দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থেকে করো শিল্পের বড়াই, আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকার পরে’…কান্তকবি রজনীকান্ত সেন ঠিকই বলেছিলেন। অট্টালিকায় মহাসুখে থাকা শুধু নয়, বেশ বিলাসের সঙ্গেই বাঁচে ছোট্ট চড়াইরা। এদের বাসা বাঁধার তাড়াহুড়ো নেই। ছটফটে, খামখেয়ালী জীবন। ছোট্ট দুটি ডানা ভাসিয়ে নীল আকাশের বুক চিরে উড়ে যাওয়াতেই আনন্দ। গতানুগতিকতা বিশেষ পছন্দ নয়। একঘেয়েমি তো একেবারেই নয়। সেটা জীবনধারাতেও আবার গানেও। হ্যাঁ, গান। চড়াই সমাজে এই গানের একটা মহিমা আছে। কোকিলের মতো সুরেলা কণ্ঠে সেরা গীতিকারের পরিচয় দেয় না এরা, তবে চড়াইয়ের গানেই লুকিয়ে থাকে তাদের মনের ভাব প্রকাশের ভাষা। প্রেম নিবেদনের কৌশল। এই গানেই লুকিয়ে এক আজব রহস্য। যার সন্ধান পেতে গত ১৪ বছর ধরে হিমশিম খেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। চড়াইয়ের এই গানই এখন বিজ্ঞানের জগতের এক নতুন খোঁজ।
পুরনো বাতিল, নতুন সুরে গান বাঁধছে চড়াইরা, বদলে যাচ্ছে সুর
চড়াইরাও যে গান গায় এবং তাতে সুর, তাল, লয়, ছন্দ আছে সেটা বুঝেই চমকে গেছেন বিজ্ঞানীরা। সব চড়াই নয়। খয়েরি রঙা গলায় সাদা ছোপ যে
চড়াইরা (Zonotrichia albicolis) আমাদের পরিচিত তারাই এমন সুরে গান গায়। চড়াই সমাজের হোমড়াচোমড়া
[caption id="attachment_237961" align="alignleft" width="255"]
ডক্টর কেন এ ওট্টার[/caption]
গোছের যে পাণ্ডা সেই আগে গান বাঁধে। সেই সুরই শিখে নেয় বাকিরা। বাচ্চাদেরও শেখানো হয় রীতিমতো ক্লাস করে। একই গান মুখে মুখে থুড়ি ঠোঁটে ঠোঁটে ছড়িয়ে পড়ে গোটা চড়াই সমাজেই। একই গান গায় সবাই। একই সুর, একই ছন্দ। সুর বদলালে চলবে না। মাইলের পর মাইল এলাকা জুড়ে সব চড়াইয়ের গলায় সেই একই গান শোনা যায়। চড়াই বংশের এটাই হল রীতি।
এবার আসা যাক চমকের কথায়। গবেষকরা দেখেছেন, প্রায় দু’দশক ধরে এই একই গান গাইছিল চড়াইরা। খুব সম্প্রতি তারা সুর বদলে ফেলেছে। গানও বদলে ফেলেছে। পরিবর্তনের ছোঁয়া দেখা গেছে চড়াই সমাজে। আর এই বদলটা হয়েছে মূলত কানাডাতে। ব্রিটিশ কলম্বিয়া থেকে ওন্টারিও অবধি ৩,৩০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে চড়াইরা এক অদ্ভুত সুরে গান শুরু করেছে। সকলের গলায় একই সুর। গানের কথা যদি বৈজ্ঞানিক উপায় অ্যাম্পলিফাই করা যায় তাহলে দেখা যাবে শেষ তিনটে নোট বার বার গাইছে চড়াইরা। প্রায় ১৭৮৫টি পুরুষ চড়াই গলা ছেড়ে এই নতুন সুরে গান গাইতে শুরু করেছে।

চড়াই নিয়ে এই গবেষণা গত ১৪ বছর ধরেই করছিলেন ইউনিভার্সিটি অব নর্দার্ন ব্রিটিশ কলম্বিয়ার কেন ও ওট্টার, আলেক্সান্দ্রা ম্যাকেন্না, স্টেফানি লাজার্তে এবং ওয়াটারলুর ওয়াইলফ্রিড লরিয়ার ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী স্কট এম র্যামসে। ‘কারেন্ট বায়োলজি’ (Current Biology) সায়েন্স জার্নালে এই গবেষণার রিপোর্ট সামনে এনেছেন বিজ্ঞানীরা। কেন ওট্টার বলেছেন, কানাডা শুধু নয়, নতুন গানে চড়াইদের যা উৎসাহ দেখা গেছে তাতে মনে করা হচ্ছে আরও কয়েকটি রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এই গান। এমনকি ভিন দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
আগে শিস দিত, এখন গান বাঁধে
গবেষক কেন ওট্টারের কথায়, সেই ১৯৬০ সালের গবেষণায় দেখা গিয়েছিল শিস দিয়েই মনের ভাব জানাত চড়াইরা। ১৯৬০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে চড়াই বংশে গায়কদের জন্ম হয়। আসলে পুরুষরাই গান গায় বেশি। স্ত্রী চড়াইরা বেশিরভাগই শ্রোতা। পাহাড়ি এলাকার পুরুষদের মধ্যে এই গান বাঁধার প্রবণতা বেশি ছিল। পাহাড়িয়া গান গেয়েই তারা মনের ভাব জানাত। ২০০৪ সালে আলবার্টার কাছে একদল পুরুষ চড়াইকে একটু অন্য সুরে গান গাইতে শোনা গিয়েছিল। যদিও সেই গানের ছন্দ পুরনো গানের মতোই ছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পুরনো গানের সুর ছিল ট্রিপলেট-নোটে। শেষ শব্দগুলো তিন বার করে গাইত চড়াইরা। নতুন গান ডাবলেট-নোটের। অর্থাৎ শেষ শব্দগুলো দুবার করে গাইছে চড়াইরা। ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল অবধি ২২% থেকে ৫০% চড়াই এই নতুন গান শিখতে শুরু করেছিল। আর এখন গোটা চড়াই সমাজই এই গান শিখে নিয়েছে। পুরনো গান বাতিলের তালিকায় চলে গেছে।
প্রেম জেগেছে চড়াই মনে! তাই কি নতুন গান!
কেন গান বদলাচ্ছে চড়াইরা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পিছনে রয়েছে রোমান্টিক চড়াই মন। ওই যে একঘেয়েমি পছন্দ নয় চড়াইদের। তারা নতুনের স্বাদ চায়। কেন ওট্টার বলেছেন, পুরুষ চড়াইরা গান গেয়ে স্ত্রীদের মনে প্রেম জাগিয়ে তোলে। গানই তাদের ভাব প্রকাশের মাধ্যম। হতেই পারে স্ত্রী চড়াইদের টেস্ট বদলেছে। তারাও আধুনিক গান পছন্দ করছে। তাই পুরুষরা ফের নতুন করে গান বেঁধেছে। হাজারের বেশি পুরুষ চড়াই এই নতুন গান শিখে নিয়েছে। এবার এই গানের সুর ছড়িয়ে পড়ছে চতুর্দিকে। পরিবেশ দূষণ, মোবাইল টাওয়ারের বাড়াবাড়ি, রেডিও তরঙ্গ, জলবায়ুর বদলের রেশ বাঁচিয়ে যদি চড়াইরা বেঁচেবর্তে থাকে তাহলে আগামী পৃথিবী হয়তো কোরাসে চড়াইদের নতুন গান গাইতে শুনবে।