
শেষ আপডেট: 26 May 2023 07:20
বছর দুই আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে (Narendra Modi) চিঠি লিখেছিলেন জনপ্রিয় তামিল নৃত্য শিল্পী ড. পদ্মা সুব্রহ্মণ্যম| তার কয়েক মাস আগেই নতুন সংসদ ভবনের শিলান্যাস করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সেই চিঠি হাতে পেয়ে কালক্ষেপ করেননি প্রধানমন্ত্রী (Narendra Modi)। বিশ্বস্ত এক অফিসারকে পাঠান এলাহাবাদে। তিনি ঘুরে এসে ছবি-সহ বিস্তারিত রিপোর্ট তুলে দেন প্রধানমন্ত্রীর হাতে।
চিঠিতে কী লিখেছিলেন সুব্রহ্মণ্যম? চিঠির সঙ্গে তিনি জনপ্রিয় তামিল (Tamil culture) ম্যাগাজিন তুঘলক-এর সম্পাদক এস গুরুমূর্তির একটি নিবন্ধের ইংরিজি অনুবাদ করে প্রধানমন্ত্রীকে পাঠান। সেই নিবন্ধের বিষয় ছিল ‘সেঙ্গোল’ কি পড়ে থাকবে মিউজিয়ামেই?
সেটি রাখা ছিল এলাহাবাদের নেহরু মিউজিয়ামে। রবিবার প্রধানমন্ত্রী মোদী নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধনের (inauguration of new parliament building) সময় সেটি লোকসভার স্পিকারের চেয়ারের পাশে প্রতিষ্ঠা করবেন। রাজনীতির পণ্ডিতেরা মনে করছেন, নৃত্যশিল্পীর চিঠির সূত্রে প্রধানমন্ত্রী মোদী সংসদ ভবন উদ্বোধনকে হাতিয়ার করে বিরাট রাজনৈতিক চাল খেলেছেন। তিনি নয়া সংসদ ভবনের সঙ্গে তামিল সংস্কৃতিকে বড় আকারে জুড়ে নিয়েছেন। বৃহত্তর অর্থে যা আসলে দক্ষিণী বার্তা।
রবিবার তামিল সংস্কৃতির অঙ্গ সেঙ্গোল-কে নয়া সংসদ ভবনে প্রতিষ্ঠাই শুধু নয়, সেদিনের অনুষ্ঠানের পূজাপাঠও হবে দক্ষিণীর ওই রাজ্যের আদি রীতি মেনে। এজন্য তামিল পুরোহিত ও সাধুদের একটি প্রতিনিধি দল ইতিমধ্যে দিল্লি পৌঁছে গিয়েছেন। তামিল পঞ্জিকা (Tamil culture) মতে সকাল ছ’টায় এলাহাবাদ থেকে আনা ‘সেঙ্গোল’ (Sengol) গঙ্গা জলে পবিত্র করার পর সেটির পূজার প্রস্তুতি শুরু হবে। এই পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ঘড়ির সেকেণ্ডের কাঁটা ধরে, সংসদ চত্বরে মহাত্মা গান্ধীর স্ট্যাচুর সামনে। প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং কয়েকজন সিনিয়র মন্ত্রী ও রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান হরিবংশ ছাড়া আর তেমন কেউ আমন্ত্রিত নন।
পুজো শুরু হবে সকাল সাড়ে সাতটায়। পূজা শেষে সাধু সমাজ প্রধানমন্ত্রীর হাতে সেঙ্গোল তুলে দিলে তিনি সেটি সাড়ে আট’টা থেকে ন’টার মধ্যে নতুন সংসদ ভবনে (inauguration of new parliament building) স্পিকারের আসনের পাশে প্রতিষ্ঠা করবেন। পাঁচ ফুট লম্বা সেঙ্গোল রাখা থাকবে কাঁচের জারে।
বিজেপি যথারীতি এই পর্বকে সামনে রেখে কংগ্রেস-সহ বিরোধীদের অনুষ্ঠান বয়কটের সিদ্ধান্তকে সেঙ্গোল-কে অবজ্ঞা বলে প্রচার শুরু করেছে। গেরুয়া শিবির বলছে, এটা আসলে আদি ভারতীয় ঐতিহ্যের বিরোধিতা। বলাই বাহুল্য, সেই ঐতিহ্যকেই বিজেপি হিন্দুত্ব বলে দাবি করে থাকে।
এবারই প্রথম নয়, প্রধানমন্ত্রী এর আগে তাঁর নির্বাচনী কেন্দ্র বারাণসীর সঙ্গে তামিলনাড়ুর বিভিন্ন মঠ-মন্দিরের যোগসূত্র স্থাপন করেছেন। একশো তামিল পণ্ডিতকে বারাণসীতে নিয়ে গিয়ে বেশ কিছুদিন রেখেছিলেন। কাশী বিশ্বনাথ মন্দির সংস্কারের কাজে তাঁদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল।

