দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনা কালে মানুষের জীবনে কী কী পরিবর্তন হচ্ছে তার সমীক্ষা চালাচ্ছে বিভিন্ন সংস্থা। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রকের উদ্যোগেই বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের সমীক্ষায় কিছু নতুন পর্যবেক্ষণের কথা তুলে ধরেছে। মেডিক্যাল সায়েন্স জার্নালে এই গবেষণার রিপোর্ট সামনে এসেছে।
স্বাস্থ্য আধিকারিকরা বলছেন, একদিকে ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়াচ্ছে অন্যদিকে স্বাস্থ্য সঙ্কটের এই জটিল সময় আতঙ্কও বেড়ে চলেছে। এই দুইয়ের প্রভাবে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নানা বদল আসছে। ভাইরাসের সংক্রমণ সারিয়ে উঠছেন যে রোগীরা পরবর্তী পর্যায়ে গিয়ে অর্থাৎ পোস্ট-কোভিড ফেজে তাঁদের শরীরে ও মনে নানা রোগ বাসা বাঁধছে। আবার সংক্রামিত হননি যাঁরা, ভাইরাসের আতঙ্কে তাঁরাও মানসিক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় ভুগছেন। যার থেকে তীব্র মানসিক চাপ, অবসাদ, এমনকি ইনসমনিয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। মানসিক অবসাদে বেশি ভুগছেন মহিলা ও কমবয়সী ছেলেমেয়েরা। বয়ঃসন্ধির তরুণ-তরুণীরাও মানসিক ট্রমার শিকার।
করোনা কালে মানসিক অবসাদের শিকার কমবয়সীরা
স্বাস্থ্য মন্ত্রকের যুগ্মসচিব ডক্টর মনোহর আগনানি বলছেন, স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের এই পর্যায়ে মানসিক অবসাদ আর আতঙ্ক মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে কমবয়সীদের মধ্যে যা চিন্তার কারণ। ‘পপুলেশন ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিয়া’ (PFI) একটি সমীক্ষা চালায় যেখানে ছেলেমেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করা হয়। রাজস্থান, বিহার ও উত্তরপ্রদেশে প্রথম এই সমীক্ষা শুরু হয়। ৮০১ জন ছেলেমেয়েকে নানারকম ভাবে প্রশ্ন করেন বিশেষজ্ঞরা। প্রত্যেকের বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৮৯ শতাংশ ছেলেমেয়ে জানিয়েছে তারা করোনা নিয়ে মেন্টাল ট্রমায় ভুগছে। ভাইরাস তাদের শরীরেও ঢুকবে এই ভাবনা থেকেই তৈরি হচ্ছে প্রচণ্ড মানসিক চাপ। উদ্বেগ এতটাই বেশি যে তারা ঘন ঘন হাত ধোওয়া শুরু করেছে। এই হাত ধোয়ার অভ্যাস বাতিকে দাঁড়িয়ে গেছে। ৯৬ শতাংশ বলেছে, তারা বাড়িতেও মাথা, মুখ ঢেকে রাখছে। ভয় এতটাই যে সবসময় মনে হচ্ছে ভাইরাস ঢুকে পড়বে শরীরে।
অনলাইনে অ্যাবরশন পিল নিয়ে সার্চ করছেন মহিলারা
গবেষণা বলছে, দীর্ঘ লকডাউনের এই পর্যায়ে গার্হস্থ্য হিংসা যেমন বেড়েছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মানসিক অবসাদ। কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে কমবয়সীদের মধ্যে। সার্চ ইঞ্জিনে এই নিয়ে খোঁজাখুঁজিও হয়েছে। আবার গর্ভপাতের বিষয়ে জানতে চেয়ে অনলাইনে সার্চ করেছেন মহিলারা। অ্যাবরশন পিল নিয়ে সার্চের রেজাল্ট বেশি। ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী মহিলারাই সবচেয়ে বেশি অ্যাবরশন পিল নিয়ে সার্চ করেছেন।
বাড়িতে কীভাবে গর্ভপাত করানো যায় সেই নিয়ে খোঁজাখুঁজির ঝোঁক বেড়েছে বয়ঃসন্ধির মেয়েদের মধ্যে। গর্ভনিরোধক পিল নিয়েও সার্চ করছেন মহিলারা।
স্বাস্থ্য আধিকারিকরা বলেছেন, করোনা সঙ্কটের প্রভাব পড়েছে মহিলাদের হাইজিনেও। সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাড়িতে থাকার কারণে অনেক মহিলাই স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করছেন না। সংক্রমণের ভয়েও প্যাড ব্যবহারে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে অনেকেরই। ১৮ বছরের নিচে ৫৮ শতাংশ মেয়েদের মধ্যে এমন দেখা গেছে। আবার প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এই ধারণা তৈরি হয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে অন্তত ৫১ শতাংশ মহিলা বলেছেন তাঁরা লকডাউনের এই সময় হয় স্যানিটারি প্যাড কিনতে পারেননি, না হয় প্যাড ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছেন।
Quilt.AI এর সমীক্ষা বলছে, শহরের অনেক মহিলাই স্যানিটারি প্যাডের বদলে ট্যাম্পনের ব্যবহার শুরু করেছেন। ট্যাম্পন নিয়ে অনলাইনে সার্চও হয়েছে। ৭০ শতাংশ মহিলা স্যানিটারি প্যাডের বদলে ট্যাম্পনের ব্যবহার শুরু করেছেন।
মৃত্যুর আতঙ্ক, স্ট্রেস থেকে ইনসমনিয়া
৪৬ শতাংশ ছেলেমেয়ে যাদের বয়স ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে এক অজানা অতঙ্কে ভুগতে শুরু করেছে। স্বাস্থ্য আধিকারিকরা বলছেন, ২৪% পুরুষ ও ২২% মহিলা বলেছেন তাঁরা নানাভাবে মানসিক চাপে ভুগছেন। ২৯ শতাংশের মধ্যে মৃত্যুভয় তৈরি হয়েছে। ভাইরাসের সংক্রমণে তাঁদের তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হবে, সেখান থেকে মৃত্যু হবে এমন আতঙ্ক তৈরি হয়েছে অনেকের মনেই। স্বাস্থ্য আধিকারিকরা বলছেন, অন্তত ৫৫ শতাংশ রোগী নিজে থেকেই বলেছেন তাঁরা মানসিক রোগে ভুগছেন। হয় তীব্র অবসাদ, না হলে সোশ্যাল ফোবিয়া। তাছাড়া ভুল বকা, ভুলে যাওয়া, স্লিপিং ডিসঅর্ডার তো রয়েছেই। ৪২ শতাংশের মধ্যে দেখা গিয়েছে প্রচণ্ড উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। মানসিক চাপ এতটাই যে তার থেকে স্লিপিং ডিসঅর্ডার দেখা দিচ্ছে অনেকের মধ্যেই। অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার, ইনসমনিয়ার শিকার হচ্ছেন অনেকে।