
শেষ আপডেট: 25 May 2023 10:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০১৩ সালের কথা। শেষ হয়েছে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ (Civil War), কিন্তু পরিস্থিতি তখনও রীতিমতো উত্তপ্ত। যার আঁচ এসে লাগল আইপিএলে। তামিলনাড়ুর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা চিঠি লিখলেন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে—'তামিলনাড়ু সরকার আইপিএলের ম্যাচ করতে দিতে সম্মতি দেবে, যদি আয়োজকরা লিখিতভাবে বলেন, কোনও শ্রীলঙ্কার খেলোয়াড়, আম্পায়ার, অফিশিয়াল এমনকী সাপোর্ট স্টাফও সেই ম্যাচে থাকবে না…।' (Sri Lankan players)
ঠিক দশ বছর পরের কথা। চেন্নাই সুপার কিংস (Chennai Super Kings) দলের দুই প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছেন কুড়ি ও বাইশ বছরের দুই শ্রীলঙ্কার বোলার—মাথিসা পাথিরানা ও মাহিষ থিকসানা।

প্রায় অসাধ্য সাধন ছাড়া আর কীই বা বলা যায় একে? তিন দশকের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। গোটা দ্বীপরাষ্ট্র একেবারে ছিন্নভিন্ন। প্রাণ হারিয়েছেন এক লক্ষেরও বেশি। আর এই সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল জাতি ও ভাষার এক ভয়াল লড়াই। যার একদিকে শ্রীলঙ্কার সংখ্যাগুরু, ক্ষমতাসীন সিংহলিরা। স্বাধীনতার পর থেকেই যাদের দাবি ছিল, শুধুমাত্র সিংহলি ভাষাই হবে শ্রীলঙ্কার একমাত্র সরকারি ভাষা। এদিকে শ্রীলঙ্কা বহু ভাষা, বহু ধর্মের দেশ। যাদের মধ্যে সিংহলির পরেই রয়েছে তামিল। দেশের উত্তর থেকে পুবে দীর্ঘদিন ধরে বাস করছেন তামিলভাষীরা। শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে যাদের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক অবদান অসীম।
এই তামিলদের সব রকম অধিকার থেকে বঞ্চিত করা থেকেই শুরু হয় শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ। দাবি ওঠে, এইভাবে বঞ্চনা করলে তামিলদের আলাদা রাষ্ট্র ভাগ-বাঁটোয়ারা করে দিক সরকার! এই দাবিকে ঘিরেই জন্ম নেয় বিশ শতকের দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম কুখ্যাত, শক্তিশালী বিদ্রোহী দল, 'লিবারেশন টাইগারস অফ তামিল ইলম'—বা এলটিটিই। একেবারে সুপ্রশিক্ষিত, সুসংবদ্ধ এই দুর্ধর্ষ যোদ্ধাদের অধীনে ছিল নৌবহর, বিমানবাহিনী এমনকি নিজস্ব গোয়েন্দা বিভাগও! শুরু হয় শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই।

