বে থাকা ছাত্র সংগঠনের নেতা বছর উনিশের তেলি ভেঙ্কটেশ বলেছেন, ‘‘কোনও অশ্লীলতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয় না। এটা আমাদের কলেজের ঐতিহ্য। কন্ডোম ঝুলিয়ে সুস্থ ও স্বাভাবিক যৌন জীবনের বার্তা দেওয়া হয়। এইডস বা যে কোনও যৌন রোগ থেকে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়।’’
[caption id="attachment_79895" align="aligncenter" width="604"]
বিক্ষোভ চলছে কলেজে[/caption]
আর নায়িকাদের ছবি? ভেঙ্কটেশের কথায়, ‘‘সবটাই গুজব। খারাপ কোনও পোস্টার লাগানো হয় না। গত বছরই আমরা রণবীর কপূর ও জ্যাকলিন ফার্নান্ডেজের ছবি লাগিয়েছিলাম। তার আগে লাগানো হয়েছিল দিশা পাটানির ছবি। এক এক বছর এক এক জন অভিনেত্রী বা মডেলকে বেছে নেওয়া হয়।’’ কলেজের নাম খারাপ করতেই এমন অভিযোগ আনা হচ্ছে, জানিয়েছেন অঙ্কিতা বিশ্বাস নামে এক ছাত্রী। তাঁর দাবি, মহিলারাও যোগ দেন এই পুজোতে। একটা আনন্দের উৎসবকে অশ্লীলতার মোড়কে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। পড়ুয়াদের এইচআইভি ও সেক্স এডুকেশনের পাঠ পড়াতেই এই প্রচেষ্টা।
https://www.youtube.com/watch?v=lCqi3-0a1iQ&feature=youtu.be
১৯৮০ সাল থেকে চলছে এই রেওয়াজ, এমনটাই জানিয়েছেন কলেজের অধ্যাপক পিকে বিজয়ন। বলেছেন, ‘‘কলেজের ভিতর এখন দু’টো দল। একদল পক্ষে, অপর দল বিপক্ষে। আমরা সবার কথাই শুনছি। বিক্ষোভকারী ছাত্রীদের সঙ্গে একদফা আলোচনা হয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি বিষয়টা মিটিয়ে ফেলা হবে। দ্রুত ক্লাস শুরু করার জন্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বলা হয়েছে।’’