দ্য ওয়াল ব্যুরো: কোভিড-১৯ সংক্রমণ সারাতে চিন, জাপান, রাশিয়া ও ইতালিতে জাপানি অ্যান্টি-রেট্রোভাইরাল ড্রাগ ফ্যাভিপিরাভিরের ট্রায়াল চলছে বলে আগেই জানিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা। এবার ভারতেও করোনার চিকিৎসায় এই ওষুধের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হতে চলেছে। দেশের ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেলের অনুমোদনে ফ্যাভিপিরাভিরের ক্লিনিকাল ট্রায়াল শুরু করতে চলেছে মুম্বইয়ের গ্লেনমার্ক ফার্মাসিউটিক্যালস।
সরকারি সংস্থা সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ তথা সিএসআইআর (CSIR)-ডিরেক্টর জেনারেল শেখর সি মান্ডে বলেছিলেন, করোনা রোগীদের উপরে ভাল করতে পারে এই অ্যান্টি-রেট্রোভাইরাল ড্রাগ। চিন, জাপানে এই ওষুধের সুফলের কথা আগেই সামনে এসেছে। ইতালিতেও এই ড্রাগের ট্রায়াল চলছে বলে জানা গিয়েছিল। শেখর সি মান্ডে বলেছিলেন, ভারতেও এই ওষুধের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হবে। অন্যান্য অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ যেমন ইবোলার ড্রাগ রেমডেসিভির, এইচআইভির ওষুধ লোপিনাভির ও রিটোনাভিরের মতো ফ্যাভিপিরাভিরকেও ক্লিনিকাল ট্রায়ালের তালিকায় রাখা হয়েছে।
শেখর মান্ডের কথায়, ফ্যাভিপিরাভিরে ‘এন্ড টু এন্ড সিন্থেসিস’ হয়ে গিয়েছে। দেখা গিয়েছে, এই ওষুধ উৎপাদনের জন্য বিদেশ থেকে কোনও উপাদান আমদানির প্রয়োজন নেই। সবই এ দেশে রয়েছে।
জাপানি ড্রাগ ‘ফ্যাভিপিরাভির’ (Favipiravir) বা টি–৭০৫ বানিয়েছে জাপানের ফুজিফিল্ম টোয়ামা কেমিক্যাল। এই ড্রাগের ব্র্যান্ড নাম হল ‘অ্যাভিগান’ । ২০১৪ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের প্রকোপ যখন মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তখন এই ওষুধ বানিয়েছিল জাপানের অন্যতম বড় ফার্মাসিউটিক্যালস ফুজিফিল্ম। ইনফ্লুয়েঞ্জা সারাতে এই ড্রাগ সেই সময় বিজ্ঞানীদের বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছিল। যেহেতু ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সঙ্গে সার্স-কভ-২ ভাইরাসের জিনের কিছুটা মিল আছে, তাই এই মারণ ভাইরাসজনিত রোগ কোভিড-১৯ সারাতেও ফ্যাভিপিরাভির একইভাবে কাজ করবে বলেই দাবি গবেষকদের।
কীভাবে কাজ করবে এই অ্যান্টি-ভাইরাল ড্রাগ
বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্যারাজাইকার্বোক্সামাইডের ডেরিভেটিভ হল এই ড্রাগ। পশুদের উপর পরীক্ষা করে এই ড্রাগের সুফল মিলেছে। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, হলুদ জ্বর, হাত ও পায়ের যে কোনও ভাইরাল ইনফেকশন কমাতে পারে এই ওষুধ। মূলত এই ড্রাগের রাসায়নিক ফর্মুলা আরএনএ (RNA) ভাইরাসের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে পারে। করোনাভাইরাসের বিটা-পরিবারের এই ভাইরাল স্ট্রেন সার্স-সিওভি-২ (SARS-COV-2)সিঙ্গল-স্ট্র্যান্ডেড আরএনএ ভাইরাস। এর স্পাইক প্রোটিন হোস্ট সেল বা বাহক কোষের প্রোটিনের সঙ্গে জোট বেঁধেই কোষে প্রবেশ করছে।

বহুবার জিনের গঠন বদলে বা জেনেটিক মিউটেশনের কারণে এই ভাইরাল স্ট্রেন অনেক বেশি প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। এতবার তার মধ্যে রাসায়নিক বদল হচ্ছে যে এই ভাইরাসকে রোখা সম্ভব হচ্ছে না। আর পাঁচটা সাধারণ ফ্লু ভাইরাসের থেকে তাই অনেক বেশি সংক্রামক হয়ে উঠেছে বিটাকরোনার এই বিশেষ স্ট্রেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই অ্যান্টিভাইরাল-ড্রাগ ফ্যাভিপিরাভির এই জেনেটিক মিউটেশনটাকেই বন্ধ করে দেবে। জিনের গঠন বদলাতে না পারলে ভাইরাসের আক্রমণাত্মক ক্ষমতাও ধীরে ধীরে কমে যাবে। মানুষের কোষে এই ড্রাগের কোনও টক্সিক-প্রভাব এখনও দেখা যায়নি। আরএনএ বা ডিএনএ সিন্থেসিসেও এই ড্রাগ বাধা দেয় না বলে দাবি বিজ্ঞানীদের। তাই এর ক্ষতিকর কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এখনও দেখা যায়নি।
চিন, জাপান, ইতালিতে এই ড্রাগের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। ম্যাসাচুসেটসের তিনটি হাসপাতালে রোগীদের উপরে এই ড্রাগ প্রয়োগ করা হয়েছে। এই ড্রাগের নির্মাতা সংস্থা ফুজিফিল্ম বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, ম্যাসাচুসেটসের জেনারেল হাসপাতাল, ব্রিঘাম ও ওমেন’স হাসপাতাল এবং ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস মেডিক্যাল স্কুলের ৫০ জন করোনা আক্রান্ত রোগীর উপরে এই ড্রাগের ট্রায়াল হয়েছে।