তিয়াষ মুখোপাধ্যায়
কোভিডের ঝড় তখন বেশ তুমুলভাবেই আছড়ে পড়েছে শহরে। দিকে দিকে সতর্কতার চূড়ান্ত। আমাদের অর্থাৎ দ্য ওয়ালের অফিস বন্ধ। ওয়ার্ক ফ্রম হোম চলছে পুরোদমে। এমনই সময়ে এসেছিল প্রতীক্ষিত দিনটি। দ্য ওয়ালের ডিজিটাল সাহিত্যপত্রিকা 'সুখপাঠ'-এর আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান। জুলাই মাসের চার তারিখ। বহুদিনের আয়োজন ও পরিকল্পনার পরে এই অনুষ্ঠান। আগে থেকেই কথা ছিল, প্রধান অতিথি হিসেবে আসবেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (soumitra chattopadhyay)। কিন্তু এই কোভিড পরিস্থিতিতে...
কিন্তু আগে থেকে দেওয়া 'কথা'র খাতিরেই এলেন সৌমিত্রবাবু। আর তাঁকে বাড়ি থেকে রিসিভ করে অনুষ্ঠানে নিয়ে আসা ও অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরানোর দায়িত্ব পেলাম এই আমি। আনন্দে শিহরিত হলেও, একে ঠিক স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো অনুভূতি বলব না। কারণ পেশার সূত্রেই বিখ্যাত মানুষদের সামনে থেকে দেখা বা সময় কাটানোর সুযোগ আলাদা করে খুব যে চমকে দেয়, তা নয়। তবে কারও কারও সংক্ষিপ্ত সাহচর্য বা সংস্পর্শ যে উল্টোদিকের মানুষটির অসামান্য সম্পদ হয়ে ওঠে জীবনের, সে কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।
বেঁচে থাকাটাই ‘সুবিবেচনার’ কাজ বলে মনে হয়েছিল সৌমিত্রদার
"বৃষ্টি পড়লে এই শহরটাও কেমন স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে, না?" প্রাথমিক আলাপপর্ব শেষ করে, গল্ফগ্রিনের বাড়ি থেকে গাড়িতে উঠেই প্রথম বাক্য বলেছিলেন সৌমিত্রবাবু। আমিও উত্তর দিয়েছিলাম ছোট করেই। তার পর আমার দায়িত্ব ছিল, অনুষ্ঠান সম্পর্কে ওঁকে ছোট করে জানানোর। তাই করলাম। সব শুনে বললেন, "বাহ্! তবে আমি কী করে পড়ব?" বললাম, "খুব সহজ তো, আপনি একটা স্মার্টফোনেই পড়তে পারবেন।"
যখন কথা বলছিলেন না, আড়চোখে দেখছিলাম গাড়ির অপর প্রান্তে। সৌমিত্রবাবু বসে আছেন, জানলার ওপরের হ্যান্ডেলটা হাতে ধরে। চোখ বাইরের দিকে। 'স্নিগ্ধ' শহরে চোখ রেখেছে বিস্মিত অপু! সত্যিই সেই মুগ্ধ করা অপু বসে রয়েছেন মাত্র কয়েক হাত দূরে? বসে রয়েছেন উদয়ন পণ্ডিত? বসে রয়েছেন ক্ষিদ্দা?
