দ্য ওয়াল ব্যুরো: সেই রাজত্ব নেই। রাজ্যপাটও নেই। তবে মারাঠা রাজবংশের আভিজাত্য আছে। মুঘলদের হারিয়ে মারাঠা রাজবংশের প্রতিষ্ঠার গর্বের ইতিহাস আছে। ১৭২১ সালে মহারাজা পিলাজি রাও গায়কোয়াড়ের আমলে ভাদোদারায় (আগে নাম ছিল বরোদা) যে গায়কোয়াড় রাজবংশের সূচনা হয়েছিল, তাই ফুলেফেঁপে ওঠে মহারাজা তৃতীয় সয়াজীরাও গায়কোয়াড়ের রাজত্বকালে। তৈরি হয় লক্ষ্মী বিলাস প্যালেস। সালটা ১৮৯০। গত ১৩০ বছরেও রাজমহলের ঐতিহ্যে চির ধরেনি। রাজত্ব না থাকলেও বংশপরম্পরায় গায়োকোয়াড় বংশের আভিজাত্য ধরে রেখেছেন রাজা-রানিরা। আশ্চর্যের বিষয় হল, কুড়ি সালে এসে লক্ষ্মী বিলাস রাজমহলের শোভা আরও বেড়েছে। গায়কোয়াড় সাম্রাজ্যকে কালের ইতিহাসে চাপা পড়তে দেননি দু’জন--মহারাজা সমরজিৎ সিং গায়কোয়াড় ও তাঁর মহারানি রাধিকা রাজে। সৌন্দর্যে, শিক্ষায়, আভিজাত্যে, আধুনিকতায় এই মহারানি ভারতের সেরা সুন্দরী ও আধুনিক মহিলাদের তালিকায় স্থান পেয়ে গিয়েছেন।
গণতান্ত্রিক দেশে রাজার শাসনের অবসান হয়েছে সেই কবেই। সিংহাসনের গৌরব না থাকলেও, রাজ্যপাটের চিহ্ন রয়েছে এখনও। দেশজুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে কত শত রাজমহল, তাদের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস। ভাদোদারার গায়কোয়াড় সাম্রাজ্যের নাম উঠে আসছে তার একটাই কারণ, মহারানি রাধিকা রাজে। ভারী গয়না আর জমকালো পোশাকের সাজে রানির অহঙ্কার দেখাননি তিনি, বরং তাঁর সৌন্দর্য ও আধুনিকতাই সেরা সম্মান এনে দিয়েছে। তিনি ইতিহাসবিদ, লেখিকা, ট্রাভেলার, সোশ্যাল মিডিয়াতেও স্বচ্ছন্দ। আবার অতিথি আপ্যায়ণে সাবেক সাজে গায়কোয়াড় বংশের গর্বেরও প্রতীক। মিলিওনেয়ারএশিয়া ম্যাগাজিন রানি রাধিকাকে ভারতের ‘দ্য মডার্ন মহারানি’ বলে উল্লেখ করেছে। ফোর্বসের বিচারে ভারতের সেরা সুন্দরী মহারানি হলেন রাধিকা।
‘মডার্ন মহারাজা’ সমরজিতের সঙ্গে সাত পাকে বাঁধা পড়লেন রাধিকা
গায়কোয়াড় বংশের ইতিহাস বড় লম্বা। সে কথায় পরে আসা যাবে। এই রাজবংশের বর্তমান প্রজন্ম হলেন সমরজিৎ গায়কোয়াড়। ভাদোদারার মহারাজা রণজিৎ গায়কোয়াড়ের পরে তাঁর ছেলে সমরজিতই লক্ষ্মী বিলাস রাজমহলের একচ্ছত্র অধিকারী। সমরজিতের মধ্যে রাজাসুলভ আচরণ ছিল না ছোটবেলা থেকেই। পড়াশোনায় তুখোড় সমরজিতের খেলাধূলায় আগ্রহ ছিল বেশি। ১৯৮৮ সালে ফতেহসিং গায়কোয়াড়ের মৃত্যুর পরে ভাদোদারা মহারাজা বলা হত রণজিৎ গায়কোয়াড়কে, আর সমরজিৎ ছিলেন যুবরাজ। তবে যুবরাজের রাজ্যপাটে বিশেষ মন নেই। ২০১২ সালে বাবা রণজিতের মৃত্যুর পরে তিনিই রাজা। কিন্তু সমরজিৎ ব্যস্ত ক্রিকেটে। বরোদার সেরা ক্রিকেটার। রঞ্জি খেলেন। পরে বরোদা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট হন। রাজমহলের সামনে মোতি বাগ স্টেডিয়াম তাঁরই তৈরি।

