দ্য ওয়াল ব্যুরো: যাত্রা শুরুর কালে ছিল ১৪ দল। গত সতেরো বছরে একে একে ছেড়ে গিয়েছে প্রায় সব শরিক। ইউপিএ বা ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ অ্যালায়েন্সে এখন বলতে গেলে আছে শুধু কংগ্রেস আর এক-দুটো ছোট আঞ্চলিক দল। কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতারাও তাই একান্তে মানছেন, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিছু ভুল বলেননি যে, ইউপিএ-র কোনও অস্তিত্ব নেই। সম্ভবত সেই কারণেই তৃণমূল নেত্রীর বক্তব্য খণ্ডন করে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় নেতৃত্ব এখনও পর্যন্ত জোরালো কোনও বিবৃতি দেয়নি।
কী অবস্থায় আছে ইউপিএ?
কংগ্রেস সূত্রে জানা যাচ্ছে, বিজেপিকে আটকানোর লক্ষ্যে তৈরি ওই জোট এতটাই অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে যে স্মরণকালের মধ্যে জোটের চেয়ারপার্সন কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গান্ধী ইউপিএ-র বৈঠক ডাকেননি। ১৪ দলের মধ্যে সাকুল্যে চারটিও আর ওই জোটে নেই। শরিকদের পাশাপাশি ছেড়ে গিয়েছে ইউপিএ-র সমর্থক দলগুলিও। তবে বিজেপি বিরোধী অবস্থানে বাম দলগুলির মতো সংসদে এবং রাজ্যে রাজ্যে অনেক দলকেই এখনও কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে আন্দোলনে শামিল হতে দেখা যাচ্ছে। যেমন, গত সোমবার সংসদে কংগ্রেসের রাজ্যসভার নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গের ডাকা বৈঠকে ১২টি দল যোগ দিয়েছিল। যৌথ বিবৃতিতেও সই করে তারা। তবে ওই বৈঠক ইউপিএ-র বৈঠক ছিল না।
ইউপিএ-র সঙ্গে মমতার প্রস্তাবিত জোটের ফারাক কোথায়?
তৃণমূলের বক্তব্য, ইউপিএ-র এই দুর্দশার কারণেই তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির বিরুদ্ধে নতুন বিকল্প মঞ্চ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। আর সতেরো বছর আগের ইউপিএ-র জন্মপর্বে চোখ ফেরালেই বোঝা যাবে, তৃণমূল নেত্রীর প্রস্তাবিত নয়া জোটের ফারাক কোথায়। বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর বিকল্প সরকার গড়ার লক্ষ্যে গড়ে ওঠে ইউপিএ। সেই জোট গঠনের মূল কারিগর ছিলেন সিপিএমনের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক হরকিষেন সিং সুরজিৎ এবং বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। বিজেপি বিরোধী দলগুলিকে কংগ্রেসের পাশে শামিল করতে তৎপর হন দুই মার্কসবাদী নেতা।

অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তি, নেতৃত্বে কংগ্রেসকে রাখা নিয়েই। তাঁর কথায়, বিজেপিকে মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেওয়ার অধিকার কংগ্রেস হারিয়েছে। তারা একের পর এক নির্বাচন হেরেছে। এখন দলটাই ভেঙে যাচ্ছে। সেই দলকে নেতৃত্বে রেখে কী ভাবে বিজেপি বিরোধিতা সম্ভব?
সতেরো বছর আগে ইউপিএ জোট গঠনের সময়ও বিজেপি বিরোধিতাকে মূল ইস্যু করলেও কংগ্রেসকে যথেষ্ট চাপে রেখেছিলেন সুরজিৎ, বসুরাও। ইউপিএ গঠনের প্রক্রিয়ায় দুই বাম নেতার এতটাই প্রভাব ছিল যে, উত্তর প্রদেশের রাজনীতির অঙ্কে মুলায়ম সিং যাদবের সমাজবাদী পার্টি এবং অজিত সিংয়ের রাষ্ট্রীয় লোকদলকে কংগ্রেস না চাইলেও সুরজিৎ জোট গঠনের চূড়ান্ত বৈঠকে ওই দুই নেতাকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হন।
ইউপিএ-র শরিকেরা এখন কে কোথায়?
