
শেষ আপডেট: 18 May 2022 13:59
বারাণসী, মথুরার মন্দির-মসজিদ কেন্দ্রিক পুরনো বিবাদ নিয়ে নতুন করে মাঠে নেমেছে বিজেপি সহ সঙ্ঘ পরিবারের বিভিন্ন সংগঠন। বারাণসীতে জ্ঞানবাপী মসজিদ (Gyanvapi Mosque) নিয়ে গত দিন পনেরোর মধ্যে চার-পাঁচটি মামলা দায়ের হয়েছে। তারমধ্যে একটিতে জ্ঞানবাপী চত্বরে খননের আর্জি জানানো হয়েছে। মামলাকারীর বক্তব্য, মসজিদের কাঠামোর নীচে হিন্দু মন্দিরের নির্দশন রয়েছে। (Temple-Mosque)
মথুরা নিয়েও দিন কয়েক আগে একই ধরনের মামলা হয়েছে। সেখানেও মামলাকারীর বক্তব্য, শাহী ঈদগাহ মসজিদের অধীনে থাকা শ্রীকৃষ্ণ জন্মস্থানের অংশ হিন্দুদের ফিরিয়ে দিতে হবে। (Temple-Mosque)
তিন দশক আগে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নতুন স্লোগান ছিল, 'এতো সিরফ ঝাঁকি হ্যাঁয়, কাশী-মথুরা বাকি হ্যায়।'
সেই কাশী, মথুরার হিন্দু মন্দিরের অংশ পুনরুদ্ধারে সঙ্ঘ পরিবারের মামলার ঝাঁপি নিয়ে আদালতে ঝাঁপিয়ে পড়া দেখে অনেকেই মনে করছেন, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বাবরি ধ্বংসের তিন দশকের মাথায় জ্ঞানবাপী এবং শাহী ইদগাও মসজিদেও ঝাঁকুনি দিতে চাইছে। এবং অযোধ্যার মতো এই দুই ক্ষেত্রেও তারা বিচারালয়কেই আশ্রয় করতে চাইছে।
কিন্তু বাদ সেধেছে তিন দশক আগের একটি আইন। মথুরার শাহী ঈদগাহ মসজিদ এবং বারাণসীর জ্ঞানবাপী মসজিদ নিয়ে হওয়া প্রতিটি মামলাতে’ই দ্য প্লেসেস অফ ওরশিপ অ্যাকট’ তথা উপাসনা স্থল আইন (১৯৯১) কে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, জ্ঞানবাপী এবং শাহী ইদগাহ মসজিদ ওই আইনের আওতায় পড়ে না। কিন্তু কোনও আদালতই এখনও পর্যন্ত ওই আইনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। বরং অযোধ্যা মামলায় রাম মন্দিরের পক্ষে রায় দিতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ আইনটিকে ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষায় বর্ম বলে উল্লেখ করেছিল।
কিন্তু বিজেপি এবং সঙ্ঘ পরিবার তা মনে করে না। তাদের বক্তব্য, ওই আইনে ধর্মাচরণের অধিকার খর্ব করা হয়েছে। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন শুরু হয়েছে, লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুবাদে বিজেপি ওই আইন সংশোধন অথবা বাতিল করে দিতে পারে। ৩০১ আসন নিয়ে লোকসভায় দল একাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। রাজ্যসভায় বিজেপি-র একার দখলে ১০২টি আসন। একক সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলেও শরিকদের সমর্থন নিয়ে বিল পাশ করানো মোটেই কঠিন নয়। আগামী লোকসভা ভোটের আগে হিন্দুত্বের জিগির তুলতে ওই আইন বাতিল কিংবা সংশোধনের পথে হাঁটতে পারে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। তবে সরকার ও বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব এখনও ওই আইন বদলের দাবি নিয়ে প্রকাশ্যে উচ্চবাচ্চ করেনি।
এখানে বলে রাখা ভাল, রাজনৈতিক মহলের অনেকেই মনে করেন ২০১৪ সালের প্রথম মোদী সরকারের তুলনায় উনিশে একা ৩০০ পার করা মোদী-শাহের সরকার অনেক বেশি আগ্রাসী। সেই আগ্রাসন অবশ্যই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ বা টাকার দামকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে নয়। রাজনৈতিক মহলের অনেকের মতে, পুরনো বোতলে নতুন হিন্দুত্ব ঢালতে চাইছে গেরুয়া শিবির। কেউ কেউ আবার এও বলছেন, অর্থনৈতিক অধোগতি, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি—ইত্যাদি থেকে নজর ঘোরাতে নতুন রাংতায় হিন্দুত্বের মোড়ক লাগাতে চাইছে বিজেপি।
এখন প্রশ্ন হল তিন দশক আগের ওই আইনে কী আছে?