সমরজিতের আধুনিকতা ও খেলাধূলায় আগ্রহ মনে ধরে রাধিকার। তাঁরও জন্ম রাজঘরানায়। কিন্তু তিনি আধুনিকা। গুজরাতের ওয়ানকেনার রাজবংশের মহারাজা ডক্টর রণজিৎসিংজির মেয়ে রাধিকা সমরজিতকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। ২০০২ সাল। সাত পাকে বাঁধা পড়েন সমরজিৎ-রাধিকা।
সাংবাদিক রাধিকা এখন লক্ষ্মী বিলাস প্রাসাদের সাম্রাজ্ঞী
ইতিহাসে আগ্রহ ছিল কিশোরীবেলা থেকেই। রাধিকার পছন্দের বিষয়ই ছিল ইতিহাস। পড়াশোনাও সেই নিয়েই। একটি ম্যাগাজিনে লেখালিখিও করতেন। ইতিহাস নিয়ে স্নাতক করার পরে সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন রাধিকা। বিভিন্ন ম্যাগাজিনে তাঁর আর্টিকল ছাপা হতে থাকে। পড়াশোনাও চলতে থাকে সমানতালে। ইতিহাসে মাস্টার্স করার পরেই মহারাজা সমরজিতের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। তিনি হন গায়কোয়াড় সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র সাম্রাজ্ঞী রাধিকা রাজে গায়কোয়াড়।

সাংবাদিকতা ছেড়েছেন ঠিকই, কিন্তু মহারানি হয়ে রাজমহলে বন্দি নন রাধিকা। তিনি ঘুরেবেড়াতে ভালবাসেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেকে ট্রাভেলার হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। লেখালিখিও করেন। ট্রাডিশনাল ফ্যাশনে তাঁর বিরাট আগ্রহ। নিজের সাজসজ্জা, পোশাকের দিকে বিশেষ খেয়াল রাখেন রাধিকা। বর্তমান সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে সাবেক ও আধুনিক ফ্যাশনের এক আশ্চর্য ফিউশন দেখা যায় তাঁর মধ্যে। তাঁর স্টাইল-স্টেটমেন্টের প্রশংসা করেন এখনকার মহিলারাও, অনুসরণও করেন। ইতিহাস চর্চাও বন্ধ করেননি রাধিকা। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, ইতিহাসের বিভিন্ন বিষয় তাঁকে আকর্ষণ করে। বিশেষত হারিয়ে যাওয়া সাম্রাজ্য, বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া কত রাজবংশের ইতিহাস তাঁকে টানে। তাই নিজের বংশের গরিমা উজ্জ্বল রাখতে চান তিনি।
মুঘলদের হারিয়ে বরোদায় সাম্রাজ্য গড়ে তোলে গায়কোয়াড় বংশ
আহমেদাবাদ ও সুরাটের পরে গুজরাতের তৃতীয় বৃহত্তম শহর ভাদোদারা। আগে নাম ছিল বরোদা। ১২৯৭ সাল অবধি বরোদা ছিল হিন্দু রাজাদের অধীনে। গুপ্ত, চালুক্য বংশের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে এই শহরের সঙ্গে। দিল্লিতে সুলতানি রাজাদের আধিপত্য শুরু হলে এই এলাকা সুলতানদের দখলে চলে যায়। এরপর মুঘল পর্বে ফের মারাঠারা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৭২১ সালে মুঘল রাজাদের থেকে বরোদা ছিনিয়ে নিয়ে গায়কোয়াড় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন মহারাজা পিলাজিরাও গায়কোয়াড়। এরপরে