
শেষ আপডেট: 16 October 2023 13:32
দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব মেদিনীপুর: শিল্পীর কোনও ধর্ম হয় না, এই বার্তাই যেন দিচ্ছেন হলদিয়ার আন্দুলিয়ার প্রতিমা শিল্পী নূর মহম্মদ চৌধুরী। প্রতিবছর তাঁর হাতেই চিন্ময়ী হয়ে ওঠেন মৃন্ময়ী দশভুজা। এলাকার বহু বারোয়ারি পুজো কমিটির মণ্ডপে শোভা পায় নূরের তৈরি দুর্গা প্রতিমা।
বয়স যখন পাঁচ কী ছয়, পুকুর থেকে প্রতিমার খড়ের কাঠামো বাড়িতে নিয়ে এসে জড়ো করত ছোট্ট ছেলেটা। সেগুলোর উপর কাদা মাটির প্রলেপ লাগিয়ে প্রতিমা তৈরির চেষ্টা করত। এখন সেই ছেলেই হলদিয়ার নামী প্রতিমা শিল্পী।
প্রতিমা গড়ে সংসারে চাকা এগিয়ে নিয়ে চলেছেন ৫৭ বছরের নূর। স্ত্রী, সন্তান, নাতি-নাতনিদের নিয়ে ভরা সংসার তাঁর। নূর জানিয়েছেন, পাড়ার পটুয়াদের প্রতিমা গড়া দেখে কাজ শেখার জেদ চেপেছিল ছোটবেলায়। মুসলমান হয়ে প্রতিমা গড়বে একথা জেনে অনেকেই বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আপত্তি জানিয়েছেন। এমনকী এই কাজের জন্য নিজের সম্প্রদায়ের মানুষদের কাছে সামাজিকভাবে বয়কটের মুখোমুখিও হতে হয় তাঁকে। মা নূরজাহান বিবি মারা গেলে গোরস্থানে জায়গা দেওয়া হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে নিজের বাড়ির পাশেই মাকে দাফন করতে হয়েছিল তাঁকে।
অজস্র বাধা আসলেও নূর মহম্মদ ছক ভাঙা রাস্তাতেই হেঁটে গিয়েছেন। বরং নিন্দকদের সমালোচনা তাঁকে দেবী মূর্তি গড়ে তোলার বিষয়ে আরও মনোযোগী করে তুলেছে। দুর্দিনে সব সময় নূরের পাশে থেকেছেন স্ত্রী। ছেলেও তাঁর দেখানো পথই অনুসরণ করছে। এমনকী নাতিও ধীরে ধীরে দাদুর কাছে শিখে নিচ্ছে প্রতিমা গড়ার কাজ।
নূরের প্রবল ইচ্ছাশক্তিই তাঁকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে তাঁর অভিষ্ট গন্তব্যের দিকে। দিনে দিনে তাঁর হাতে গড়ার মূর্তির চাহিদা বেড়েছে। প্রতিমা গড়ার ইচ্ছে দেখে শিল্পী ঈশ্বর রাধাকৃষ্ণ সামন্ত তাঁকে নিজের হাতে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। তাতে আরও দক্ষ হয়ে ওঠেন নূর। এখন সারা বছর ধরে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি গড়ে যান তিনি। পুজোর সময় চাপ বেশি থাকে, জেলার বিভিন্ন প্রান্তে পুজো কমিটিগুলি প্রতিমার বায়না নিয়ে আসেন তাঁর কাছে।
নিজের ধর্মকেও কখনও অবহেলা করেননি নূর। নিয়মিত নামাজ পড়েন, সময় করে যান পাশের গ্রামের মসজিদে। নূর মহম্মদ শুধু মূর্তি গড়েননি, গড়ে তুলেছেন দুই ধর্মের মিলন সেতু।