
শেষ আপডেট: 10 August 2022 11:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিহারে নীতীশ (Nitish) কুমারের সরকারকে সমর্থন করছে কংগ্রেস। তারা মন্ত্রিসভাতেও থাকবে। পাটনার রাজনৈতিক মহলের খবর, গত আড়াই মাস যাবৎ বিহারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কখনও ফোনে, কখনও কংগ্রেসের কোনও নেতা মারফৎ সনিয়া (Sonia) গান্ধীকে জানিয়ে রেখেছেন নীতীশ কুমার। সূত্রের খবর, এই আলোচনাতেই সনিয়া বিহারের (Bihar) মুখ্যমন্ত্রীকে অধুনা প্রায় লুন্ত ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স বা ইউপিএ-কে (UPA) আগে চেহারায় ফেরানোর (again on form) দায়িত্ব নীতীশকে নিতে বলেছেন। তাঁকে আপাতত সমন্বয়কারীর ভূমিকা নিতে বলেছেন সনিয়া। জানা যাচ্ছে, নীতীশও না বলেনননি। নতুন সরকার গঠনের পর দিল্লি সফরে মুখোমুখি সনিয়ার সঙ্গে তাঁর বৈঠক করার কথা।
খাতায় কলমে ইউপিএ-র চেয়ারপারসন হলেন সনিয়া গান্ধী। আগামী মাস কয়েকের মধ্যে কংগ্রেসের সাংগঠনিক নির্বাচনের পর দলের সভাপতির পদ থেকে সরে যাবেন সনিয়া। তাঁর জায়গায় ফের সভাপতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি রাহুল গান্ধীর।
অ-বিজেপি, অ-কংগ্রেসি দলগুলি তো বটেই, কংগ্রেসের অন্দরেও কেউ কেউ মনে করেন, বিরোধীদের একজোট করতে হলে ইউপিএ-র চেয়ারপার্সনের পদটি শরিক দলের কাউকে দেওয়া হোক। অতীতে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে সরকারে থাকলেও তারা ইউপিএ-র শরিক ছিল না। ছিল সমর্থক। মাস কয়েক ধরেই চর্চা চলছিল, একদা ইউপিএ শরিক এনসিপি-র নেতা শরদ পাওয়ারকে চেয়ারম্যান করা হোক।
এখন কংগ্রেসের একাংশ মনে করছে, নীতীশ কুমারকে আপাতত সমন্বয়কারীর দায়িত্ব দিয়ে ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের আগে তাঁকে ইউপিএ-র চেয়ারপার্সন করা হবে। পরের লোকসভা ভোটে নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে নীতীশকেই বিরোধী শিবিরের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী করার ভাবনাচিন্তা শুরু হয়ে গিয়েছে। স্বচ্ছ ভাবমূর্তির মানুষ নীতীশের দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি অভিযোগ তেমন একটা নেই।
গত বছর ডিসেম্বরে মুম্বই শফরে গিয়ে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী জোটের মুখ হিসাবে শরদ পাওয়ারের কথা বলার পাশাপাশি সাফ বলেন, ইউপিএ-র এখন আর অস্তিত্ব নেই।
প্রসঙ্গত, ২০০৪-এর লোকসভা ভোটের পর যাত্রা শুরুর কালে ইউপিএ-র শরিক হন ১৪টি দল। গত ১৮ বছরে একে একে ছেড়ে গিয়েছে প্রায় সব শরিক। ইউপিএ বা ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ অ্যালায়েন্সে এখন বলতে গেলে আছে শুধু কংগ্রেস আর এক-দুটো ছোট আঞ্চলিক দল। গতকাল মঙ্গলবার তাতে যোগ হল জনতাদল ইউনাইটেড। যদিও বিহারের জোটের নাম মহাগঠবন্ধন। তাতে বাম দলগুলি আছে, যারা ইউপিএ-র শরিক ছিল না। তবে প্রথম ইউপিএ সরকারের সমর্থক ছিল। কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতারাও একান্তে মানছেন, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভুল বলেননি যে, ইউপিএ-র কোনও অস্তিত্ব নেই।
কংগ্রেস সূত্রে জানা যাচ্ছে, বিজেপিকে আটকানোর লক্ষ্যে তৈরি ওই জোট এতটাই অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে যে স্মরণকালের মধ্যে জোটের চেয়ারপার্সন সনিয়া গান্ধী ইউপিএ-র বৈঠক ডাকেননি। ১৪ দলের মধ্যে সাকুল্যে চারটি দলও জোটে নেই। শরিকদের পাশাপাশি ছেড়ে গিয়েছে ইউপিএ-র সমর্থক দলগুলিও। তবে বিজেপি বিরোধী অবস্থানে সংসদে কংগ্রেসের পাশে আছে অনেক অবিজেপি দল। তবে ইউপিএ-র নেতৃত্ব কংগ্রেসের হাতে থাকার বিরোধী অনেক দলই। লোকসভা ভোটের আগে সেই পদে নীতীশ কুমারকে দিলে নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধের পরিসমাপ্তি ঘটবে বলে মনে করা হচ্ছে।
