
শেষ আপডেট: 4 June 2019 18:30
কোলাপুরে জন্ম ১৯৩৫ সালে। ছেলেবেলাতেই মা-বাবার হাত ধরে পুণেতে চলে আসেন মঙ্গেশ। স্নাতকের পাঠ চুকিয়ে চাকরি পান এক অস্ত্র কারখানায়। পেশার আড়ালে চাপা পড়ে যায় শিল্পী মন। তবে চাকরি বেশিদিনের নয়। সব ছেড়ে একসময় রঙতুলি হাতে তুলে নেন। শুরু হয় সমাজের নানা বিষয় নিয়ে লেখালিখিও।


আর পাঁচজনের থেকে তিনি ছিলেন অনেকটাই আলাদা। ফ্রিলান্স শিল্পী হিসেবে সারাটা জীবন কাটিয়েছেন। রোজগারের অনিশ্চয়তা থাকলেও, বিষাদ তাঁকে কোনও দিন গ্রাস করেনি। আর্ট কলেজের গড়পড়তা ডিগ্রি নেই। তবে অবজারভেশন ছিল তুখোড়। পত্রপত্রিকায় ইলাস্ট্রেশন করতে শুরু করেন। কার্টুন-আঁকিয়ে হিসেবে পরিচিতি বাড়তে থাকে।
১৯৫৪ সালে ‘ক্যারিকেচারিস্ট’ হিসেবে নাম ছড়ায় মঙ্গেশ তেন্ডুলকরের। কখনও তাঁর স্কেচে জীবন্ত হয়ে ওঠে পেট্রলের মূল্যবৃদ্ধি, কখনও গরিব মানুষের আর্তকান্না আবার কখনও প্রাক-নির্বাচন ও নির্বাচন-পরবর্তী নানা সময়ের মজাদার সিচুয়েশন। যে কোনও পরিস্থিতিকেই অপূর্ব দক্ষতায় জীবন্ত করে তুলতে পারতেন মঙ্গেশ। তাঁর মুনশিয়ানা শুধু স্ট্রিপ কার্টুনেই নয়, ইলাস্ট্রেশনেও ছিল অসাধারণ বৈচিত্র। অসম্ভব ভাল আঁকতেন গল্পের ছবি, বুক কভার।



লেখার হাতও ছিল অসাধারণ। ‘ভুইচক্র,’ ‘সানডে মুড’ (৫৩ রকমের কার্টুন ও প্রবন্ধের একত্রীকরণ), ‘কুনি পাম্পাতো অজুন কালোখ’-এর মতো অসংখ্য বই তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত। গঠনমূলক কার্টুনের জন্য জীবনের নানা সময় একাধিক পুরষ্কার পেয়েছেন মঙ্গেশ। ১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরষ্কার ঝুলিতে পুরেছেন।
হাঁটু ঝুল পাঞ্জাবী-পায়জামার মানুষটার সবচেয়ে বেশি পরিচিতি ছিল সমাজসেবী হিসেবে। ছবি এঁকেই শিক্ষা-অর্থনীতির নানা জটিল বিষয়ে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতেন। তিনি মনে করতেন, বইয়ের অক্ষরের চেয়ে চোখের সামনে কোনও জিনিসকে জীবন্ত ভাবে দেখতে পেলে তার উপযোগিতা অনেক বেশি বাড়ে। পথে ঘাটে, ট্রাফিক সিগন্যালে তাই মানুষকে সচেতনার পাঠ পড়াতে এই অভিনব পন্থা নিয়েছিলেন মঙ্গেশ। ‘সেফ ড্রাইভ, সেভ লাইফ’-এর ধারণা অনেক আগেই নিজের কার্টুনের মাধ্যমে আমজনতাকে বুঝিয়েছিলেন তিনি। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে মৃত্যু হয় মঙ্গেশ তেন্ডুলকরের। তার আগে ১৮ বছর ধরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে সাধারণ মানুষকে সচেতনতার পাঠ পড়িয়েছেন তিনি।
‘‘দিনে দিনে পথ দুর্ঘটনা বাড়ছে। অসাবধানতার শিকার হচ্ছেন পথচারীরা। হারাচ্ছেন আপনজনদের। প্রশাসন ট্রাফিক আইনের মর্ম বোঝাচ্ছে ঠিকই, তবে সমাজের একজন হয়ে আমারও দায়িত্ব থাকে আমজনতাকে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় বার্তা দেওয়া,’’ দিবারাত্র ট্রাফিক সিগন্যালে মানুষকে সচেতনতার পাঠ দেওয়া এই ব্যক্তির লক্ষ্য ছিল এটাই। এই কাজে পুণে পুলিশের ট্রাফিক ব্রাঞ্চও পাশে দাঁড়িয়েছিল মঙ্গেশের। ‘অটোমোটিভ রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া’ (ARAI)তাঁর আঁকা কার্টুন পথ সুরক্ষার প্রচারের জন্য ব্যবহার করত।

মঙ্গেশ তেন্ডুলকরের ছবি আঁকার প্রেরণা ছিলেন তাঁর ভাই বিজয় তেন্ডুলকর। স্ক্রিনরাইটার, লেখক, সমাজসেবী বিজয়কে পদ্ম ভূষণে সম্মানিত করেছিল সরকার। মঙ্গেশের পরিবার জানিয়েছেন, দাদার জন্য ফরাসি কার্টুনিস্ট, ছবি আঁকিয়েদের নানা রকম কালেকশন বাড়িতে জড়ো করে রাখতেন বিজয়। বাইকে চড়েই ঘুরে বেড়াতেন হিল্লিদিল্লি, গাড়ি কেনার ঘোর বিরোধী ছিলেন মঙ্গেশ। যেখানেই সচেতনতার অভাব, কুসংস্কারের অন্ধকার ঘিরে থাকত, সেখানেই বাইকে চেপে তুলি-ক্যানভাস নিয়ে হাজির হয়ে যেতেন মঙ্গেশ। রাজনীতি-কূটনীতির ভারী ভারী বিষয় শুধু নয়, নিত্যদিনের অতি সাধারণ ঘটনা স্থান পেত তাঁর আঁকায়।
প্রকৃতিতেও ছিলেন রসিক। আর সে রসবোধ জারিত হয়েছিল কার্টুনে। বিভিন্ন মানুষের কথা, হাসি, অঙ্গভঙ্গি নকল করে বিষাদগ্রস্ত মানুষদের হাসাতেন অনায়াসে। ২০১৭ সালে তাঁর মৃত্যুর পর মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডনবীশ বলেছিলেন, কার্টুনের দুনিয়ায় অপূরণীয় ক্ষতি। সমাজের নানা বিষয়ে বড় প্রাঞ্জল হয়ে উঠত তাঁর তুলিতে। এই মানুষটার জন্মই হয়েছিল জন সাধারণের সেবার জন্যই।
মঙ্গেশ তেন্ডুলকরের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল ফ্যান্টাসি। কল্পনা যেন বাঁধ মানত না তাঁর। যত বড় মাপের শিল্পী তিনি ছিলেন সে ভাবে তাঁর মূল্যায়ন কিন্তু হয় নি। হয়তো তিনি নিজেই চাননি। পাঁচ জনের সঙ্গে মিলে সাধারণের ভিড়ে মিশেই নিঃশব্দে সমাজ সেবা করে গেছেন। চিরজীবন থেকে গেছেন খ্যাতির আড়লেই।
ছবি: মঙ্গেশ তেন্ডুলকরের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে নেওয়া।
আরও পড়ুন: https://www.four.suk.1wp.in/feature-this-assam-school-accepts-only-plastic-as-tuition-fees/