গত বছর একমাস ব্যাপী কাশী-তামিল সঙ্গম উৎসবের আয়োজনও করেন স্থানীয় সাংসদ মোদী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী পরেছিলেন শার্ট-লুঙ্গি। দক্ষিণী পোশাকের অঙ্গ গামছাও গায়ে জড়িয়ে নিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কনভয় বিমান বন্দর থেকে বেরতেই উপস্থিত জনতা ‘বনাক্কাম কাশী’ (তামিল ভাষায়-কাশীতে স্বাগত) এবং হর হর মহাদেব ধ্বনিতে স্বাগত জানায়। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তামিলনাড়ু এবং উত্তর ভারত, দুটোই শিবময় এবং শক্তিময়। তারপর তামিলনাড়ুর মঠ-মন্দিরের নয়জন শৈব মহন্ত-কে অনুষ্ঠান মঞ্চে সম্মান জানান। ভেঙ্কট রমনা ঘনপতি নামে এক তামিল সাধুকে এবার বারাণসীর কাশী-বিশ্বনাথ মন্দির ট্রাস্টের সদস্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সেই অনুষ্ঠানে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বলেন, ‘সংস্কৃত ও তামিল, এই দুটিই ভগবান শিবের মুখ নিঃসৃত ভাষা।
বারাণসীর পর এবার গোটা দেশের সঙ্গে তামিলনাড়ুকে জুড়ে দিতে প্রধানমন্ত্রী বেছে নিয়েছেন নয়া সংসদ ভবনকেই। ‘সেঙ্গোল’ শব্দটির উৎপত্তি তামিল ‘সেম্মাই’ থেকে। স্বাধীনতা, ন্যায়পরায়ণতা, ন্যায় শাসন ইত্যাদি একাধিক অর্থে এই শব্দটি তামিলে ব্যবহার করা হয়। ভারতে দীর্ঘ সময় রাজত্ব করা চোল রাজবংশের নিয়ম ছিল নতুন রাজার অভিষেকের সেঙ্গোল তুলে দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর। ব্রিটিশের হাত থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরেও সেই পাচীন ভারতীয় রীতি ফেরানো হয়। সোনার পাতে মোড়া সেঙ্গোল অর্থাৎ রাজদণ্ডের মাথায় বসানো আছে শিবের বাহন নন্দী।

সংসদে যে সেঙ্গোল প্রতিষ্ঠা করা হবে সেটি রাখা ছিল এলাহাবাদে রাষ্ট্রীয় জাদুঘরে। সেখান থেকে সেটি দিল্লিতে নিয়ে আসা হয়েছে নতুন সংসদ ভবনে স্থাপনের জন্য। এটির সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের অন্তিম মুহূর্তের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ১৯৪৭-এর ১৪-১৫ অগস্টের রাতে শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন সেঙ্গোল অর্থাৎ রাজদণ্ডটি জওহরলাল নেহরুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক হিসাবে। তারপর থেকে সেটি এলাহাবাদের মিউজিয়ামেই রাখা ছিল।

৭৬ বছর আগে সরকারের নির্দেশে তামিলনাড়ুর একটি মঠে থাকা সেঙ্গোলের আদলে নতুন একটি রাজদণ্ড তৈরি করে তৎকালীন মাদ্রাজের নামজাদা অলঙ্কার নির্মাতা সংস্থা ভুম্মিদি বাঙ্গারু ছেট্টি। দুই শিল্পী ভুম্মিদি এথিরাজুলু (৯৬) এবং ভুম্মিদি সুধাকর (৮৮) বর্তমানে চেন্নাইয়ের বাসিন্দা। বয়সের কারণে তাঁদের পক্ষে রবিবারের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া সম্ভব হবে না। তবে অনুষ্ঠানে তাঁদের প্রতি সম্মানজ্ঞাপন করা হবে। সেই সঙ্গে সংসদ ভবন নির্মাণে যুক্ত কর্মী এবং দক্ষিণ ভারতের প্রাচীনতম শিব অধীনাম তথা মঠের বেশ কয়েকজন পূজারি, শাস্ত্রজ্ঞ প্রমুখকেও সম্মানজ্ঞাপন করা হবে।
দ্বিতীয় দফার অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা বেলা ১২ টায়। সেই পর্বে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার স্পিকার এবং রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়্গের ভাষণের জন্য সময় বরাদ্দ আছে। তবে দল অনুষ্ঠান বয়কট করায় খাড়্গে থাকবেন না। রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান হরিবংশ অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু ও উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনকড়ের শুভেচ্ছা বার্তা পাঠ করবেন।
নতুন সংসদ ভবন রাষ্ট্রপতি, নাকি প্রধানমন্ত্রী, কে উদ্বোধন করবেন? শুনানি সুপ্রিম কোর্টে