১৯৯১ সালে কেন্দ্রের তৎকালীন নরসিংহ রাও সরকারের তৈরি ওই আইনে বলা হয়, ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট দেশের উপাসনাস্থলগুলি যেটি যে অবস্থায় ছিল সেই অবস্থাতেই অক্ষত রাখতে হবে। সে গুলির আকার এবং চরিত্র বদল করা যাবে না। নতুন করে ইতিহাস টেনে বা মাটি ফুঁড়ে বের করলেও নয়। তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসবি চবন ওই আইনের ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ভারতের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র রক্ষার মৌলিক কারণেই আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে।
তাৎপর্যপূর্ণ হল, এমন সময়ে ওই আইনটি বলবৎ করা হয় যখন জনসঙ্ঘ ভেঙে তৈরি হওয়া বিজেপি ভারতের রাজনীতিতে উথাপাতাল ফেলে দিয়েছে। লালকৃষ্ণ আডবাণীর রথ ভারতের নানাপ্রান্তের পথের ধুলো উড়িয়ে দিয়েছে। সেই সময়েই সংসদে ওই আইন এনেছিল নরসিংহ রাও সরকার।
তবে, ওই আইনের পরিধির বাইরে রাখা হয় অযোধ্যার রাম মন্দির-বাবরি মসজিদ চত্বরকে। ওই বিবাদ নিয়ে আড়াইশো বছরের পুরনো মামলা থাকায় সেটি উপাসনাস্থল আইনের আওতায় রাখা হয়নি। যদিও মন্দির-মসজিদ বিবাদ ঘিরে অশান্তির মুখে ওই আইন করেছিল কেন্দ্রের সংখ্যালঘু কংগ্রেস সরকার। স্বভাবতই সংসদে আইনটির বিরোধিতা করে বিজেপি। বস্তুত, গেরুয়া শিবিরের বাড়বাড়ন্তের মুখে ওই আইনে বিজেপি বাদে সব দলই সায় দেয়। ফলে সংখ্যালঘু হয়েও নরসিংহ রাও সরকারের ওই আইন পাশ করাতে সমস্যা হয়নি। অযোধ্যার রাম মন্দির-বাবরি মসজিদ মামলা ছাড়াও অ্যাসিয়েন্ট মনুমেন্ট অ্যাকট এবং আর্কিওলজিক্যাল রিমেইন্স অ্যাকট ১৯৫৮- র অধীনে তালিকাভুক্ত কোনও নির্মাণ উপাসনাস্থল আইনের আওতায় আসবে না। গেরুয়া শিবিরের দাবি, মথুরা, কাশী-বিশ্বনাথ—এইগুলিকে এই আইনের আওতায় আনতে হবে।
ওই আইনের ৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ধর্মস্থান বা উপাসনাস্থলের কোনও ধরনের বিকৃতি, অপব্যবহার, চরিত্র বদল, বদলের চেষ্টা গুরুতর অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হবে। আইনের ৪ (২) ধারায় বলা রয়েছে, উপাসনাস্থলের চেহারা, চরিত্র, ব্যবহার বদল নিয়ে আর মামলা করা যাবে না। এই সংক্রান্ত বিচারাধীন মামলাগুলির আর বিচার করা যাবে না।
আইনটি বাতিলের দাবি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে দুটি মামলা বিচারাধীন। তা ছাড়া এলাহাবাদ হাইকোর্টে বিবেচনাধীন রয়েছে গুচ্ছ মামলা। সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন মামলা দুটির একটি করেছেন আইনজীবী তথা বিজেপি নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায়। অন্যটির মামলাকারী বিশ্ব ভদ্র পূজারী পুরোহিত মহাসঙ্ঘ।
মামলাকারীদের বক্তব্য, আইনটি ধর্মাচরণের মৌলিক অধিকারকে খর্ব করেছে। তাছাড়া আদালতে মামলা করতে না দেওয়ার বিধানও আইন ও সাংবিধানিক অধিকার খর্বের শামিল। হিন্দুত্ববাদীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, জ্ঞানবাপী মসজিদ ও শাহী ইদগাহ মসজিদ সরিয়ে নিতে হবে। মসজিদের জায়গায় আগে মন্দির ছিল। মন্দির ভেঙে তৈরি হয় মসজিদ।
অনেকের মতে, দ্বিতীয় মোদী সরকার তিন তালাক তোলা থেকে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা তথা ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদে সংখ্যার তাকতেই। তা ছাড়া নাগপুরের দীর্ঘদিনের অ্যাজেন্ডা অযোধ্যা মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে আদালতেই। তবে বারাণসী ও মথুরার ক্ষেত্রে একমাত্র জট হল ১৯৯১-এর আইন। এখন কৌতূহল, আগামী লোকসভা ভোটের আগে হিন্দুত্বের ইঞ্জিনে পুরনো মোবিল হিসেবে এই আইন বাতিল বা সংশোধনের পথে হাঁটবেন না তো মোদী-শাহ?