দ্য ওয়াল ব্যুরো: বয়স তাঁর ২৬। কাটা-কাটা চোখমুখের ঝকঝকে তরুণী। বুদ্ধিদীপ্তির ঝিলিক চোখেমুখে। কথা বললে ধরা পড়ে ভাবনার উদারতা, সাহসিকতা, জেদ। তাঁর নাম মাধানিয়া। শ্রীলঙ্কার বাসিন্দা। তাঁর পরিচয়, তিনি জঙ্গির বোন! মাধানিয়ার দাদা জাহরান হাসিমকেই শ্রীলঙ্কা বিস্ফোরণের মূল চক্রী হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। অথচ মাধানিয়া স্পষ্ট স্বরে পুলিশকে বলছেন, ‘‘জাহরান যে আর নেই, এই খবরে আমি খুব খুশি। কারণ ও মানুষ মারার শিক্ষা পাচ্ছিল।"
শুক্রবার শ্রীলঙ্কার আমপারা শহরের জঙ্গিঘাঁটিতে আক্রমণ চালায় শ্রীলঙ্কা সেনা। নিকেশ করে ইস্টার রবিবারের ধারাবাহিক বিস্ফোরণের মূলস চক্রী জাহরান হাসিমের দলবল এবং তার বাবা ও ভাইদের। সূত্রের খবর, মারা গিয়েছে জাহরানের ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী, তাদের দুই শিশু সন্তান, নিখোঁজ এক ভাইয়ের স্ত্রী এবং দুই শিশু সন্তান, এক বোন, বোনের স্বামী এবং তাদের দুই শিশু সন্তান, জাফরানের নিজের দুই সন্তান এবং বাবা-মা। যারা বেঁচে গিয়েছে, তাদের মধ্যে আছে জাহরানের স্ত্রী এবং এক শিশু, এমনটাই জানিয়েছে শ্রীলঙ্কা পুলিশ।
এই অভিযানের পরেই জাহরানের ২৬ বছরের বোন মাধানিয়ার বাড়িতে সাদা পোশাকে হাজির হয় শ্রীলঙ্কা পুলিশ। মাধানিয়া ও তাঁর স্বামী শেরিফ নিয়াসকে তিনি অনুরোধ করেন জাহরান হাসিম এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সনাক্ত করার জন্য। কিন্তু রাজি হনন মাধানিয়া। নিজের স্বামী শেরিফ নিয়াসকে তিনি বলেন, ‘‘ওঁদের ছবি দেখাতে বলো। আমি মৃতদেহের ছবি দেখেই ওদের সনাক্ত করতে পারব। হাসপাতালে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’’ উপস্থিত পুলিশ অফিসার তাঁকে জানান, ওদের দেখার জন্য এটাই শেষ সুযোগ। পরে আর কোনও সুযোগ দেওয়া যাবে না। এর পরে পুলিশের সঙ্গে ভাইয়ের ও পরিবারের অন্যদের দেহ শনাক্ত করতে যেতে রাজি হন মাধানিয়া।
মৃতদেহ শনাক্ত করতে গিয়ে মাধানিয়া পুলিশকে জানিয়েছেন, ছোট থেকেই ইসলামি ধর্মশিক্ষায় প্রবল উৎসাহ ছিল জাহরানের। কোরান পড়ার জন্য স্কুল ছেড়ে দিয়ে আরবি ভাষাশিক্ষাও শুরু করেছিল সে। অন্যান্য ধর্মের প্রতি ছিল তার প্রবল বিদ্বেষ। এমনকী সুফি এবং উদারপন্থী ইসলামকেও শত্রু মনে করত সে। এমনকী জাহরানের সঙ্গে মতের মিল না হওয়ায় পরিবার থেকেও তাঁকে ‘একঘরে’ করে দেওয়া হয়েছিল বলে গোয়েন্দাদের জানিয়েছেন মাধানিয়া।
