
শেষ আপডেট: 13 August 2020 18:30
গালওয়ান উপত্যকার সংঘর্ষই শুধু নয়, গত মে থেকে জুন মাসের মধ্যে একাধিকবার চিনের বাহিনীর মুখোমুখি হয়েছে ভারতীয় সেনা। আইটিবিপি জানাচ্ছে, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর টহলদারির সময় লাদাখে আকছার চিনা সেনা নিয়্ন্ত্রণ রেখা টপকে ভারতের দিকে চলে আসে। তা সিকিম সেক্টরেও মাঝে মধ্যে হয়। কিন্তু প্রতিবারই দেখা যায়, দুই পক্ষের মিলিটারি কমান্ডার স্তরে বৈঠকের পর বিরোধ মীমাংসা স্থানীয় ভাবেই হয়ে যায়। তাতে কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু মে মাসের গোড়া থেকে শুধু সীমান্ত উত্তেজনাই বাড়াচ্ছে না চিনের ফৌজ, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর ভারতীয় নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ঢুকে আসার চেষ্টাও করছে। আইটিবিপি-র এক অফিসার জানিয়েছেন, এই ক’মাসে আরও কয়েকবার চিনের বাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে ভারতীয় জওয়ানদের। শত্রুপক্ষের মোকাবিলা করতে ১৭-২০ ঘণ্টা লড়াইয়ের অভিজ্ঞতাও আছে সেনাবাহিনীর। আইটিবি ডিরেক্টর জেনারেল এসএস দেশওয়াল বলেছেন, স্বাধীনতা দিবসের দিনে ২১ জন শহিদ জওয়ানের নাম গ্যালান্ট্রি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত করা হয়েছে।
এর আগে গত ৫ মে লাদাখের প্যাঙ্গং লেকের কাছে প্রায় আড়াইশ জন ভারতীয় ও চিনের সেনা জওয়ান রীতিমতো লাঠিসোটা, লোহার রড নিয়ে লড়াই করে। একে অপরের দিকে আধলা পাথরও ছোড়ে। তাতে আহত দু’পক্ষেরই বেশ কয়েক জন। এরপরে ৯ মে সিকিম-চিন সীমান্তে নাকু লা-তে দু’দেশের প্রায় দেড়শ সেনা মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। তাতে দু’পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন।
২০১৭ সালে ডোকলামে ৭৩ দিন ধরে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল ভারত ও চিনের সেনাবাহিনী। ইন্দো-টিবেটান বর্ডার পুলিশ জানাচ্ছে, লাদাখে ভারতের সেনার সংখ্যা প্রতিপক্ষের চেয়ে অনেক বেশি। ভারতীয় বাহিনীর শক্তিও বেশি। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যে কোনও পরিস্থিতিতে শক্রপক্ষকে কাবু করার ক্ষমতা রাখে।
ভারত-চিন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় জমিতে স্পষ্ট কোনও সীমা নেই। পেট্রোলিং পয়েন্ট হল চিহ্নিত এলাকা যেখানে সেনাবাহিনী টহল দিতে পারে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় বরাবর এমন কয়েকটি পেট্রোলিং পয়েন্টকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে। তবে ভারত-পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণরেখা তথা এলওসি-র মতো এই পেট্রোলিং পয়েন্টগুলো কোনও সেনা ঘাঁটি নয়। শুধুমাত্র চিহ্নিত করে দেওয়া কিছু এলাকা। যেখানে সংযম বজায় রেখে দুই দেশের বাহিনীই টহল দিতে পারে। এখন কোন পয়েন্টে কোন দেশের বাহিনী কতটা এলাকাজুড়ে টহল দেবে সেই নিয়ে একটা ঠাণ্ডা যুদ্ধ চলতেই থাকে। ভারতীয় বাহিনী যে এলাকায় টহল দেয় সেখানে সিগারেটের প্যাকেট বা খাবারের টিন ফেলে রাখে। যার অর্থ চিনের সেনাদের এটা বোঝানো যে ওই এলাকা ভারতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পেট্রোলিং পয়েন্ট বা পিপি ১৫ রয়েছে গালওয়ান উপত্যকা বরাবর। এই এলাকার দখল নিয়েই দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। অন্যদিকে, পিপি ১০, পিপি ১১, পিপি ১২ ও পিপি ১৩ পয়েন্ট রয়েছে উত্তর লাদাখে, দেপসাং সমতলভূমি বরাবর। রাকি নালা থেকে জীবন নালা পর্যন্ত, যেটা এলএসি-র কাছাকাছি পড়ে না। এই পয়েন্টগুলো ভারতীয় সেনার নিয়ন্ত্রণাধীন। তবে গালওয়ানের সংঘর্ষের পর থেকে এই দেপসাং ভূমিতেও চিন নিজেদের বাহিনী ঢুকিয়ে দিয়েছে বলে দাবি।
প্যাঙ্গং লেকের উত্তরে সবুজে ঢাকা উপত্যকাও লাল ফৌজের নিশানায় রয়েছে। ৫০০০ মিটার বিস্তীর্ণ এই উপত্যকাকে বলে ‘গ্রিন টপ’ । গত ১৫ জুন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় দুই দেশের বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পরে এই উপত্যকাতেও ঢুকে আসে চিনের বাহিনী। এরপরে বহুবার দুই দেশের সেনা কম্যান্ডার পর্যায়ের বৈঠকে গ্রিন টপ থেকে সেনা সরাতে বলা হয় চিনকে। কিন্তু নানা টালবাহানা করে এড়িয়ে যায় চিন। গত সপ্তাহেই চিনের বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন দাবি করেছিলেন, সমস্ত বেস পয়েন্ট থেকেই সেনা সরিয়ে নিয়েছে চিন। কিন্তু ভারতীয় সেনা সূত্র জানাচ্ছে, প্যাঙ্গং লেকের ফিঙ্গার পয়েন্টগুলো তো বটেই সবুজে ঘেরা ওই উপত্যকাও নিজেদের দখলে রেখেছে চিনা বাহিনী। ফলে ওই এলাকায় পৌঁছতে পারছে না ভারতীয় জওয়ানরা।গ্রিন টপ থেকে সোজা রাস্তা চলে গেছে পিপলস লিবারেশন আর্মির বেস ক্যাম্প অবধি। সেখান থেকেই ওই এলাকার উপর নজর রেখেছে লাল ফৌজ। প্যাঙ্গং রেঞ্জের উত্তরে আট পাহাড়ি ফিঙ্গার পয়েন্টেও তৎপর চিনের সেনা। এতদিন ফিঙ্গার পয়েন্ট ৪ এলাকায় ভারতীয় বাহিনী টহল দিত। কিন্তু ফিঙ্গার পয়েন্ট ৮ দিয়ে ঢুকে এসে ফিঙ্গার ৪ ও ফিঙ্গার ৫ এর মধ্যবর্তী এলাকায় তাঁবু খাটিয়ে বসে গেছে লাল ফৌজ। ফলে ফিঙ্গার ৪ অবধি পৌঁছতে পারছে না ভারতীয় বাহিনী। এই ফিঙ্গার পয়েন্ট ৪ এলাকার কাছেই রয়েছে গ্রিন টপ। কাজেই চিনা বাহিনীকে টপকে ওই এলাকাতেও যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।