
শেষ আপডেট: 15 May 2023 13:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তিনি দলের কেউ নন (Sunil Kanugolu)। তাঁর পেশাকে বাংলায় বলা হয় 'ভোটকুশলী'। ২০১৪-এর পরবর্তী ভারতীয় নির্বাচনের অভিধানে একেবারে জাঁকিয়ে বসে পড়েছে এই শব্দ। তবে এতদিন শব্দটার সংজ্ঞা ও উদাহরণ লিখতে দিলে, উদাহরণে একটাই নাম পাওয়া যেত। প্রশান্ত কিশোর (Prashant Kishor)। বিহারের রোহতাস ও বক্সার থেকে উঠে আসা, পেশায় ইঞ্জিনিয়ার প্রশান্ত প্রায় এক দশক কাজ করেছিলেন রাষ্ট্রপুঞ্জে। তারপর দেশে ফিরে এসে ভোটকুশলীর কাজ তাঁকে প্রায় নায়কে পরিণত করে। নরেন্দ্র মোদীর ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের মহাকাব্যিক জয়ের নীল নকশা বেরিয়েছিল তাঁর মাথা থেকেই।
সেই প্রশান্ত কিশোরের অধীনেই কাজ শুরু করেছিলেন সুনীল কানুগোলু। বাবা কন্নড়, মা তেলুগুভাষি। এদিকে বেড়ে ওঠার একটা বড় অংশ কেটেছে চেন্নাইতে। ফলে ঘনিষ্ঠমহলে কান পাতলেই শোনা যায়, তিনি নাকি ফোনে কন্নড়, তামিল, তেলুগু এমনকি মালয়ালম বা গুজরাতিতেও নির্দেশ দিতে পারেন। হিন্দি আর ইংরেজি তো আছেই!
এই মুহূর্তে কর্নাটকে যে কংগ্রেস-বিজয় পর্ব চলছে (Karnataka Assembly Election), তার নেপথ্যের অন্যতম প্রধান চিত্রনাট্যকার এই সুনীল কানুগোলু। শোনা যাচ্ছে, কংগ্রেসের প্রচার থেকে ইস্তেহার, সংগঠন থেকে বুথে বুথে প্রার্থী বাছাই— সবেতেই ছায়ার মত তিনি রয়েছেন। অথচ দলের বড়কর্তাদের বাইরে কেউই বিশেষ কিছু জানেন না তাঁকে নিয়ে। মিডিয়াও অন্ধকারে। চট করে দেখলে অনেকে হয়ত চিনতেও পারবেন না।
জন্ম কর্নাটকের বেল্লারিতে। লৌহ আকরিকের অন্যতম বৃহৎ খনি এই বেল্লারি এককালে ছিল বিজয়নগর রাজ্যের অধীনে। পরে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর পাঠ শেষ করেন চেন্নাইতে। স্নাতকের পরে ফিনান্স এবং ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর শেষ করেন তিনি। কর্মসূত্রে চলে যান আমেরিকায়।

ঠিক কবে সুনীল ফিরে এসে বিজেপির হয়ে প্রথম প্রচার-দলের অংশ হন, বা পরে ডিএমকের হাল ধরেন, সেই বিষয়ে খাঁটি খবর নেই। বস্তুত, এটাই সুনীলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি ভয়াবহ প্রচারবিমুখ। প্রশান্ত কিশোর ২০১৪-এর লোকসভা ভোটে সাফল্যের পরে বারবার প্রচারের আলোয় থেকেছেন, সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটেও 'পিকে' অন্যতম ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শেষে তিনি নিজের দল গড়বেন বলেও জানিয়েছেন। অথচ সুনীলের নাগাল পাওয়াটাই যেন অসম্ভব। পর্দার আড়ালে যেখান থেকে তিনি কাজ করেন, সেখানে সংবাদমাধ্যমও সহজে ঢুকতে পারে না।
এহেন সুনীল কানুগোলুর সঙ্গে কর্নাটকের প্রদেশ কংগ্রেসের এক নেতার মাধ্যমে আলাপ হয় রাহুল গান্ধীর। মাত্র বছরখানেক আগের কথা। রাহুল হঠাৎই কর্নাটকের প্রায় তিরিশ জন সিনিয়র কংগ্রেস নেতাকে দিল্লিতে জরুরি তলব করেন। কী কারণে বা কী বৈঠক হবে, সে বিষয়ে কেউই কিছু জানতেন না। দিল্লির এক হোটেলের কনফারেন্স রুমে প্রায় আধঘন্টা অপেক্ষা করিয়ে শেষে রাহুল ঢোকেন। সঙ্গে এক 'তরুণ'। আলাপ করিয়ে দেন, ইনিই কংগ্রেসের পরবর্তী কর্নাটক নির্বাচনের প্রধান 'স্ট্র্যাটেজিস্ট'। নেতারা প্রায় আকাশ থেকে পড়েছেন। চেনেনই না কেউ তাঁকে। অথচ এত জন পোড়খাওয়া নেতার সামনে ইনি হবেন কুশলী? বিশ্বাস করতে পারেননি অনেকেই।

