দ্য ওয়াল ব্যুরো: সেই সালটা ছিল ২০০৪। আমলাশোলের সনাতন মুড়ার মৃত্যু কাঁপিয়ে দিয়েছিল গোটা দেশকে। অনাহার তত্ত্বে প্রশাসন অস্বীকার করলেও তলে তলে শিউরে উঠেছিলেন পুলিশ কর্তারা।
সাল ২০১৮। ঘটনাস্থল ঝাড়গ্রামের জঙ্গলখাস এলাকা। ১৫ দিনের মধ্যে ৭ শবরের মৃত্যু ঘিরে ফের তোলপাড় শুরু হয় দেশে। অনাহারক্লিষ্ট, রুগ্ন-অপুষ্টিপীড়িত শবদেহ গুলি দেখে সেবারও অনাহারের বিষয়টা এড়িয়ে গিয়েছিল প্রশাসন। বরং শবরদের অসংযমী জীবন, খাদ্যাভাসের বৈশিষ্ট্যকেই খাড়া করা হয়েছিল মৃত্যুর প্রকৃত কারণ হিসেবে।
সাল ২০১৯। অন্ধ্রপ্রদেশের অনন্তপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম। মাটি খুড়ে দুই শিশুর পচা গলা শব বাইরে এনে স্তম্ভিত প্রশাসন। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বলল, অনাহারে মৃত্যু হয়েছে দুই শিশুর। একটি ছেলে, অন্যটি মেয়ে। বয়স পাঁচের আশপাশে। পাকস্থলী ভর্তি মাটি দিয়ে। খিদের জ্বালা মেটাতে দলা দলা মাটি খেত তারা।
ছেলেটির নাম সন্তোষ। মেয়েটি ভেন্নালা। সন্তোষের মৃত্যু হয় ছ’মাস আগেই। চুপি চুপি মাটি খুঁড়ে দেহ পুঁতে দিয়েছিল তার বাবা, মা। ভেন্নালার মৃত্যু হয় গত ২৮ এপ্রিল। এ বারেও সেই একই মটি খুঁড়ে মৃতদেহ পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। তবে খবরটা জানাজানি হয়ে গিয়েছিল কোনও ভাবে। গ্রামে পৌঁছে গিয়েছিল বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন থেকে মানবাধিকার কমিশনের সদস্যরা। পৌঁছে গিয়েছিল পুলিশও। প্রথমে মুখে কুলুপ আঁটলেও পরে সন্তোষের বাবা-মা মহেশ ও নীলা স্বীকার করেছিল অনাহারে, অপুষ্টিতেই মৃত্যু হয়েছে দু’জনের। এমনকি দিনের দিনের পর দিন না খেয়ে থাকেন তাঁরা ও অবশিষ্ট চার সন্তানও।
মহেশ ও নীলা কর্নাটকের চিকাবল্লালপুর জেলার বাসিন্দা। তাঁদের পাঁচ সন্তান। ছোটটির নাম সন্তোষ। ভেন্নালা নীলার বোনের মেয়ে। ছ’টি শিশুকে নিয়ে এই পরিবার কর্নাটক ছেড়ে অনন্তপুরে আসে মাস ছয়েক আগে। মহেশ ও নীলা জানিয়েছে, কাজের খোঁজে তারা অনন্তপুরে আসে, তবে এই ছ’মাসে মানুষের দোরে দোরে ঘুরলেও কোনও কাজ জোটেনি তাঁদের। আশ্রয় মেলে গাছতলায়। খাবার জোটে কখনও ভিক্ষা পেলে, বাকি সময়টা অনাহার।
খিদে মেটাতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো কখন যে মাটি খাওয়া শুরু করে দিয়েছিল, সেটা টেরই পাননি মহেশ ও নীলা। বা পেলেও তাঁদের কিছু করার ছিল না। কারণ খিদে ভুলতে তাঁরা বেশিরভাগ সময়েই নেশা করে থাকতেন। মাস ছয়েক আগে ধুঁকতে ধুঁকতে মৃত্যু হয় সন্তোষের। তাকে চুপিসাড়ে মাটিতে পুঁতে দেন তাঁরা। দিন কয়েক আগে একই ভাবে মারা যায় ভেন্নালা। সেও মাটি খেত তার ভাইয়েরই মতো। বাকি চার শিশুরও এই অভ্যাস তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন নীলা।
