দ্য ওয়াল ব্যুরো: সন্ত্রাসী সংগঠন বোকো হারাম বিভিন্ন সময়ে শিরোনামে এসেছে মহিলাদের উপর অত্যাচার ও নির্যাতনের নিকৃষ্টতম উদাহরণ তৈরি করে। তাদের সন্ত্রাসের শিকার নাইজেরিয়ার একটি বড় অংশ। বহু মানুষ সেই সন্ত্রাসের ফলে ঘর ছেড়েছে। সর্বস্ব খুইয়ে, প্রিয়জনদের হারিয়ে পথে বসেছে এমন মানুষের সংখ্যাও অনেক। কিন্তু একটা বড় অংশ আসলে ঘর ছেড়েও পালিয়ে মুক্তি পায়নি। বহুক্ষেত্রেই পলাতক মহিলা পাচারকারীদের শিকার হয়। সেখানে চলে শারীরিক শোষণ। এমনকি তাদের দিয়ে জোর করে সন্তান উৎপাদন করিয়ে সেই শিশুদের বিক্রি পর্যন্ত করে দেওয়া হয়। এই ঘটনাই নাইজেরিয়ার 'বেবি ফ্যাক্টরি' বলে পরিচিত
বোকো হারামের অত্যাচারের কথা নতুন কোন ঘটনা নয়। নানা সময়ে নানা তথ্য সামনে এসেছে এই সন্ত্রাস ঘিরে। তাদের অত্যাচারের কাহিনি নিয়ে নানান আলোচনা, লেখালেখি হয়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। বিভিন্ন সময়ে নাইজেরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে অত্যাচার চালিয়েছে এই মৌলবাদী সংগঠন। ২০১৭ সালে নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে হঠাৎই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে তারা। বহু ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। মহিলা ও শিশুদের অপহরণ করে। অত্যাচারে ঘর ছেড়ে বহু মানুষ পালাতে বাধ্য হয়।

এইসময়ে একসঙ্গে অনেকে পালিয়ে গিয়ে মাদিনাতু অঞ্চলে একটি অস্থায়ী ঘাঁটি গড়ে। বাঁশের তাবু তৈরি করে প্রায় ৫০০০ মানুষ থাকতে শুরু করে একসঙ্গে। সেখানেও জীবনযাত্রা খুব কঠিন। খাবার নেই, নিরাপত্তা নেই। বহুক্ষেত্রেই মানুষকে ভিক্ষা করে জীবন কাটাতে হয়। কিন্তু নিজের জায়গায় ফিরে যাওয়ার উপায় ছিল না তাদের। এই চূড়ান্ত অসহায়তারই সুযোগ নেয় পাচারকারীরা। উপার্জনের লোভ দেখিয়ে পাচার করা শুরু হয় মহিলাদের। আর তার পরে যা ঘটে তাঁদের সঙ্গে, যেভাবে তাঁরা 'বেবি ফ্যাক্টরি'র শিকার হন, তা পড়লে শিউরে উঠতে হয়।

সম্প্রতি পাচারকারীদের হাত থেকে উদ্ধার হওয়া কিছু মহিলার সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে এই সব চাঞ্চল্যকর তথ্যই। তাঁদের মধ্যে দু'জনের বয়ানে জানা যায়, যখন তাঁরা ১৬-১৭ বছরের ছিলেন তখনই তাঁদের সঙ্গে ঘটে এই ঘটনা। তাঁরা জানান, চার বছর ধরে তাঁরা মদিনাতু ক্যাম্পে চূড়ান্ত দারিদ্র ভোগ করেছিলেন। তার পরেই 'ভাল উপার্জন'-এর প্রস্তাব আসে তাঁদের কাছে। মরুভূমিতে জলের ঠিকানা খুঁজে পাওয়ার মতোই এক মহিলার সঙ্গে চলে যান তাঁরা। কিন্তু অচিরেই বুঝতে পারেন, সেই জলের ঠিকানা আসলে মরীচিকা ছাড়া কিছু ছিল না।

তাঁরা জানান, নানা পথে ঘুরিয়ে শেষে এনুগু এলাকায় একজন বয়স্ক মহিলার হাতে তুলে দেওয়া হয় তাঁদের। বলা হয়, মহিলার কথামতো কাজ করতে। একটি ঘরে তাঁদের আশ্রয় দেওয়া হয়, যেখানে আগে থেকেই অনেক তরুণী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে আবার অনেকেই অন্তঃসত্ত্বা! তাঁদের নামানো হয় দেহ ব্যবসায়। মর্মান্তিক ধর্ষণের শিকার হতে থাকেন তাঁরা প্রতিদিন। এমনকি একই দিনে একাধিকবার ধর্ষিত হতেন তাঁরা।

তবে এ ধর্ষণ বা দেহ ব্যবসারও উদ্দেশ্য ছিল। উদ্দেশ্য ছিল, তাঁদের গর্ভধারণ করানো। মাসখানেক পরেই তাঁরা অন্তঃস্বত্ত্বা হয়ে পড়েন। পালানোর কোনও উপায় ছিল না। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থাতেও চলে মারধর। এর পরে তাঁদের সন্তানের জন্ম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মায়ের থেকে সন্তানকে আলাদা করে দেওয়া হয়। এরকম একবার নয়, পরপর কয়েকবার ঘটে তাঁদের সঙ্গে। পরে তাঁরা জানতে পারেন তাঁদের সন্তানকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এমনটাই তো হয়ে থাকে 'বেবি ফ্যাক্টরি'-তে।

যে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে এই মহিলাদের উদ্ধার করা গেছে, সেই সংস্থার তরফে জানা গেছে, এভাবেই শিশু বেচার চক্র চালায় ওই পাচারকারীরা। যাঁদের সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তাঁরা চড়া দামের বিনিময়ে দত্তক নেন ওই সব শিশু। কোনও কোনও শিশুকে আবার স্রেফ শ্রমিক হিসেবে বেচে দেওয়া হয়। বাচ্চা ছেলেরা অনেক চড়া দামে বিক্রি হয় বলে জানিয়েছে ওই সংস্থা। বাচ্চা ছেলেদের দর থাকে প্রায় ২০০০ ডলার। ভারতীয় মূল্যে প্রায় দেড় লাখ টাকা। বাচ্চা মেয়েদের বিক্রি করা হয় ১ লাখ টাকার কিছু কম দামে।

এনুগু এলাকায় এরকম বেশ কিছু অবৈধ অনাথ আশ্রমেরও খোঁজ পাওয়া গেছে, যেগুলি এই বাচ্চা বিক্রির কাজে সক্রিয়। অনেক সময়েই যাঁরা বাচ্চা কেনেন তাঁরা এই বিষয়ে জানতেই পারেন না। তবে এরকম কত মহিলা পাচার করা হয়েছে, কত শিশুকে চুরি বা বিক্রি করা হয়েছে তার কোনও হিসেব নেই। রাষ্ট্রসঙ্ঘের একটি রিপোর্ট বলছে, প্রতি বছর প্রায় আট লক্ষ পাচারের ঘটনা ঘটে নাইজেরিয়ায়। যাদের অনেককেই বেচে দেওয়া হয় অন্য দেশে।

বছরের পর বছর ধরে এরকম নারী পাচার, শিশু বিক্রির ঘটনা ঘটেই চলেছে। প্রশাসনিক তরফে যে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না তা নয়। তবে তার পরেও চোরাগোপ্তা চলছে এই কারবার। মদিনাতু ক্যাম্পের অনেকেই বলেছেন খাদ্য-পানীয়ের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারলে তবেই এই পাচারকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।