
শেষ আপডেট: 5 April 2025 12:45
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে (SSC Supreme Court Verdict) যা বলা হয়েছে তা থেকে পরিষ্কার যে, যোগ্য প্রার্থীদের আবার পরীক্ষা দিয়েই নতুন করে চাকরি পেতে হবে। বিভিন্ন মতামত দেখে-শুনে-পড়ে এটাই মনে হয়েছে যে, এখনও পর্যন্ত প্রায় সকল রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষদেরও প্রায় সকলেই চাইছেন যোগ্য প্রার্থীরা যেন বঞ্চিত না হন। চাইছেন যে, তাঁরা চাকরি ফিরে পান। অর্থাৎ, বিশেষ সহানুভূতি নিয়ে তাঁদের সকলেই দেখতে প্রস্তুত। প্রশ্ন হল, নতুন একটি পরীক্ষা নিলে, কীভাবে যোগ্য প্রার্থীরাই যে আবার চাকরি পাবেন তা নিশ্চিত করা যাবে?
এই প্রশ্নের উত্তরে, সুপ্রিম কোর্টের রায়টিকে (SSC Supreme Court Verdict) মাথায় রেখে, আমার কতগুলি প্রস্তাব রাজ্য সরকার এবং স্কুল সার্ভিস কমিশনের কর্তা ব্যক্তিদের কাছে পেশ করতে চাই। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে; যোগ্য যেসব প্রার্থীরা চাকরি হারিয়েছেন তাঁদের অনেকের শিক্ষক হিসেবেও।
এসএসসির (SSC) চেয়ারম্যান বলেছেন যে, নতুন পরীক্ষায় কারা অংশ নিতে পারবেন সে বিষয়ে রায় থেকে তাঁরা স্পষ্ট কোন ধারণা পাননি। রায়টি খুঁটিয়ে পড়লে তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারতেন যে, সুপ্রিম কোর্ট বলেনি কোথাও যে, আগেরবার যাঁরা পরীক্ষা দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অযোগ্য প্রার্থীরা ছাড়া কেবল বাকিরাই পরীক্ষা দেবেন। এর অর্থই হল নতুন বিজ্ঞপ্তি অনুসারে অযোগ্য প্রার্থী হিসেবে যাঁরা ইতিমধ্যেই চিহ্নিত তাঁরা ছাড়া যে কেউ পরীক্ষা দিতে পারবেন। অর্থাৎ সদ্য স্নাতক হওয়া একজন ছাত্র বা ছাত্রীও পরীক্ষা দিতে পারবেন। যে কোনো সরকারি পরীক্ষার ক্ষেত্রে এটাই নিয়ম। এমনকি কোনো পরীক্ষা নির্দিষ্ট সময়ে না হলে, তিন বা চার বছর পরে সেই পরীক্ষার জন্য আবার বিজ্ঞপ্তি জারি করলেও পুরোনো প্রার্থীদের সঙ্গে নতুনরাও সেই পরীক্ষা দিতে পারে। এই কথাটি মাথায় রেখেই আমি প্রথম প্রস্তাবটি পেশ করছি।
দীর্ঘদিন ধরে স্কুলে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন যাঁরা তাঁদের অনেকের পক্ষেই নতুন একটি পরীক্ষা, যে-পরীক্ষায় সদ্য স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পরীক্ষা পাস করা একজন ছাত্র বা ছাত্রীর সঙ্গে তাঁদের প্রতিযোগিতায় নামতে হবে, সেই পরীক্ষায় ন-বছর আগে হয়ে-যাওয়া একটি পরীক্ষার মতনই ফলাফল করা অতখানি সহজ নাও হতে পারে। লড়াইটা তাঁদের অনেককে একটু পিছিয়ে থেকেই শুরু করতে হতে পারে। ন-বছরে, বিশেষ করে কোভিডকাল ও পরবর্তী সময়ে, রাজ্য জুড়েই বিশ্ববিদ্যালয়গুলিও সাধারণভাবে নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকখানি উদার হয়েছে। মানে আজ একজন ছাত্র বা ছাত্রী যে-নম্বর পেয়ে