দ্য ওয়াল ব্যুরো: ওয়াশিংটন এবং বেজিংয়ের মধ্যে উত্তেজনার পারদ ক্রমেই বাড়ছে। এবার চিনের জিনজিয়াং তথা উইঘুর মুসলিমদের ইস্যু-তে চিনের কমিউনিস্টি পার্টির তিন কর্তার উপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ মেনে নিল আমেরিকা। তাঁদের ভিসাও বাতিল করা হবে বলে জানা গেছে। এই তিন জনের মধ্যে আছেন জিনজিয়াংয়ের কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি চেন কোয়াঙ্গুও।
বৃহস্পতিবার আমেরিকার তরফে জিনজিয়াংয়ের রাজনৈতিক ও আইনি কমিটির (এক্সপিএলসি) সেক্রেটারি ঝু হাইলুন এবং জিনজিয়াং পাবলিক সিকিউরিটি ব্যুরোর (এক্সপিএসবি) বর্তমান পার্টির সেক্রেটারি ওয়াং মিংশানের উপরেও আরোপ করা হয়েছে এই নিষেধাজ্ঞা। নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্তদের মধ্যে সর্বোচ্চ পদাধিকারী চিনা পলিটব্যুরোর সদস্য চেনের বিরুদ্ধে উইঘুর-সহ অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর নজরদারি, বন্দি করা, জোর করে ধর্ম পরিবর্তনের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
ওই তিন কর্তার বিরুদ্ধে ভিসার নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার সময়ে এক বিবৃতিতে আমেরিকার বিদেশসচিব মাইক পম্পেও জানিয়েছেন, চিন কমিউনিস্ট পার্টি অর্থাৎ সিসিপি যেহেতু উইঘুর, কাজাখ এবং জিনজিয়াংয়ের অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মানুষদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, বেআইনি শ্রম, নির্বিচারে গণ-বন্দি এবং জোর করে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করেছে, সে কারণে আমেরিকা পাশে থাকছে না। তাঁদের সংস্কৃতি ও মুসলিম বিশ্বাস মুছে ফেলার চেষ্টা করছে তাঁরা। তাই তাঁদের এবং তাঁদের পরিবারকে আমেরিকা ভিসা দেবে না।

এই শীর্ষ মার্কিন কূটনীতিক সম্প্রতি সিসিপি-র এই নিপীড়নকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দেখা যাওয়া সবচেয়ে তীব্র নৃশংসতা বলেও আখ্যা দিয়েছেন। মানবাধিকারের এতটা লঙ্ঘন এর আগে দেখা যায়নি বলে নিন্দা করেছে।
আমেরিকার ট্রেজারি সেক্রেটারি স্টিভেন মানুচিন এই প্রসঙ্গে এক বিবৃতিতে বলেছেন, “জিনজিয়াং এবং বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার নির্যাতনকারীদের জবাবদিহি করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র তার ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করবে।” জিনজিয়াং প্রদেশে ১০ লাখেরও বেশি মুসলিমকে ক্যাম্পে আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে বলেই দাবি আমেরিকার। তবে বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে বেজিং।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রবীণ চিনা গবেষক মায়া ওয়াং-ও এ প্রসঙ্গে একমত হয়েছেন। তিনি বলে, “নির্দিষ্ট কয়েকজন চিনা আধিকারিকদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে তাঁদের গতিবিধি ও সম্পত্তির পরিমাণ দুই-ই নিয়ন্ত্রণে আসবে। ফলে ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহারের সম্ভাবনা কম হতে পারে। এই নিষেধাজ্ঞা ভবিষ্যতের জন্য জরুরি।”
চিনের জিনজিয়াং প্রদেশের উইঘুর মুসলিম নির্যাতনের কাহিনি নতুন নয়। জিনজিয়াং কাগজে কলমে স্বায়ত্তশাসিত হলেও, আদতে চিন সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। এই অঞ্চলের শহরগুলোর ভেতর দিয়েই গেছে সিল্ক রোড। তাই জিনজিয়াংয়ের অর্থনীতি কৃষি ও বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল।
গত শতাব্দীর শুরুর দিকে উইঘুররা নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কিন্তু ১৯৪৯ সালে চিনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কিছুদিন পরে চিনের কমিউনিস্ট সরকার উইঘুরদের বৃহত্তর চিনের সাথে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব জানায়। প্রস্তাব মেনে না নেওয়ার পর থেকেই শুরু হয় উইঘুর মুসলিমদের উপর নির্যাতন। জন্ম নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে ধর্ম পালন করায় বাধা সহ একাধিক নির্যাতনের সম্মুখীন এখানকার মানুষরা।
কূটনীতিকরা বলছেন, তিব্বত থেকে জিনজিয়াং প্রদেশে যাওয়ার একমাত্র মসৃণ পথ আকসাই। এই পথ ব্যবহার করতে না পারলে চিনকে কারাকোরাম হয়ে বিকল্প পথে পৌঁছতে হবে, যা অনেক বেশি কঠিন। ফলে জিনজিয়াং প্রদেশের উপর থেকে চিনের দখল থাকা জরুরি। কিন্তু এখন এই প্রদেশে বছরের পর বছর ধরে চিনের অকথ্য অত্যাচার সারা বিশ্বের কাছে সমালোচিত।