
শেষ আপডেট: 12 January 2024 17:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সিবিআই ও ইডির লাগাতার হানা ও তদন্ত-তল্লাশিতে গত প্রায় এক বছর ধরে জেরবার তৃণমূলের উত্তর ২৪ পরগনার সংগঠন। মন্ত্রী, বিধায়ক, প্রাক্তন মন্ত্রী, পুরসভার চেয়ারম্যান, প্রাক্তন চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর-- এই তদন্ত জাল থেকে কোনও স্তরের নেতাই বাদ যাননি। যা দেখে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক নকশার আশঙ্কা করছে রাজ্যে শাসক দল। জোড়াফুলের রাজ্য নেতাদের অনেকের মতে, এর নেপথ্যে রয়েছে বিজেপির ভোট নকশা। চব্বিশের লোকসভা ভোটের কথা মাথায় রেখে আসন ভিত্তিক এই আঘাত চলছে।
কখনও চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি, কখনও ভোট পরবর্তী হিংসা মামলা, কখনও নিয়োগ দুর্নীতি এবং রেশন দুর্নীতির তদন্তের সূত্রে এই জেলায় তদন্ত অভিযান চালিয়েছে কেন্দ্রীয় এজেন্সি। শুক্রবার সর্বশেষ ঘটনা হল, দমকল মন্ত্রী সুজিত বসু এবং বরানগরের বিধায়ক তথা তৃণমূলের ব্যারাকপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতি তাপস রায়ের বাড়িতে ইডির তল্লাশি।
উত্তর ২৪ পরগনা বড় জেলা। এই জেলায় লোকসভার ৫টি আসন রয়েছে। বনগাঁ, বারাসত, বসিরহাট, দমদম এবং ব্যারাকপুর। এর মধ্যে গত লোকসভা ভোটে বনগাঁ ও ব্যারাকপুরে জিতেছিল বিজেপি। আবার অতীতে একবার জোড়াফুলের সমর্থন নিয়ে দমদম লোকসভা আসনে জিতেছিলেন বিজেপির তপন শিকদার।
দমদমে উনিশের লোকসভা ভোটে ৩ শতাংশেরও কম ব্যবধানে হেরেছিল বিজেপি। তৃণমূলের সৌগত রায় পেয়েছিলেন ৫ লক্ষ ১২ হাজার ভোট। আর বিজেপির শমীক ভট্টাচার্য পেয়েছিলেন ৪ লক্ষ ৫৯ হাজার ভোট। অর্থাৎ ৫৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে জিতেছিলেন সৌগত রায়।
আবার ব্যারাকপুরে বিজেপির অর্জুন সিং জিতলেও এখন তৃণমূলে চলে গেছেন। তা ছাড়া উনিশের লোকসভা ভোটে ব্যারাকপুরে খুব বেশি ব্যবধানে জেতেনি বিজেপি। তৃণমূলের তুলনায় মাত্র ১৪ হাজার বেশি ভোট পেয়েছিলেন অর্জুন।
বারাসতে তৃণমূলের কাকলি ঘোষদস্তিদার জিতেছিলেন ১ লক্ষ ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে। সেখানে আবার ফরওয়ার্ড ব্লক ১ লক্ষ ২৪ হাজার ভোট পেয়েছিল। একমাত্র বনগাঁয় স্বস্তিজনক ব্যবধানে জিতেছিলেন বিজেপির মতুয়া নেতা শান্তনু ঠাকুর।
বিজেপি যে এবার এই জেলার ৫টি লোকসভা আসনের মধ্যে ৪টিতেই জেতার টার্গেট নিয়েছে তা বাস্তব। শুভেন্দু অধিকারী ঘরে বাইরে তা বলে বেড়াচ্ছেন। একমাত্র বসিরহাট লোকসভা আসনটি বিজেপি একপ্রকার বাদের খাতায় দিয়ে রেখেছে। কারণ সেখানে সংখ্যালঘু জনসংখ্যা এতবেশি যে বিজেপি সুবিধা করতে পারবে না বলেই অনেকে মনে করছেন।
তৃণমূলের রাজ্য নেতৃত্বের একাংশের মতে, এই হিসাবটাকে সামনে রাখলেই বিজেপির খেলা বোঝা যাবে। বারাসত লোকসভার মধ্যে পড়ে হাবরা ও মধ্যমগ্রাম বিধানসভা। হাবরার বিধায়ক হলেন বনমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। ইতিমধ্যে তাঁকে গ্রেফতার করেছে ইডি। সেই সঙ্গে মধ্যমগ্রামের বিধায়ক রথীন ঘোষের বাড়িতে ইডি তল্লাশি চালিয়েছে। সুজিত বসুর নির্বাচন কেন্দ্রও বারাসত লোকসভার মধ্যেই পড়ে।
বনগাঁয় শঙ্কর আঢ্য ছিলেন দাপুটে নেতা। তাঁকেও গ্রেফতার করেছে ইডি। সেই সঙ্গে সন্দেশখালির প্রতাপশালী নেতা শেখ শাহজাহান ইডির ভয়ে ফেরার।
এদিকে কামারহাটি পুরসভার চেয়ারম্যান গোপাল সাহাকে বেশ কয়েকবার জেরা করেছে ইডি। বরাহনগরের চেয়ারম্যান অপর্ণা মৌলিককেও পুর নিয়োগ দুর্নীতির তদন্ত সূত্রে জেরা করা হয়েছে। কামারহাটির বর্তমান বিধায়ক তথা প্রাক্তন মন্ত্রী মদন মিত্রর বাড়িতেও তল্লাশি চলেছে। তা ছাড়া বরানগর, কামারহাটি, পানিহাটি, টিটাগড় এবং উত্তর দমদম পুরসভায় তল্লাশি চালিয়েছে কেন্দ্রীয় এজেন্সি।
তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে তাপস রায় বরাহনগরের বিধায়ক এবং ব্যারাকপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতি। তৃণমূলের বহু নেতার মতে, রাজনৈতিক নকশা না থাকলে তাপস রায়ের বাড়িতে ইডি যেত না। কারণ, তাপসবাবু সজ্জন নেতা বলেই পরিচিত।
এই সবটা মিলিয়ে শাসক দল দুয়ে দুয়ে চার করতে চাইছেন। তবে বিজেপি নেতা সজল ঘোষ এদিন বলেন, “এসব ছেঁদো কথা কেউ শুনবে না। বিজেপি এবার এমনিই এই সব আসনে জিতবে। বরং আসল কথাটা এখন বেরিয়ে পড়ছে। বোঝা যাচ্ছে তৃণমূলের সবাই চোর। সবাই।”