পাস করছে, দশ বছর আগে সেই একই মেধার একজন ছাত্র বা ছাত্রীর পক্ষে সেই নম্বরটুকু পাওয়া বেশ কঠিনই ছিল। অর্থাৎ অ্যাকাডেমিক নম্বরের হিসেব কষলে সেখানেও ২০১৬ সালের যোগ্য প্রার্থীরা সাধারণভাবে গত দু-তিন বছরে যে-সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীরা স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাস করেছে তাদের থেকে পিছিয়েই থাকবেন। এই বৈষম্য দূর করা যেতে পারে যোগ্য প্রার্থীরা যে ক-বছর স্কুলে পড়িয়েছেন, সেই সময়কালের জন্য তাঁদের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার ওপর কিছু নম্বর দিলে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এ নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। কিন্তু একটি ইঙ্গিত আছে যেটিকে ব্যবহার করে, এই কাজটুকু করা যেতে পারে। রায়ে বলা আছে যে, অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে যেসব যোগ্য প্রার্থীরা স্কুলে পড়াতে এসেছিলেন, তাঁরা সেই পুরোনো চাকরিতে ফিরে গেলে, তাঁদের সিনিয়রটি অক্ষুণ্ণ থাকবে। তাঁদের সার্ভিস ব্রেকও হবে না। তাঁদের সিনিয়রটি অক্ষুণ্ণ থাকলে ব্রেক ইন সার্ভিস না হলে, যে-সমস্ত যোগ্য প্রার্থীদের পুরোনো চাকরিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকছে না, যে ক-বছর তাঁরা স্কুলে পড়িয়েছেন সেই অভিজ্ঞতার জন্য তাঁদের অবশ্যই নম্বর দেওয়া যেতে পারে। তাঁদেরই এক দলের এই সময়ের চাকরি স্বীকৃতি পেলে, তাঁদেরটাই বা পাবে না কেন? তাঁদের মাইনেও যেহেতু ফেরত দিতে হচ্ছে না, তাই তাঁদের স্কুলে পড়ানোর অভিজ্ঞতাকে স্বীকৃতি দিলে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে অমান্য করা হবে না, এমনটাই মনে হচ্ছে। আমি আইনজ্ঞ নই। কিন্তু সরকার এবং স্কুল সার্ভিস কমিশনের আইনজীবীরা এই বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন।
দ্বিতীয় প্রস্তাবটি হল স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষার সিলেবাস সংক্রান্ত। পরীক্ষার জন্য এমন সিলেবাস করা যেতে পারে যে-সিলেবাসের সঙ্গে স্কুলে যে-সমস্ত বিষয়গুলি পড়ানো হয় তার যোগ থাকবে। নতুন পরীক্ষার সিলেবাস বানানোর সময় অনার্স বা এমএ/এমএসসির সিলেবাসকে প্রাধান্য দিলে হবে না। এক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে নিয়ম-কানুন পালটে নিতে হবে। স্কুল সার্ভিস কমিশনকে যেহেতু বারবার একটি ‘স্বশাসিত সংস্থা’ বলে দেখানো হচ্ছে, তাই তারা এ কাজ করতে পারবে, এ কথা ধরে নিতে হয়। প্রশ্ন হল এর ফলে গত ন-বছর ধরে একটা এসএসসির আশায় যে-সমস্ত প্রার্থীরা চাতক পাখির মতো বসে আছে, তাদের কি বঞ্চিত করা হবে? উত্তর হল, না। কেননা এই সিলেবাস তারাও পড়ে তৈরি হয়ে নিতে পারবে। তারা বঞ্চিত হবে না কিন্তু যোগ্য যে-সমস্ত প্রার্থীরা ২০১৬ সালের পরীক্ষার উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি পেয়েছিলেন, তাঁরা একটুখানি সুবিধে পাবেন। এই সুবিধেটুকু কিন্তু তাঁদের প্রাপ্য। এটি অন্যায় সুবিধে নয়।