কংগ্রেস ছাড়া ইউপিএ-র বাকি শরিকেরা ছিল আরজেডি, ডিএমকে, এনসিপি, পিএমকে, টিআরএস, জেএমএম, এলজেপি, এমডিএমকে, এআইএমআইএম, পিডিপি, আইইউএমএল, আরপিআই (এ), আরপিআই (জি) এবং কেসি (জে)। জোট গঠনে প্রধান ভূমিকা নিলেও সুরজিতের পার্টি সিপিএম এবং সিপিআই, আরএসপি ও ফরওয়ার্ড ব্লক ইউপিএ-তে যোগ দেয়নি। ন্যূনতম অভিন্ন কর্মসূচির রূপায়নের শর্তে ইউপিএ-কে বাইরে থেকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেয় চার বাম দল।
কিন্তু দু’বছরের মাথায় মন্ত্রিসভা এবং ইউপিএ ছেড়ে যায় তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি। ন্যূনতম অভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে বিরোধের জেরে তার পরের বছর অর্থাৎ ২০০৭-এ ইউপিএ ত্যাগ করে দক্ষিণের আর এক দল ভাইকোর এমডিএমকে। ২০০৮-এর মাঝামাঝি আমেরিকার সঙ্গে পরমাণু চুক্তি সই ঘিরে বামেদের সঙ্গে মনমোহন সরকারের বিরোধ চরমে ওঠে। ইউপিএ-র উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয় বামেরা। কিন্তু সংখ্যালঘু সরকারকে লোকসভায় বাঁচিয়ে দেয় মুলায়ম সিং যাদবের সমাজবাদী পার্টি।
পরের বছর অর্থাৎ ২০০৯-এ পর পর ইউপিএ ছেড়ে যায় কাশ্মীরের পিডিপি এবং তামিলনাডুর পিএমকে। দুই দলই নিজের নিজের রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের অঙ্কে কংগ্রেসের সঙ্গ ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
বামেদের সঙ্গে কংগ্রেসের বিরোধ এবং চার বামদল ইউপিএ-র উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের পর থেকেই বঙ্গ রাজনীতির চাকাও দ্রুত ভিন্ন দিকে মোড় নিতে শুরু করে। কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূলের বোঝাপড়া তৈরি হয়। ২০০৯-এর লোকসভা নির্বাচনে দুই দল এক জোট হয়ে বাংলায় বামেদের জোর ধাক্কা দেয়। তারপর একের পর এক পুরভোট এবং ২০১১-র পরিবর্তনে বিধানসভা নির্বাচন দুই কংগ্রেস হাতে হাত রেখে লড়াই করে সিপিএমকে ক্ষমতাচ্যুত করে। কিন্তু দুই কংগ্রেসের রাজনৈতিক ভাব-ভালবাসা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
২০০৯-এ ইউপিএ-টু মন্ত্রিসভায় রেলমন্ত্রী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দু’বছরের মাথায় তিনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নানা বিষয়ে নিজের মতামত চাপিয়ে দিতে থাকেন বলে কংগ্রেসের অভিযোগ। তার মধ্যে অন্যতম হল, রেলের যাত্রী ভাড়া বাড়াতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত। তাঁকে অন্ধকারে রেখে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করায় দীনেশ ত্রিবেদীকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে নেন মমতা।
এরই মধ্যে, ২০১০-এ সংসদে মহিলা সংরক্ষণ বিলের বিরোধিতার প্রশ্নে ইউপিএ ত্যাগ করে লালুপ্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল। ওদিকে, শ্রীলঙ্কায় বসবাসকারী তামিলদের মানবাধিকার হরণের ঘটনায় ভারত সরকার নীরব বলে অভিযোগ তুলে ২০১২-তে ইউপিএ ছেড়ে যায় ডিএমকে। যদিও ততদিনে ডিএমকের মন্ত্রী এ রাজার বিরুদ্ধে টেলিকম কেলেঙ্কারির অভিযোগ ঘিরে মনমোহন সরকার জেরবার হতে শুরু করে। ওই বছরর শেষপ্রান্তে নানা প্রশ্নে বিরোধের কারণে কংগ্রেসের সঙ্গে বোঝাপড়ায় ইতি টেনে দেয় তৃণমূল কংগ্রেসও। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল আপত্তি ছিল খুচরো ব্যবসায় বহুজাতিক সংস্থাকে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত। একই ইস্যুতে ইউপিএ ছাড়ে ঝাড়খণ্ডের জেভিএম-পি পার্টি এবং এআইএমআইএম।
২০০৪-এর লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস পেয়েছিল ১৪৫টি আসন, বিজেপির থেকে মাত্র সাতটি বেশি। ১৪ শরিকের প্রথম ইউপিএ সরকারের কাজকর্মের সুবাদে কংগ্রেস ২০০৯-এর লোকসভা ভোটে দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় ফেরে। আসন পায় ২০৬টি। কিন্তু একের পর এক শরিক ইউপিএ ছেড়ে যাওয়ায় ২০১৪-র লোকসভা ভোটে সনিয়া গান্ধীর পার্টির জোটে মাত্র ৪৪টি আসন, কম প্রাপ্তির নিরিখে কংগ্রেসের জন্য তা এখনও রেকর্ড।