
শেষ আপডেট: 13 May 2019 18:30
প্রথমে বিশ্বাসই হয়নি। ভাবছিলেন, ইয়ার্কি মারছে ছেলে! যেমন হামেশাই করে থাকে। এ-ও আবার সম্ভব নাকি? কেউ এমনটা সত্যি সত্যিই করে?
কিন্তু শেষমেশ দিন দশেক আগে টিকিটের ছবি হোয়াটস্অ্যাপ করতেই টনক নড়ল মায়ের। বলে কি! প্রায় আট হাজার কিলোমিটার উজিয়ে ৭২ হাজার গ্যাঁটের কড়ি খরচা করে দেশে ভোট দিতে আসছে ছেলে। সুদূর জার্মানি থেকে। উৎসব দত্ত। জার্মানির মিউনিখ শহরের একটি বিপণন সংস্থার কর্মী। ২০১৫ সালে পড়াশোনার জন্য বিদেশ পাড়ি। তারপর চাকরি সূত্রে আপাতত সেখানেই ঘাঁটি গেড়েছেন তিনি।
দেখা যায়, প্রিয় দলের খেলা দেখতে অনেকেই নানান দেশে পাড়ি দেন। সে কারণে, বিশ্বকাপের সময় প্লেনের টিকিটের দামও চড়তে থাকে হু হু করে। কিন্তু শুধুমাত্র ভোট দেওয়ার জন্য দেশে ফেরা, এ তো টিভির বিজ্ঞাপনে হয়, বাস্তবেও ঘটে নাকি? প্রশ্ন শুনেই মুচকি হাসলেন উৎসব। “ঘটে বইকি! তবে প্রতিবার হয়তো ঘটতে পারবে না, কিন্তু এ বছরের ভোট তো স্পেশ্যাল ভোট। তাই আমাকে যে আসতেই হবে! ”
সাধারণ বিধানসভা নির্বাচন কিংবা গতবারের লোকসভা নির্বাচন হলেও হয়তো ভোট দিতে আসার এতটা তাগিদ অনুভব করতেন না উৎসব। কিন্তু এবারের ভোট তাঁর কাছে বেশ অন্যমাত্রা পেয়েছে।
রবিবারের দুপুরের মাংস ভাত পর্ব সেরে, মিউনিখ থেকে ফোনে দ্য ওয়ালকে সে কথাই বোঝাচ্ছিলেন উৎসব। “ভারত বলতে যে ছবিটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে, কিছুদিন ধরেই মনে হচ্ছিল তাতে যেন চিড় ধরেছে। কেমন একটা নেই নেই ভাব। আর এই অদ্ভুত পরিস্থিতিই আমাকে ভাবিয়ে তোলে।” ২০১৬ সালের শেষদিকে নোটবাতিলের ঘটনা নাড়িয়ে দেয় উৎসবকে। প্রশ্ন জাগে তাঁর মনে, কোন দিকে চলেছি আমরা? তাঁর মনে হয়, আদৌ কি এ পথ সঠিক? আর যদি সঠিক না-ই হয়, তবে তো একজন নাগরিকই তাঁর মূল্যবান ভোট দিয়ে দেশকে সঠিক পথে চালনা করতে পারেন বলে জানান উৎসব। তবে তিনি এ-ও বলেন, “জানি, আমার একটা ছোট ভোট দিয়ে সমাজ বদলাতে পারব না। কিন্তু আমি কি আমার দায়িত্বটা করব না?”
https://www.youtube.com/watch?v=OPvagMu9o6o&feature=youtu.beযেমন ভাবা তেমন কাজ। ২০১৭-র গোড়াতে মোটামুটি ঠিক করে ফেলেন উৎসব, “নাহ্ এ বারের ভোটটা কোন মতেই মিস্ করা যাবে না। দেশে যেতেই হবে আমাকে।“
স্ত্রী সুচেতাকে প্রথম বলেছিলেন ইচ্ছেটা। এবং স্বাভাবিক ভাবে কথাটা শুনে সুচেতাও খানিকটা চমকে ওঠেন। তারপর অবশ্য আর একটি পথও বাতলে দেন তিনি। সুচেতা জানান, বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে একজন প্রবাসী ভারতীয় তাঁর ভোট রেজিস্টার করতে পারেন। কিন্তু এ সব উপায় মানতে নারাজ উৎসব। তাঁর মতে, খেলা যদি দেখতেই হয় বাড়ির টিভিতে নয়, এক্কেবারে খেলার মাঠে গিয়ে হই হই করে খেলা দেখা উচিত।
“আরে মশাই, ভোট দেব আর ভোটের মহলটা উপভোগ করব না? এ দিক ও দিক রঙবেরঙের পতাকা, রাস্তার মোড়ে ভোটের ক্যাম্প, চায়ে তুফান তোলা আলোচনা... জার্মানিতে থাকি বলে কি সব ভুলতে বসেছি নাকি!”, বেশ জোর গলায় বলে ওঠেন তিনি।
না্হ, উৎসব যে ভোলেননি কিছুই তা তাঁর কথাতে একেবারে স্পষ্ট। বরং প্রতিদিন দেশে কোথায় কী হচ্ছে, কোন লোকসভায় পুনর্নিবাচন হচ্ছে, কোন রাজ্যে কত শতাংশ ভোট পড়ছে, কোথায় কতটা হিংসা হচ্ছে, এ সব বিষয়ে বেশ ওয়াকিবহাল উৎসব।
তাই, প্রথম ভোটের ছবিটা এখনও জ্বলজ্বল করছে তাঁর মনে। উৎসব বলে চলেন, “সেটা ২০১১। পরিবর্তনের ভোট। আমার প্রথম ভোট। মনে আছে, আমাদের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার সময় নন্দীগ্রাম নিয়ে উত্তাল রাজ্য রাজনীতি। প্রথম দিন কালো ব্যান্ড পরে আমরা কয়েকজন পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম। ওই নন্দীগ্রামের ঘটনার বিরোধিতায়।“
১৮ তারিখ ভোর রাতে কলকাতায় নামছেন উৎসব। ১৯ তারিখ তাঁর ভোট। কিন্তু ভোট দিয়েই জার্মানি ফিরতে নারাজ তিনি। ভোট দিচ্ছেন, আর শেষমেশ কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়াল, সেটাও যে তিনি এক্কেবারে ময়দানে বসেই দেখে যেতে চান। তাই ২৩ তারিখ ফল ঘোষণার পরের দিনই জার্মানি রওনা হচ্ছেন তিনি।
অফিসে ছুটি পেতে সমস্যা হয়নি কোনও? সমস্যা না হলেও তাঁর সহকর্মীরা যে বেশ খানিকটা অবাকই হয়েছেন তা অকপটে স্বীকার করলেন উৎসব। জানালেন, “যেই শুনছে সেই প্রথমে খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে যাচ্ছে! মাকে যখন জানাই, মা তো বিশ্বাসই করেনি। কয়েক সপ্তাহ আগে পর্যন্ত ভেবে গিয়েছে আমি নেহাতই মজা করছি। তবে শেষপর্যন্ত টিকিট কাটার পর সত্যি মেনে নেয়, আমি আসছি।” আসার কারণ যাই হোক, বহুদিন পর ঘরের ছেলে আবার ঘরে ফিরছে। আপাতত এই নিয়েই উত্তেজিত মা। প্ল্যান চলছে, ভোটের দিন কী রান্না করা যায়... পাঁঠার মাংস নাকি চিংড়ির মালাইকারি!