
শেষ আপডেট: 12 July 2018 08:35
কিন্তু যতই মনের জোর থাক, দক্ষতা থাক, বাস্তবে কার্যত অসম্ভব এবং চূড়ান্ত কঠিন এই উদ্ধার কাজ ঠিক কী ভাবে সম্ভব হল, জানতে আগ্রহী সকলে।
গত মাসের ২৩ জুন থাইল্যান্ডের থাম লুয়াং গুহায় কিশোর ফুটবল টিমটি আটকে পরার ন'দিন পরে জীবিত অবস্থায় চিহ্নিত করা যায় তাঁদের। কিন্তু উদ্ধারকার্যের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করতেই পেরিয়ে যায় কয়েকটা দিন। শেষমেশ রবিবার, ৮ জুলাই শুরু হয় উদ্ধারকাজ। একটি আন্তর্জাতিক অভিযান, যাতে ব্রিটেন, অসট্রেলিয়া-সহ আরও অনেকগুলো দেশের উদ্ধারকারী ও বিশেষজ্ঞেরা অংশ নেন। ৯০ জন দক্ষ ডুবুরির উদ্ধারকারী দলের ৪০ জন ছিলেন থাইল্যান্ডের এবং বাকিরা অন্য দেশের। গুহার ভিতরে অন্ধকার, সঙ্কীর্ণ এবং জলমগ্ন পথ দিয়ে, আটকে থাকা কিশোরদের হাঁটিয়ে বা ডুব-সাঁতার দিইয়ে প্রবেশমুখে নিয়ে এসেছেন তাঁরা। সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুল্যান্সে করে হাসপাতাল।
এক লাইনে শুনতে সহজ হলেও, এই কাজ করা সহজ ছিল না। ওই সরু গুহার ভিতরে ডাইভিং করা ভীষণ কঠিন। শুধু কিশোরদের জন্য নয়, অভিজ্ঞ ডুবুরিদের জন্যও। কখনও গলাজলে হাঁটা, কখনও আবার ভেজা দেওয়াল বেয়ে ওঠা, কোথাও ডুবসাঁতার দেওয়া—সব মিলিয়ে একটা জটিল এবং দীর্ঘ পদ্ধতির পরিকল্পনা করেন উদ্ধারকারীরা। এক এক জন কিশোরকে দু’জন করে ডুবুরি বার করেছে। নিজের ছাড়াও, কিশোরের অক্সিজেন সিলিন্ডারও বহন করেছেন তাঁরাই।
গুহার সব চেয়ে কঠিন অংশ ছিল, মাঝামাঝি একটি বাঁক, "টি-জংশন"। যেটা এতই সংকীর্ণ যে তার ভিতর দিয়ে যাওয়ার জন্য ডুবুরিদের অক্সিজেন সিলিন্ডারও খুলে ফেলতে হয়। উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া ডুবুরি সমন কুনানের মৃত্যুও হয় এই কঠিন পথে। আন্দাজ পাওয়া যায়, এই উদ্ধার কতটা বিপজ্জনক ছিল।
দেখে নিন ভিডিও।
https://www.youtube.com/watch?v=ZQZgDnXBz8I
উদ্ধার অভিযানের প্রধান বলেন, অভিযানের প্রথম দিনের তুলনায় দ্বিতীয় দিন আরও একটু মসৃণ ভাবে পরিচালিত হয়েছে উদ্ধারকাজ। প্রতিবার ডুবুরিদের দু’ঘণ্টারও কম সময় লেগেছে। তাঁরা গুহায় ঢোকার আগে বিশাল পাম্পিং মেশিন দিয়ে ভিতরের জলের স্তর নীচে নামিয়ে আনা হয়।
উদ্ধারকারী দলের এক সদস্য তাঁর ফেসবুক পোস্টে জানান, "পুরো কাজ চলছে ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। যে ভাবে এক জন এক জন করে উদ্ধার হচ্ছে, আশা দেখছি খুব ভাল কিছুর। সংকটজনক পরিস্থিতি, কিন্তু প্রতিটা পর্যায়ে সাফল্যও আসছে।" উদ্ধারকারী দলের এই ইতিবাচক মনোভাবই মনের জোর বাড়িয়েছে সারা বিশ্ববাসীর। দু’সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে জমে থাকা উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তার পারদ ধীরে ধীরে নামিয়েছে তাঁদের অবিচল চেষ্টা আর অসামান্য দক্ষতা।
ভয় এর পরেও ছিল। ভিতরে আটকে থাকা ছোট ছোট ছেলেগুলোর জন্য। ওরা কী অবস্থায় আছে, কতটা আতঙ্কে আছে, আদৌ সুস্থ আছে কি না—এই সবই। কিন্তু আশঙ্কা মিথ্যা প্রমাণ করে যে মনের জোরের নিদর্শন ওরা দেখিয়েছে, তাতে সারা বিশ্ব কুর্নিশ করছে ওদের।
জানা গিয়েছে, উদ্ধারকারীরা দুর্গম পথ পেরিয়ে কিশোরদের কাছে পৌঁছনোর পরে, এক এখ জনকে বার করার সময়ে আগে মৃদু একটি সেডেটিভ ট্যাবলেট খাইয়েছেন। কারণ এত দিন এভাবে কাটিয়ে তারা এমনিতেই ট্রমাটাইজ়ড ছিল। কিন্তু বেরোনোর জন্য যে প্রচণ্ড পরিশ্রম আর সাহস দরকার, তা খুব ঠান্ডা মাথা না থাকলে হবে না। ফলে কিশোরদের স্নায়ুর চাপ কমানোর জন্য ওই ওষুধ দেওয়া হয় চিকিৎসকেদের পরামর্শ মেনে।
জানা গিয়েছে, ২৩ জুন, অর্থাৎ যে দিন ওৎা আটকে পড়েছিল, সে দিন ওই ফুটবল দলের এক খুদে পিরাপাত সোমপিয়াংজাইয়ের ১৭ বছরের জন্মদিন ছিল। তার জন্মদিন উদযাপনের জন্য সবাই নানা রকম খাবার নিয়ে গিয়েছিল, যে খাবারগুলো এতগুলো দিন তাদের টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। তবে সব চেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন ২৫ বছরের কোচ একাপোল চান্টাওং। কারণ, খুদেরা জানিয়েছেন, তিনি প্রায় কোনও খাবারই খাননি। সব সময়েই বাচ্চাদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন। এবং সব সময় সকলকে সাহস জুগিয়েছেন, ধৈর্য্য রাখতে শিখিয়েছেন। মজার কথা বলে চনমনে করে তুলেছেন। তাঁৎ নিজের ভিতরে জমে ওঠআ দুশ্চিন্তার পাহাড় এক বারও বুঝতে দেননি কাউকে।
কোচ, কিশোর ও উদ্ধারকারীদের এই মিলিত ইচ্ছেশক্তি যেভাবে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলল, তা সারা বিশ্বের কাছে নিদর্শন হয়ে রইল।