স্বাভাবিকভাবেই এই লড়াইয়ের সুদীর্ঘ ছায়া পড়েছিল ভারতের ওপর। নানাভাবে এতে জড়িয়ে যায় ভারত। শ্রীলঙ্কায় দীর্ঘদিন ধরে চলা তামিল-বিরোধী হামলা, হত্যালীলার তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয় ভারতের তামিলনাড়ু জুড়ে। সম্পর্কটা অনেকটা আমাদের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মতই, বহু মানুষের আত্মীয়-পরিজনরা পক প্রণালীর এপারে ওপারে ছড়িয়ে আছেন। ফলে যুদ্ধের আঁচে পুড়েছিল ক্রিকেট। এতটাই তার আঁচ যে, শ্রীলঙ্কার কিংবদন্তী ক্রিকেট-ঈশ্বর মুথাইয়া মুরলীথরণের "বায়োপিক" ভারতে হবে, তাতে বিখ্যাত দক্ষিণী তারকা বিজয় সেতুপতি অভিনয় করবেন শুনে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল কাবেরীর দুই তীরে। বিজয় কিছুদিনের মধ্যেই জানিয়ে দেন, তিনি অভিনয় করছেন না।
ঘটনাচক্রে, মুরলীথরণ জাতিতে তামিল। তাঁর দাদু ভারত থেকেই চা-বাগানের চাকরিতে গিয়েছিলেন শ্রীলঙ্কায়। পরে ফিরেও আসেন। থেকে যান তাঁর পুত্র, মুরলীর বাবা চিন্নাস্বামী। মুরলীর স্ত্রী আবার ভারতীয় তামিল, চেন্নাইয়ের বাসিন্দা। এই সূত্রে মুরলী "ভারতীয় ওভারসিজ সিটিজেন", যার ফলে ভারতে আসতে তাঁর ভিসা লাগে না। কিন্তু এতেও চিঁড়ে ভেজেনি!
এইরকম পরিস্থিতিতে চিপকে চেন্নাইয়ের ঘরের মাঠে খেলছে চেন্নাই সুপার কিংস এবং তাদের অন্যতম বোলিং অস্ত্র একজন শ্রীলঙ্কার বিশ বছরের সিংহলি—এটা প্রায় কল্পনা করারও বাইরে। অথচ একদম সেটাই হচ্ছে, কোনও সমস্যা ছাড়াই হচ্ছে। পরিস্থিতি এখন অনেকটাই আয়ত্তে। বস্তুত, শ্রীলঙ্কায় রাজাপক্ষে পরিবার প্রায় কোণঠাসা। অর্থনীতিতে নাভিশ্বাস উঠেছে। দেউলিয়া হবার কিনারায় দাঁড়িয়ে সে দেশ। যুদ্ধের দাম যে কীভাভে চোকাতে হয়, টের পাচ্ছে তারা। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গেও সম্পর্ক অনেকটা ভাল হয়েছে এখন। যার প্রমাণ, আইপিএলে চেন্নাই দল ও তাঁদের সিংহলি প্রতিভা।

চেন্নাইয়ের মন জিতে নিয়েছেন মাথিসা পাথিরানা। মুরলীর মত তিনিও শ্রীলঙ্কার পাহাড়ি শহর ক্যান্ডির বাসিন্দা। তাঁর বোলিং অ্যাকশন দেখে একবাক্যে সকলে বলছেন, নতুন মালিঙ্গা। কার্যত ওই অ্যাকশনই তাঁর ব্রহ্মাস্ত্র। ডেলিভারির আগে ডান হাত এতটাই পিছনে নিয়ে যান তিনি যে, কার্যত গোলার মত ছিটকে বেরোয় ইয়র্কার বা ফুল লেংথ। আর এতেই ঘুম ছোটে ব্যাটারের। হাতের অদ্ভুত অবস্থানের জন্যই অন্তত বলের চরিত্র বুঝতে শেষ মুহূর্ত অবধি অপেক্ষা করতে হয়।
মাহিষ থিকসানা আবার শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর সদস্য। পাথিরানার মত 'এলেন, দেখলেন, জয় করলেন' গোছের সাফল্য না এলেও, প্লে-অফে নিজের জাত চিনিয়েছেন এই অফস্পিনার। চেন্নাইয়ের অন্দরমহলে খবর, পাতিরানাকে স্পট করেছিলেন স্বয়ং মহেন্দ্র সিং ধোনি।
গৃহযুদ্ধ এখন অতীত। তবু ইতিহাস কখনও অতীত হয় না। রক্তের সংগ্রাম খোদাই হয়ে থাকে মানুষের স্মৃতিতে। নিরন্তর বহমান সময়ের স্রোতে সেসব মোছা যায় না, পড়ে থাকে বহু ক্ষীণ হয়ে আসা কান্না, হাহাকার। সীমান্ত, বুটের আওয়াজ, ধোঁয়া মিলিয়ে আসে, ওপরে পড়ে অল্প সৌহার্দের প্রলেপ। যার নাম ক্রিকেট। এক মহামিলনের খেলা। যুদ্ধ ভুলিয়ে পাশাপাশি ভাল থাকার খেলা। চেন্নাইয়ের মাঠেও জনতা আপন করে নেয় দুই উঠতি শ্রীলঙ্কার প্রতিভাকে।
‘কেকেআর আমাকে সম্মান দেয়নি, যা দিয়েছে চেন্নাই’, বলছেন ধোনির বন্ধু