সুনীল কিন্তু সময় নষ্ট করেননি। চটপট গড়ে ফেলেছিলেন নিজের দল, শুরু করেছিলেন নিজেদের দফতর। সেখানে কাজের জন্য দেশের সেরা আইআইটি, আইআইএম থেকে কৃতী ছাত্রছাত্রীদের বাছাই করে আনা হয়। বানানো হয় গোটা কর্নাটকের একেবারে জেলা বা ব্লক ধরে ধরে তথ্যভাণ্ডার। প্রতিটি জেলার কোথায় কীরকম জনসংখ্যা, তাদের দাবিদাওয়া কী, কোন আসনে কীরকম 'ট্রেন্ড' থাকে, কোথায় কীরকম দাবিতে ভোট হয়— সাজানো হয় সবকিছুই। কংগ্রেসের নেতারা আড়ালে অনেকেই স্বীকার করেছেন, সুনীল যাকে বলে 'কাজপাগল'। কাজ ছাড়া কিছুই বোঝেন না। প্রতিটি আসনের 'গ্রাউন্ড রিপোর্ট' তাঁর নখদর্পণে। কোথায় কী হচ্ছে, কড়া নজর থাকে তাঁর। এমনকি তিনি সশরীরে না থাকলেও সেদিকটা দেখে নেয় তাঁর 'টিম'।
এই সুনীল কানুগোলুর হাতেই তৈরি হয় কংগ্রেসের 'প্ল্যান', 'ইস্তেহার' এবং 'স্লোগান'। বিজেপি ততদিনে মেরুকরণ তীব্র করেছে। বজরং দল, বজরংবলী, হিজাব থেকে হিন্দুত্বের সবক'টি তাসই খেলে ফেলেছে তারা। লিঙ্গায়ত ভোটব্যাঙ্কেও ছাড় দেয়নি। কিন্তু সুনীলকে টলানো যায়নি। স্থিতধী, তীক্ষ্ণ ও স্বল্পবাক সুনীল কড়াভাবে পর্যালোচনা করে দেখেছেন, এই ধরণের চেষ্টায় আদৌ লাভ হবে না। সেই মতই পরামর্শ দিয়েছেন।

শেষে ভোটের ঠিক আগে একেবারে ডেথ ওভারের ঝোড়ো ব্যাটসম্যানের মতই প্রচারে নামেন খোদ নরেন্দ্র মোদী। অন্তত কুড়িটা জনসভা, ছয়টি রোড শো করেন তিনি, তার মধ্যে তিনটেই একেবারে বেঙ্গালুরু শহরে। আয়োজনে কোনও ত্রুটি রাখেনি বিজেপি। প্রধানমন্ত্রীও দলের প্রচারের সঙ্গে সুচারুভাবে দেদার সরকারি প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন। কিন্তু ফল বেরোতেই দেখা গেল, রাজধানী বেঙ্গালুরু ছাড়া বিশেষ লাভ হয়নি মোদীর। বেঙ্গালুরু বাদে যে ১৭-টি জায়গায় তিনি জনসভা করেছেন, তার মাত্র পাঁচটিতে বিজেপি জিতেছে। কেবলমাত্র উপকূলীয় অঞ্চলের আসনগুলোতে, যেমন কুন্দাপুরা, উদুপী, কাপু, কারকল বা তীর্থহল্লিতে বিজেপি জয় পেয়েছে।
সুনীল কানুগোলুকে অবশ্য এখনও সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। তাঁর একটা বড় গুণ, তিনি বিভিন্ন নেতার সঙ্গে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক রেখে চলেন। কিন্তু এই জয়ের পরেও প্রচারে আসতে নারাজ তিনি। তাঁর বিশেষ ছবিও নেই সাংবাদিকদের কাছে। তবে সুনীলের দায়িত্বে খামতি নেই। সামনেই তেলেঙ্গানার নির্বাচন। তারপর নির্বাচন আসছে ছত্তীসগড়, রাজস্থান এবং মধ্যপ্রদেশে। হাওয়া যেরকম, তাতে এই সবক'টিতেই কংগ্রেসের তরফে সুনীলকেই রাখা হতে পারে।
এসব যদিও মিড টার্ম পরীক্ষা। তাঁর আসল পরীক্ষা হবে পরের বছর, ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে। যা কার্যত কংগ্রেসের অস্তিত্ব ফিরে পাওয়ার লড়াই।
৩১টি বিধানসভার ভোটে বিজেপি জিতেছে ৬টি, কী করে সরকারে আছে ১৬ রাজ্যে