বিশ্বাস করতে না পারার মতো নয়, তবে বিস্ময়াভিভূত হওয়ার মতো তো বটেই। সেই সঙ্গেই মনে ছিল, মানুষটি অসুস্থ। অশক্ত। যদিও পেশাদারিত্ব সে কথা জানতে দেয় না। তবু মাঝে মাঝেই চালককে মৃদু অনুরোধ করছিলাম, রাস্তার খানা-খোন্দল একটু সামলে চালাতে। "ও আর গাড়ির কী দোষ। বর্ষার রাস্তায় তো একটু ঝাঁকুনি হবেই।" বলেছিলেন সৌমিত্রবাবু। মুখে সেই সারল্যমাখা হাসির রেশ।
দু-এক কথার পরেই এসে গেছিল ৬ বালিগঞ্জ প্লেস, আমাদের অনুষ্ঠানস্থল। গাড়ি থেকে নেমে, নিয়মমতো হাত স্যানিটাইজ করে, প্লাস্টিক পায়ে গলিয়ে সভাগৃহে ঢুকলেন তিনি। বসলেন নির্দিষ্ট আসনে। সকলের সঙ্গে আলাপ ও কুশল বিনিময় করলেন হাসিমুখে। চা-কফি খেতে চাইলেন না, বদলে কেবল একটু জল।
অনুষ্ঠান শুরু হল নির্ধারিত সময়ে। অতিথি হিসেবে এসেছিলেন চন্দ্রিল ভট্টাচার্য ও অনির্বাণ ভট্টাচার্য। তবে একথা বলার অপেক্ষা রাখে না, ওই দিনের মধ্যমণি ছিলেন সৌমিত্রবাবুই। হবে না কেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নামটুকুই তো এখনও যথেষ্ট বাংলা সংস্কৃতির প্রাঙ্গণে। বাঙালির শিল্পচর্চার এক আয়কনিক অবয়ব তিনি।
প্রবীণ মানুষটিকে তাই সেদিন যেন ঘিরে রেখেছিলেন বাকি সকলে। কিছু সেলফি, অটোগ্রাফের দাবি ছিল বটে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল ওঁর পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিতে চাওয়ার আবদার। সেদিন সৌমিত্রবাবু অনুষ্ঠানে জানান, এই ডিজিটাল মাধ্যমে তিনি নিজে খুব স্বচ্ছন্দ না হলেও, এই মাধ্যম যে কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ নয় তা তিনি দিব্যি বুঝতে পারেন।
সৌমিত্রবাবু বলেছিলেন, "আমি নিজে এসব বুঝি না বেশি। কিন্তু আমার পরবর্তী প্রজন্মকে দূর থেকে দেখে যেটা বুঝি, এইটে এখনকার সময়ের 'বাণীরূপ'। এইটে থাকতে এসেছে, চলে যাওয়ার নয়। এই সময়ে পূর্ণাঙ্গ একটা ডিজিটাল সাহিত্যপত্রিকা হচ্ছে বাংলায়, এটাই আমাদের কাছে আনন্দের। আমি একে স্বাগত জানাচ্ছি।"
এখানেই শেষ নয়। তাঁর কাছে আবৃত্তি শোনার অনুরোধ করা হলে, জীবনানন্দ দাশের 'বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি' কবিতাও সেদিন আবৃত্তি করে শোনান সৌমিত্রবাবু। সেই গাম্ভীর্য, স্পষ্ট উচ্চারণ, সংযত আবেগ প্রতিবারের মতোই মুগ্ধ করেছিল আমাদের। সেইসঙ্গে অবাক হয়ে ভাবছিলাম, কী অবিশ্বাস্য স্মৃতিশক্তি এই বয়সেও!
মাইক্রোফোন বেয়ে যখন ভেসে আসছিল, "মধুকর ডিঙা থেকে না জানি সে কবে চাঁদ চম্পার কাছে, এমনই হিজল-বট-তমালের নীল ছায়া বাংলার অপরূপ রূপ..." মনের আয়নায় যেন ফুটে উঠেছিল রূপসী গ্রাম বাংলার এক অপূর্ব বিষণ্ণ ছবি।
সুখপাঠের অনুষ্ঠানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে 'রূপসী বাংলা'।
https://youtu.be/AH3N5Dzzgfg
বর্ষার দুপুরে এ যেন এক অনন্য প্রাপ্তি হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের কাছে। অনুষ্ঠানের শেষে সামান্য মধ্যাহ্নভোজও করেন তিনি। খাঁটি বাঙালি খাবার ছিল পাতে। নিজের বিধি, অনুশাসন এবং পছন্দের পদ-- এই তিন মিলিয়েই তৃপ্তি করে সেরেছিলেন খাওয়া।
এর পরে ফেরার পালা। তখনও বৃষ্টি পড়ছে বেশ। ছাতা ধরে ওঁকে তোলা হল গাড়িতে। সঙ্গে গেলাম সঙ্গী হয়ে। জিজ্ঞেস করলাম পথে, "সুখপাঠ ভাল হবে তো, স্যার?" উত্তর দিয়েছিলেন, "সারাদিন তোমাদের হাতে ফোন, এতেই তোমরা পড়বে এখন এসব। ভালই হবে। আমরা মনে হয় আর পারব না।"
সত্যিই কি না-পারার দেশে চলে গেলেন সৌমিত্রবাবু? নাকি দেড়মাসের এই লড়াই শেষে আসলে সবটাই পারা হল তাঁর? এ প্রশ্ন রয়ে যাবে মনে। আর রয়ে যাবে স্মৃতির সম্পদ। রয়ে যাবে আজীবন সঞ্চয় করে রাখার মতো আশীর্বাদটুকু, 'স্নিগ্ধ' শহরের দুপুরে পাওয়া সাহচর্যটুকু।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'