ঘটনার জোরদার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। এগিয়ে এসেছে নানা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। এনজিও ‘বালালা হাক্কুলা সঙ্ঘাম’ সম্প্রতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে বিষয়টি নিয়ে নালিশ ঠুকে দিয়েছে। শিশু অধিকার রক্ষা সংগঠনগুলির কাছে আবেদনও পৌঁছে গেছে।
অন্ধ্রের কাদিরি এলাকার পুলিশ সুপার এ ইসমাইল বলেছেন, “ঘটনার কথা আমরা জানতে পেরেছি। ওই পরিবারের কোনও থাকার জায়গা ছিল না। গাছতলায় যেখানে তারা আশ্রয় নিয়েছিল, তার সামনেই মাটি খুঁড়ে পুঁতে দেওযা হয়েছিল দুই শিশুকে।” কাদিরি রেভিনিউ ডিভিশনাল অফিসার (RDO) টি অজয় কুমারের কথায়, “আমরা জানতে পেরেছি সন্তোষের মা, বাবা ছিল নেশারু। নিজেদের ছেলেমেয়েকে দেখতো না। তাদের জন্য খাবারের জোগাড়ও করতো না। এই গাফিলতির কারণেই মৃত্যু হয়েছে শিশুদের।” একই তত্ত্ব খাড়া করে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পরই বিষয়টি নিয়ে জানা যাবে বলে দায় এড়িয়ে গেছেন জেলাশাসকও।
এনজিও ‘বালালা হাক্কুলা সঙ্ঘাম’-এর প্রেসিডেন্ট অচ্যুত রাও জানিয়েছেন, অনাহারের বিষয়টা যতই এড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা হোক, লড়াইটা সার্বিক স্তরে চলবেই। তাঁর কথায়, ওই পরিবারের কোনও রেশন কার্ড নেই। নেই আধার কার্ডও। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওই পরিবারের জন্য রেশন কার্ডের বন্দোবস্ত করতে প্রশাসনের কাছে আর্জি জানানো হয়েছে। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা যাতে এই পরিবার পায়, চলছে তার প্রচেষ্টাও। মহেশ ও নীলার বাকি সন্তানদের ‘শিশু সদন কেন্দ্র’ নামে একটি হোমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
একবিংশ শতাব্দীর ভারত। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে গর্ব করা ভারত। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর অন্যতম হিসেবে আস্ফালন করা ভারত। সেই ভারতেরই আনাচ-কানাচে এখনও দানা বেঁধে রয়েছে অনাহার, অপুষ্টি, শিশু-মৃত্যু। তার কিছুটা সামনে আসে, বাকিটা থেকে যায় অন্তরালেই। এই দুই শিশুর মৃত্যু নিয়ে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির হইচইতে বর্তমানে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। তার আগে অবধি বিষয়টা ছিল অন্ধকারেই। আর তার থেকেও বড় কথা, অনাহারে শিশু-মৃত্যুর ঘটনায় যেখানে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে আসলে মা, বাবার গাফিলতিতেই ঘটেছে এমন ঘটনা। অনাহারের ব্যাপারটা সেখানে গৌণ।
কতটা উত্তাপ বাড়লে ছেঁকা লাগবে দেশ-দশের গায়ে? ক'টা শিশু নোংরা, বিষাক্ত মাটি খেয়ে মরলে টনক নড়বে প্রশাসনের? কতদিন আর চোখ বন্ধ করে এই নির্মম সত্যটা চাপা দিয়ে রাখবে সমাজ? প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে।