দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের প্রকোপে লকডাউন কয়েকশো দেশে। বাতিল হয়েছে বহু অনুষ্ঠান। এভারেস্ট অভিযানও বাতিল হয়েছে তেমনই। কিন্তু দেশ-বিদেশের অভিযাত্রীদের এভারেস্ট চড়া এ বছরের জন্য বন্ধ হলেও, চিন সরকারের একটি দল ইতিমধ্যেই এই অভিযান চালাচ্ছে। সব ঠিক থাকলে আগামী শুক্রবারই শৃঙ্গ ছোঁবেন তাঁরা।
আদতে এভারেস্টের উচ্চতা মাপতে চলেছে চিনের জরিপ বিভাগ। গত মাসের ৩০ তারিখে দলটি শুরু করেছে এই অভিযান। চিনের এই এভারেস্ট অভিযানের পোশাকি নাম মাউন্ট চোমোলাংমা। কারণ তিব্বতি ভাষায় এভারেস্ট শৃঙ্গের নাম চোমোলাংমা।
সূত্রের খবর, শৃঙ্গের উচ্চতা মাপা, প্রাকৃতিক সম্পদ, জলবায়ু পরিবর্তনের যে কোনও সম্ভাব্য প্রভাব ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করতেই বিশ্বের উচতম এই শৃঙ্গ অভিযান করছেন চিনের পর্বতারোহীরা। কয়েক দিন আগেও সামিট করার চেষ্টা করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু তুষারধসের ঝুঁকি থাকার ফলে বেসক্যাম্পে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিল আরোহী দল। এই দলের সদস্য হিসেবে চিন সরকারের প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রকের বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন।

ভারতীয় গণিতবিদ রাধানাথ শিকদার এভারেস্টের উচ্চতা নির্ধারণ করেছিলেন সর্বপ্রথম, ৮৮৪৮ মিটার। এর পরে সর্বশেষ ২০০৫ সালে একবার এভারেস্টের উচ্চতা মাপা হয়েছিল। তখন পর্বতশৃঙ্গের উচ্চতা ছিল ৮৮৪৪.৩৩ মিটার। এখন উচ্চতা কতটা দাঁড়ায় সেটাই এখন দেখার।
তবে অনেকেই মনে করছেন, এই লকডাউন চলার সময়ে সারা বিশ্বের অনবধানতার সুযোগে আদতে এভারেস্টের দিকে নজর দিয়েছে চিন। দখল করার চেষ্টা করছে এই শৃঙ্গের অধিকার।

কয়েক দিন আগেই চিনের সরকারি খবরের চ্যানেল সিজিটিএন মাউন্ট এভারেস্টের একটি ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছিল। মাউন্ট এভারেস্টের মাথায় সূর্যরশ্মির অপূর্ব বলয় দেখা গিয়েছে সে ছবিতে। ছবিটি যে অপূর্ব সুন্দর, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু সমস্যা বাঁধিয়েছিল তার ক্যাপশন। চিন ওই ছবির ক্যাপশনে লিখেছিল, “সূর্যের এক অদ্ভুত বলয় দেখা গিয়েছে মাউন্ট চোমোলাংমার মাথায়, যা মাউন্ট এভারেস্ট নামেও পরিচিত। তার ওপরের আকাশে এ দৃশ্য দেখা যায়। এটা চিন-তিব্বত স্বশাসিত অঞ্চলে অবস্থিত বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।” অর্থাৎ এভারেস্টকে নিজেদেরই বলে দাবি করেছিল তারা।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৬০ সালে নেপাল ও চিনের মধ্যে যে চুক্তি সাক্ষরিত হয়, তাতে মাউন্ট এভারেস্টকে দুই দেশের মধ্যে ভাগ করা হয়েছিল। ঠিক হয়েছিল, শৃঙ্গের দক্ষিণ অংশটি থাকবে নেপালের অধিকারে, আর উত্তর দিক থাকবে চিন-তিব্বত স্বশাসিত অঞ্চলের আওতায়। যদিও সেই অংশকেও বরাবরই নিজেদের বলে দাবি করে এসেছে চিন।

বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, এটা নতুন কিছু নয়। চিন বরাবরই তিব্বত ও এভারেস্টের দখল পেতে মরিয়া। এর পেছনে ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিও কাজ করে। চিনের দিকের এভারেস্টের অংশ অর্থাৎ নর্থ কল আরোহণের জন্য বেশ কঠিন। তাই নেপালের দিকের অংশ অর্থাৎ সাউথ কল বেশি ব্যবহৃত হয় অভিযাত্রীদের আরোহণের জন্য। পর্যটন ব্যবসাও হয় মূলত ওই রুটটি থেকেই। সেই ব্যবসাও নিজেদের দিকে আনতে চাইছে চিন। প্রমাণ করতে চাইছে, মাউন্ট এভারেস্ট তাদেরই দেশের শৃঙ্গ।
পাশাপাশি সম্প্রতি এভারেস্টে ৫জি নেটওয়ার্ক পরিষেবা চালু করেছে চিন। পর্বতারোহীদের বাকি বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার উদ্দেশ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা। ফলে এভারেস্ট জয় পর্বতারোহীদের জন্য আগের থেকে অনেক সুরক্ষিত হবে বলে দাবি চিনের। কিন্তু এসবের আড়ালে চিন আদতে হিমালয়ে বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে এভারেস্টে কর্তৃত্ব কায়েম করতে চাইছে বলেই মত অনেকের।

তারও কয়েক দিন আগেই সামনে এসেছিল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানচিত্রে চিনের অংশে ঢুকে গিয়েছে ভারতের লাদাখের একাংশ। জানা গেছিল, চিনের ম্যাপে তেমনটাই রয়েছে। অর্থাৎ ওই অংশটিকে, যা আকসাই চিন নামে পরিচিত, তাকে নিজের অংশ হিসেবে দেখিয়েই মানচিত্র তৈরি করেছে তারা। বড় বিতর্ক ঘনিয়েছিল তখন। ফের একই কাণ্ড ঘটাল চিন। এবার তার আগ্রাসী মনোভাবের অস্ত্র হয়ে উঠল এভারেস্ট শৃঙ্গ।