দ্য ওয়াল ব্যুরো: ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনেই সারছে করোনা, এমন দাবি প্রথম করেছিলেন মার্কিন বিজ্ঞানীরাই। করোনা চিকিৎসায় হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনকে ‘গেম চেঞ্জার’ বলেও দাগিয়ে দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্বজুড়ে এই ওষুধ নিয়ে যখন হইচই চলছে, তখন মার্কিন গবেষকরাই ফের দাবি করলেন করোনা সারাতে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের কোনও সুফল লক্ষ্য করা যায়নি। উল্টে ওই ওষুধের প্রভাবে রোগীদের মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেড়েছে।
কোভিড-১৯ সংক্রমণ রুখতে ম্যালেরিয়ার ওষুধ কতটা কার্যকরি এই নিয়ে গবেষণা চলছিন মার্কিন স্বাস্থ্যমন্ত্রকের অধীনস্থ ভেটেরানস হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে (ভিএইচএ)। এই গবেষণায় ভিএইচএ-র সঙ্গে ছিল আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ ও ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটি। গবেষকরা বলছেন, ৩৬৮ জন রোগীর উপরে ট্রায়াল শুরু হয়। এই রোগীদের দুটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। ৯৭ জন রোগীকে ওষুধ খাওয়ানো হয় এবং বাকি ১৫৮ জনকে রোগীকে ওষুধ খাওয়ানো হয়নি। দুটি দলকেই পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। দেখা যায় যে ৯৭ জন এই ওষুধ খেয়েছিলেন তাঁদের মৃত্যুর হার ২৭.৮%। অন্যদিকে, বাকি যাঁরা এই ওষুধ খাননি তাঁদের মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে কম, ১১.৪%।
দক্ষিণ ক্যারোলিনার কলম্বিয়া ভিএ হেলথ কেয়ার সিস্টেমের গবেষকরা বলেছেন, “যে রোগীদের শুধু হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন দেওয়া হচ্ছে, তাদের মৃত্যুর হার বেশি। তবে আরও বেশি গবেষণা ও পর্যবেক্ষণেই এই ব্যাপারে নিশ্চিত তথ্য দেওয়া যাবে। সার্বিকভাবে এই ড্রাগ ব্যবহারের আগে এই গবেষণা অত্যন্ত জরুরি।”
গবেষকরা এমনও দাবি করেছেন, করোনা রোগীদের উপরে এই ওষুধের তেমন কোনও প্রভাব লক্ষ্য করা যায়নি। ট্রাম্প বলেছিলেন, হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন খেলে নাকি সংক্রামিত রোগীদের আর ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়ার দরকার হবে না। তাদের সমস্যা এমনিতেই কমে যাবে। কিন্তু রোগীদের দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণে রেখে তেমন কোনও কার্যকরি প্রভাব দেখা যায়নি। হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন খাওয়ার পরেও সঙ্কটাপন্ন রোগীকে আইসিইউতে ভর্তি করে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দিতে হয়েছে। বরং দেখা গেছে কিছু ক্ষেত্রে রোগীর শারীরিক সমস্যা বেড়েছে।
আবার হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের সঙ্গে অন্য ড্রাগ যেমন অ্যাজিথ্রোমাইসিনের কম্বিনেশন করিয়েও দেখা গেছে বিশেষ কোনও লাভ হয়নি। এই দুই ওষুধ একসঙ্গে রোগীকে খাওয়ানোর পরেও সংক্রমণ কমার কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি।
ক্লোরোকুইন ফসফেট ম্যালেরিয়া সারানোর ওষুধ। ক্লোরোকুইনের হাইড্রক্সিলেটেড সল্টকে বলে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন। ম্যালেরিয়া ছাড়াও এটি অন্য কানেক্টিভ টিস্যু ডিসঅর্ডার যেমন লুপাস, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস, জোগ্রেন সিন্ড্রোম ইত্যাদি রোগে এর ব্যবহার হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও টেসলা প্ল্যান্টের কো-ফাউন্ডার ইলোন মাস্ক দাবি করেছিলেন, করোনাভাইরাসের মোকাবিলায় হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন মারাত্মক সুফল আনতে পারে। ট্রাম্পের ঘোষণার পরেই আমেরিকায় তো বটেই অন্যান্য দেশেও এই ওষুধের চাহিদা বেড়ে যায়। তবে মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA) জানিয়েছিল, করোনা রোগীদের উপরে এই ড্রাগ কতটা কার্যকরি সেটা এখনও স্পষ্ট নয়। এফডিএ জানিয়েছিল, কোভিড-১৯ সংক্রমণ যদি প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে অথবা অল্পের উপর হয় তাহলে ক্লোরোকুইনের নির্দিষ্ট ডোজে সেটা কমতে পারে। গোটা শরীরে যদি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে তাহলে কীভাবে সেটা ক্লোরোকুইন প্রয়োগ করে রোখা যাবে সেই গবেষণাই চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। এফডিএ এমনও দাবি করেছিল, ওষুধের মাত্রা যদি ২ গ্রামের বেশি হয়ে যায়, তাহলে সেটা রোগীর মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তাই করোনার সংক্রমণ কমাতে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের প্রয়োগ যে সবক্ষেত্রেই সাফল্য আনবে সেটা এখনও জোর গলায় বলতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।
করোনা চিকিৎসায় হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনকে সবুজ সঙ্কেত দিতে পারেনি ভারতও। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ এই ওষুধের ব্যবহারে একটি নির্দেশিকা জারি করেছিল। বলা হয়েছিল, রোগীদের উপরে এখনই এই ওষুধ প্রয়োগ করা যাবে না। বরং যে স্বাস্থ্যকর্মীরা ২৪ ঘণ্টা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করছেন তাদের উপরে প্রয়োগ করা যেতে পারে এই ড্রাগ। পসর্গ ধরা পড়েনি (Asymptomatic) কোয়ারেন্টাইনে থাকা এমন রোগী যাদের শরীরে কোভিড-১৯ পজিটিভ, তাঁদের সংস্পর্শে থাকছেন বা চিকিৎসা করছেন এমন ব্যক্তিদের উপরেও প্রয়োগ করা যাবে এই ড্রাগ। তবে যাঁরা এই ওষুধ খাবেন তাঁদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করানো জরুরি। তবে সম্প্রতি আইসিএমআর জানিয়েছে, এই ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া চিন্তার বিষয়। যে স্বাস্থ্যকর্মীদের এই ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল তাঁদের বেশিরভাগেরই পেটে ব্যথা, বমি ভাব ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যা দেখা গেছে।