তৃতীয় প্রস্তাব হল এই যে, স্কুলগুলিতে যত শূন্যপদ আছে কোনো রকমের লুকোচুরি না করে সেই সমস্ত শূন্যপদে একযোগে নিয়োগ করা হোক। সঙ্গে চিহ্নিত অযোগ্য প্রার্থীরা যে-পদগুলিতে কাজ করছিলেন, সেগুলি তো ফাঁকা থাকলই। অর্থাৎ যোগ্য প্রার্থীদের পদ, অযোগ্য প্রার্থীদের পদ, এবং ইতিমধ্যে তৈরি হওয়া শূন্য পদগুলিকে একত্রিত করে নিয়োগ করতে হবে। এতে করে ২০১৬র বঞ্চিত প্রার্থীরা যেমন চাকরি পাবেন, যোগ্য প্রার্থীরা যেমন চাকরি পাবেন, তেমনই গত কয়েক বছরে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাস করা প্রার্থীরাও চাকরি পাবে। অন্তত এই সম্ভাবনাগুলি থাকবে।
আরও একটি প্রস্তাব আছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে কোথাও বলা নেই যে, যোগ্য প্রার্থীদের চুক্তিভিত্তিক (কনট্রাকটচুয়াল) নিয়োগ দেওয়া যাবে না। যোগ্য যে-সমস্ত প্রার্থীরা চাকরি হারিয়েছেন তাঁরা ভয়াবহ সংকটে পড়েছেন। তাঁরা স্কুলে না গেলে কিছু স্কুলে তালা পড়ে যেতে বাধ্য। আমার প্রস্তাব হল, একটি সম্মানজনক মাইনে দিয়ে এই যোগ্য শিক্ষকরা যে যে স্কুলে শিক্ষকতা করছিলেন, সেই স্কুলগুলিতেই তাঁদের সাময়িকভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হোক যতদিন না তাঁদের পূর্ণ সময়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা যাচ্ছে ততদিন। এতে করে ক্ষতে অন্তত খানিকটা প্রলেপ দেওয়া যাবে।
তবে, সমস্ত কাজগুলি সরকার এবং স্কুল সার্ভিস কমিশনকে করতে হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং দুর্নীতি মুক্ত একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। সেটা সুনিশ্চিত না করতে পারলে, আবারও মামলা হবে, আবারও যোগ্য প্রার্থীরা চাকরি হারাবেন। আশা রাখব, এত কিছুর পরে অন্তত মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী ও মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এই সম্ভাবনাটিকে নতুন পদক্ষেপ করার আগে মাথায় রাখবেন।
আরও দু-টি কথা বলা এই প্রসঙ্গে জরুরি। এক, এক বছর পরেই ওএমআর শিট নষ্ট করতে হবে–স্কুল সার্ভিস কমিশনের আইনে থাকা এই নিয়মটি পালটে নিতে হবে। অন্তত ১০ বছর মূল ওএমআর শিট সংরক্ষণ করতে হবে। দুই, সম্পূর্ণ ইন্টারভিউ প্রক্রিয়াটি ভিডিওগ্রাফি করতে হবে। এর ফলে, নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করার আগে একজন প্রার্থী দ্বিতীয়বার ভাববেন। ইন্টারভিউ প্রক্রিয়ার ভিডিওগ্রাফি করলে চাকুরিপ্রার্থীরা যতখানি উপকৃত হবেন, ততখানি উপকৃত হবে সরকারও। এই ক্ষেত্রগুলিতে সরকার যদি জেদ ধরে বসে থাকে, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থার কফিনের শেষ পেরেকটি পোঁতা হয়ে যাবে।