তিনি বলেন, ‘‘আমি ২০১৭ সাল থেকে জাহরানের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কারণ, ওঁর মানসিকতায়, কথাবার্তায় ঘৃণার বিষ মেশানো থাকতো। ছোটোবেলা থেকেই পাড়ায় রাস্তার মোড়ে ইসলাম নিয়ে ভাল বক্তৃতা করতে পারত জাহরান। কিন্তু ইদানীং কেবল অন্যান্য ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করেছিল। সবই বিদ্বেষের কথা। এই করেই আমাদের পরিবারে সর্বনাশ ডেকে নিয়ে এল জাহরান।’’
মাধানিয়ার দাবি, বেশ কিছু দিন ধরেই তাঁর দাদা নিজের মতো করে ইসলামের ব্যাখ্যা দেওয়া শুরু করেছিল। মাধানিয়ার কথায়, ‘‘জাহরান সব সময় অন্য ধর্মকে আক্রমণ করে কথা বলতো। নরমপন্থী মুসলিম আর সুফিদেরও ছেড়ে কথা বলতো না। সুফিদের বলতো মাদকাসক্ত। ও বিপজ্জনক দিকে যাচ্ছে বুঝতে পেরে আমি আর আমার স্বামী ওর থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।’’ পাশের গলিতেই অন্য একটি বাড়িতে উঠে যান তাঁরা।
জাহরানের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখলেও নিজের বাবা-মায়ের জন্য পুরনো বাড়িতে খাবার পাঠাতেন মাধানিয়া। রাখতেন যোগাযোগও। মাধানিয়া জানান, বৃহস্পতিবার অর্থাৎ ১৮ এপ্রিল হঠাৎ করেই বাড়ির সকলে উধাও হয়ে যায়। শুক্রবারও কেউ বাড়ি ফেরেনি। ফোনও বন্ধ করে রেখেছিল সবাই। তার পরেই রবিবার ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। "আর সেই বিস্ফোরণে জাহরানের কী ভূমিকা ছিল, তা-ও স্পষ্ট হয়ে যায় আমাদের কাছে।’’-- বলেন মাধানিয়া।
মাধানিয়া আরও জানান, ভাইয়ের কার্যকলাপ তিনি কোনও দিনও মেনে নিতে পারেননি। ২০০৬ সালে একটি ইসলামিক স্টাডি সেন্টার তৈরি করে ফেলে জাহরান। কিন্তু এই সব করতে গিয়ে ও আল্লার কাছ থেকে দূরে সরে যায়, কারণ ও ভুল লোকের কাছ থেকে ধর্মশিক্ষা পাচ্ছিল। ভুল শিক্ষা ছড়াচ্ছিলও। "ও আসলে মানুষ মারার শিক্ষা পেয়েছিল।’’-- একই সঙ্গে মাধানিয়া পুলিশকে বলেছেন, ‘‘জাহরান যে আর নেই, এই খবরে আমি খুব খুশি।’
মাধানিয়া আরও জানিয়েছেন, দশ বছর আগে এক বার জাপানে গিয়েছিল জাহরান। ওখানকার তামিল মুসলিমদের ও ধর্মশিক্ষা দিত। তার পরে ওর পাসপোর্ট পুলিশের হেফাজতে চলে যায়।
২০১৭ সালে সুফি মুসলিমদের সঙ্গে একটি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল জাহরান। মাধানিয়ার কথায়, ‘‘নরমপন্থী এবং উদার মুসলিমদের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য ওর উপরে খেপে গিয়েছিল অনেকে। সুফিরা ওকে তাড়িয়ে দেয়, খুব ঝামেলা হয় সেই বার। কিন্তু ওর কিছুতেই শিক্ষা হয়নি। ও কোনও ভাবেই সরেনি হিংসা ও ঘৃণার পথ থেকে।’’
কিন্তু সেই পথে চলতে গিয়ে যে এমন চরম ঘটনা ঘটাবে জাহরান, তা বোধ হয় আন্দাজ করতে পারেননি মাধানিয়াও। ভাবতে পারেননি, অন্য ধর্মের ক্ষতিসাধন করতে গিয়ে নিজেকেও শেষ করে দিতে পিছপা হবে না তাঁর ভাই।