
শেষ আপডেট: 3 December 2019 10:14
আজ মেসি-দিবস বলেই মনে করছে ফুটবল জগত। ষষ্ঠ ব্যালন ডি’ওর জিতে রেকর্ড গড়েছেন তিনি। আরও এক বার নিজেকে প্রমাণ করেছেন ‘ফুটবলের ঈশ্বর’ হিসেবে। উচ্ছ্বাসের পারদ আকাশ ছুঁয়েছে সর্বত্র। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সংবাদমাধ্যম— সকলের সমস্ত আলো আজ তাঁরই দিকে। কিন্তু একটু চোখ সরালেই দেখা যায়, সে আলো মেখে উজ্জ্বল হাসিতে ভরা দৃপ্ত মুখে বসে আছেন আরও এক ‘মে’। তিনি মেগান র্যাপিনো। ব্যালন ডি’ওর মহিলাদের বিভাগে বর্ষসেরা, বিশ্বকাপ জয়ী মার্কিন তারকা ফুটবলার।
পুরস্কারের মঞ্চে উপস্থিত হতে পারেননি মেগান, তাই পাঠিয়েছেন ভিডিওবার্তা। বলেছেন, “মাঠের ভিতরে হোক বা বাইরে, আমি আজ যা করে উঠতে পেরেছি, সে জন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য আমার কোচ, ফেডারেশন ও সহ-খেলোয়াড়দের। আমি এ বছর থাকতে পারলাম না, আগামী বছর নিশ্চয় থাকব।”
সেই মেগানের হাতে উঠল ব্যালন ডি’ওর। এই সাফল্যের উদযাপনে তাঁর কথা আরও একটু বেশি করে জানার দাবি রাখছে ফুটবল জগৎ।
তার পরেও কেন এই বেতন বৈষম্য— তা নিয়ে বহু দিন ধরেই জমছিল ক্ষোভ। সেই ক্ষোভই আদালতে পৌঁছেছিল মেগান ব়্যাপিনোর নেতৃত্বে। চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রাক-বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিতে নিতেই প্রাতিষ্ঠানিক লিঙ্গবৈষম্যের অভিযোগে আমেরিকান ফুটবল ফেডারেশনের বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা। ফুটবলপ্রেমীদের অনেকেই বিরক্ত হয়েছিল। দু’দিন পরে ফুটবল-যুদ্ধ, তার আগে মামলা কেন! কিন্তু মেগান সেই কবে থেকেই একরেখা, জেদি মেয়ে হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে। সামান্য ভ্রূকুটি তাঁর লড়াইকে থামাতে পারে নাকি!
তবু আক্রমণ করতে ছাড়েননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। মেগানের প্রতিবাদের কারণ বা দাবি জানতে না চেয়ে ব্যঙ্গের সুরে বলেছিলেন, ‘‘এর মধ্যে প্রতিবাদ কোথায়!’’ এই সময়েই মেগানের একটা পুরনো সাক্ষাৎকার সামনে চলে আসে। সেখানে মেগান বলেছিলেন, ‘‘আমি কাপ জিতলেও হোয়াইট হাউসে যাব না।’’ ট্রাম্পের ব্যঙ্গের উত্তরে সেই একই কথা ফের বললেন মার্চেও। কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছে তখন মেগানের দল। মেগান বললেন, জিতলেও যাবেন না ট্রাম্পের কাছে। এই বলে মাঠে নেমে নিজেই গোল করলেন দুটো। যদিও তখনও ৭৩ বছরের ট্রাম্প তখনও ৩৪-এর মেগানকে বিঁধে রীতিমতো হুঁশিয়ারি দিয়েছেন— ‘‘আগে তো জিতুন!’’
হ্যাঁ, মেগান সমকামী। এবং তাঁর সপাট যুক্তি, ফুটবল স্টেডিয়াম শুধু খেলারই জায়গা নয়, একটা বড় প্ল্যাটফর্মও বটে। সেখানে পৌঁছেও তিনি যদি তাঁর আদর্শ বা লড়াইকে তুলে না ধরেন, শুধু খেলে চলে আসেন, শুধু জেতা-হারা নিয়েই মাথা ঘামান, তা হলে সেটা তাঁর মতো আরও হাজার লড়াকু মেয়ের প্রতি অবিচার হবে। অবিচার হবে আগামী প্রজন্মের প্রতি।
গত বছরে বিখ্যাত স্পোর্টস জার্নাল ইএসপিএন-এর ‘দ্য বডি ইস্যু’র কভারে জ্বলজ্বল করেছে মেগান এবং সু-এর নগ্ন দেহ। হাতে-পায়ে ফুটবল, মুখে হাসির দীপ্তি। সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় স্পর্শ করতে পারেনি সে দীপ্তি।
২০১১ সালের বিশ্বকাপে প্রাণপণ লড়েও ফস্কে যায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ। ২০১২ অলিম্পিক্সে আসে সোনা। সেই সঙ্গে, ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে কানাডার বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে কর্নার থেকে সরাসরি গোল করেন মেগান। অলিম্পিক্সের আসরে পুরুষ ও মহিলা মিলিয়ে এই নজির রয়েছে একমাত্র তাঁরই। তবে বিশ্বকাপ না জেতার আফশোসও মেগান সুদে-আসলে উসুল করে নিয়েছেন ২০১৫ এবং ২০১৯ বিশ্বকাপ জিতে।
তবে সে সব ছাপিয়ে ফের আওয়াজ তোলেন সমবেতনের দাবিতে। বিশ্বকাপের মঞ্চে সে সুর বেমানান ঠেকলেও পাত্তা দেননি মেগান। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। মেগান তাঁর সামনেই সটান বলে দেন, তাঁদের সমবেতনের দাবি ন্যায্য। ফিফা পারবে না এই দাবি নস্যাৎ করতে। মেগানের কণ্ঠস্বরে যেন বজ্রের দৃঢ়তা ফুটে উঠেছিল সেই দিন।
তাই সোনার বুট, সোনার বল, বিশ্বকাপ, ব্যালন ডি’ওর— হাজার ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জন করার পরেও মেগানের পাখির চোখ আজও সমবেতনের দাবি এবং মাঠের বাইরে তাঁর লড়াইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী লিঙ্গবৈষম্য।