কংগ্রেস ছাড়া ইউপিএ-র বাকি শরিকেরা ছিল আরজেডি, ডিএমকে, এনসিপি, পিএমকে, টিআরএস, জেএমএম, এলজেপি, এমডিএমকে, এআইএমআইএম, পিডিপি, আইইউএমএল, আরপিআই (এ), আরপিআই (জি) এবং কেসি (জে)। জোট গঠনে প্রধান ভূমিকা নিলেও সুরজিতের পার্টি সিপিএম এবং সিপিআই, আরএসপি ও ফরওয়ার্ড ব্লক ইউপিএ-তে যোগ দেয়নি। ন্যূনতম অভিন্ন কর্মসূচির রূপায়নের শর্তে ইউপিএ-কে বাইরে থেকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেয় চার বাম দল।
কিন্তু দু’বছরের মাথায় মন্ত্রিসভা এবং ইউপিএ ছেড়ে যায় তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি। ন্যূনতম অভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে বিরোধের জেরে তার পরের বছর অর্থাৎ ২০০৭-এ ইউপিএ ত্যাগ করে দক্ষিণের আর এক দল ভাইকোর এমডিএমকে। ২০০৮-এর মাঝামাঝি আমেরিকার সঙ্গে পরমাণু চুক্তি সই ঘিরে বামেদের সঙ্গে মনমোহন সরকারের বিরোধ চরমে ওঠে। ইউপিএ-র উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয় বামেরা। কিন্তু সংখ্যালঘু সরকারকে লোকসভায় বাঁচিয়ে দেয় মুলায়ম সিং যাদবের সমাজবাদী পার্টি।
পরের বছর অর্থাৎ ২০০৯-এ পর পর ইউপিএ ছেড়ে যায় কাশ্মীরের পিডিপি এবং তামিলনাডুর পিএমকে। দুই দলই নিজের নিজের রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের অঙ্কে কংগ্রেসের সঙ্গ ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
বামেদের সঙ্গে কংগ্রেসের বিরোধ এবং চার বামদল ইউপিএ-র উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের পর থেকেই বঙ্গ রাজনীতির চাকাও দ্রুত ভিন্ন দিকে মোড় নিতে শুরু করে। কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূলের বোঝাপড়া তৈরি হয়। ২০০৯-এর লোকসভা নির্বাচনে দুই দল এক জোট হয়ে বাংলায় বামেদের জোর ধাক্কা দেয়। তারপর একের পর এক পুরভোট এবং ২০১১-র পরিবর্তনে বিধানসভা নির্বাচন দুই কংগ্রেস হাতে হাত রেখে লড়াই করে সিপিএমকে ক্ষমতাচ্যুত করে। কিন্তু দুই কংগ্রেসের রাজনৈতিক ভাব-ভালবাসা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ২০০৯-এ ইউপিএ-টু মন্ত্রিসভায় রেলমন্ত্রী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দু’বছরের মাথায় তিনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নানা বিষয়ে নিজের মতামত চাপিয়ে দিতে থাকেন বলে কংগ্রেসের অভিযোগ। তার মধ্যে অন্যতম হল, রেলের যাত্রী ভাড়া বাড়াতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত। তাঁকে অন্ধকারে রেখে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করায় দীনেশ ত্রিবেদীকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে নেন মমতা।
এরই মধ্যে, ২০১০-এ সংসদে মহিলা সংরক্ষণ বিলের বিরোধিতার প্রশ্নে ইউপিএ ত্যাগ করে লালুপ্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল। ওদিকে, শ্রীলঙ্কায় বসবাসকারী তামিলদের মানবাধিকার হরণের ঘটনায় ভারত সরকার নীরব বলে অভিযোগ তুলে ২০১২-তে ইউপিএ ছেড়ে যায় ডিএমকে। যদিও ততদিনে ডিএমকের মন্ত্রী এ রাজার বিরুদ্ধে টেলিকম কেলেঙ্কারির অভিযোগ ঘিরে মনমোহন সরকার জেরবার হতে শুরু করে। ওই বছরর শেষপ্রান্তে নানা প্রশ্নে বিরোধের কারণে ইউপিএ ছাড়ে তৃণমূল কংগ্রেসও। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল আপত্তি ছিল খুচরো ব্যবসায় বহুজাতিক সংস্থাকে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত। একই ইস্যুতে ইউপিএ ছাড়ে ঝাড়খণ্ডের জেভিএম-পি পার্টি এবং এআইএমআইএম।
কংগ্রেস ও ইউপিএ
২০০৪-এর লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস পেয়েছিল ১৪৫টি আসন, বিজেপির থেকে মাত্র সাতটি বেশি। ১৪ শরিকের প্রথম ইউপিএ সরকারের কাজকর্মের সুবাদে কংগ্রেস ২০০৯-এর লোকসভা ভোটে দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় ফেরে। আসন পায় ২০৬টি। কিন্তু একের পর এক শরিক ইউপিএ ছেড়ে যাওয়ায় ২০১৪-র লোকসভা ভোটে সনিয়া গান্ধীর পার্টির জোটে মাত্র ৪৪টি আসন, কম প্রাপ্তির নিরিখে কংগ্রেসের জন্য তা এখনও রেকর্ড।