দামাজিরাও, সয়াজীরাও-১ থেকে একের পর এক গায়কোয়াড় বংশের রাজারা মারাঠা ঐতিহ্য ধরে রাখেন। এই বংশের স্বর্ণযুগের সূচনা নয় মহারাজা তৃতীয় সয়াজীরাওয়ের আমলে। ১৮৭৫ সালে। তিনিই তৈরি করেন লক্ষ্মী বিলাস প্যালেস। তাঁর শাসনকালেই বরোদা শিক্ষা, শিল্প, সংস্কৃতির আদর্শ কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে। সেই সময় ভারতে ব্রিটিশ শাসন। কিন্তু সয়াজীরাওয়ের প্রভাব-প্রতিপত্তি বিশাল। ব্রিটিশ আমলেও বরোদা প্রিন্সলি স্টেট হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ১৮৭৮ সাল থেকে তিনি লক্ষ্মী বিলাস প্যালেসের নির্মাণকাজ শুরু করে দেন। বিদেশ থেকে আনানো হয় স্থপতি। ইন্দো-ইউরোপিয়ান ধাঁচে প্রাসাদের নকশা তৈরি শুরু হয়।
১২ বছরে তৈরি হয় লক্ষ্মী বিলাস প্রাসাদ, আত্মহত্যা করেন প্রধান স্থপতি
১৮৯০ সালে প্রাসাদের নির্মানকাজ শেষ হয়। দীর্ঘ ১২ বছরে নানা ঘটনাও ঘটে লক্ষ্মী বিলাসে। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই প্রাসাদের মূল স্থপতি চার্লস মন্টের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। এর কারণ জানা যায়নি। তবে সয়াজীরাও ভয় পান। চার্লসের মৃত্যু কোনও বিপর্যয় ঘটাতে পারে। সঠিকভাবে নির্মাণকাজ না হলে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়তে পারে তাঁর স্বপ্নের লক্ষ্মী বিলাস। কিন্তু তা হয়নি। বাকি স্থপতিদের চেষ্টায় লক্ষ্মী বিলাস মাথা তুলে দাঁড়ায়। ভারতীয় ও পাশ্চাত্য স্থাপত্যশৈলীর মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন চার্লস মন্ট। সেই নকশাতেই প্রাসাদ তৈরি শেষ হয়। নিও-ইন্ডিয়ান, ইসলাম, নিওক্ল্যাসিকাল ও গথিক স্থাপত্যের ছোঁয়াও রয়েছে এই প্রাসাদের প্রতিটি কোণায়।

ইন্দো সারাসেনিক পদ্ধতিতে তৈরি হয়েছে লক্ষ্মী বিলাস প্রাসাদ। সেই সময়েই খরচ পড়ে ২৭ লক্ষ টাকা। লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেস থেকে প্রায় চার গুণ বড় এই প্রাসাদ। ৫০০ একর জমির উপর তৈরি রাজমহলে ১৭৬টি ঘর। আগ্রা থেকে লাল বেলেপাথর, ইতালি ও রাজস্থান থেকে মার্বেল, পুণে থেকে নীল ট্র্যাপ স্টোন আনানো হয়েছিল প্রাসাদ তৈরির সময়। দেশি ও বিদেশি শিল্প-স্থাপত্যের মেলবন্দন ঘটেছে এই প্রাসাদে। দরবার কক্ষ, মহারাজের ঘর, রানি ও মহিলাদের অন্দরমহল ছাড়াও প্রাসাদে আধুনিক বিলিয়ার্ড রুম, ডাইনিং হল, অতিথিশালা তৈরি করিয়েছিলেন সয়াজীরাও। সমরজিত এখানেই গল্ফ কোর্স, মোতি বাগ স্টেডিয়াম, মহারাজা ফতেহ সিং মিউজিয়ামকে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলেন। এই মিউজিয়ামে রয়েছে রাজা রবি বর্মা ও ইউরোপিয়ান চিত্রশিল্পীদের আঁকা অনেক দুষ্প্রাপ্য ছবি। পর্যটকদের জন্য এই রাজমহলের কিছু অংশ খুলে দেওয়া আছে।