দ্য ওয়াল ব্যুরো: সারাবিশ্বে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ রুখতে সোশ্যাল ডিসট্যান্সিংয়ের নিদান জারি হয়েছে। লকডাউন হয়ে গেছে একের পর এক দেশ। কিন্তু বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী জনপদে অর্থাৎ বাংলাদেশের কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে দৃশ্যটা একেবারেই শোচনীয়। সামাজিক দূরত্ব কী জিনিস, তা এই শিবির দেখলে ভুলে যেতে হয়। গাদাগাদি করে বাস করছেন দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। করোনাভাইরাস পরীক্ষা করার কোনও ব্যবস্থাও নেই তাঁদের। অপার উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন তাঁরা।

'সেভ দ্য চিলড্রেন' নামের একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার ওয়েবসাইটে বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উল্লেখ করে সতর্ক করা হয়েছে গোটা বাংলাদেশকে ও অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ যেহেতু অতি দ্রুত হারে বাড়ছে আর শরণার্থী শিবিরগুলো যেমন ঘনবসতিপূর্ণ, তাতে রোহিঙ্গাদের নিয়ে তথা গোটা বাংলাদেশ নিয়ে শঙ্কিত হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

যদিও কক্সবাজারের সিভিল সার্জন চিকিৎসক মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, গোটা শিবিরে এখনও কোনও রোহিঙ্গার শরীরে কোনও উপসর্গ দেখা দেয়নি। যদি কোনও রোহিঙ্গার মধ্যে করোনাভাইরাসের উপসর্গ দেখা যা, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তাঁর লালারস সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানোর কথা ভেবে রেখেছেন তাঁরা।

শুধু তাই নয়, তাঁর দাবি, রোহিঙ্গাদের কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে বা উপসর্গ দেখা দিলে তাঁদের আলাদা করে রাখার জন্য শরণার্থী শিবিরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতেই প্রায় ৫০টি কোয়ারেন্টাইন শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে। ‘আইসোলেশান ইউনিট’ হিসেবে আরও ১৫০ শয্যা তৈরির কাজ চলছে বলেও জানান শিবির কর্তৃপক্ষ। শিবিরের প্রতিটি রোহিঙ্গা সদস্যই চিকিৎসকদের অতি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

তার পরেও কোনও রকম সংক্রমণ ঠেকাতে বিদেশি কোনও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে বা কোনও ব্যক্তিকে এখন রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। নতুন কোনও রোহিঙ্গাকেও আনা হচ্ছে না শিবিরে। এই শিবিরে চিকিৎসা বা খাদ্যের মতো অতি-জরুরি মানবিক কাজে যাঁরা আগে থেকেই যুক্ত, বর্তমানে শুধু তাঁরাই শরণার্থী শিবিরে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন শিবির কর্তৃপক্ষ।

এমনকি শিবিরের ভিতরে যে স্কুলগুলি চলত, সেগুলিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে মসজিদে গিয়ে গণ-নামাজ পাঠ। করোনাভাইরাস সম্পর্কে রোহিঙ্গাদের বিশেষ করে সচেতন করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনাগুলো বর্মা ও ইংরেজি ভাষায় লিফলেট প্রকাশ করে বিলি করা হচ্ছে। নিয়মিত হাত ধোয়া থেকে জটলা না করা-- সবকিছুই ভাল করে বোঝানো হচ্ছে তাঁদের। নিয়মিত স্প্রে করা হচ্ছে স্যানিটাইজার।

এত বড় রোহিঙ্গা শিবিরে যেসব চিকিৎসক, নার্স, স্বেচ্ছাসেবক রয়েছেন, তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পার্সোনাল প্রোটেকশান ইক্যুইপমেন্ট (পিপিই) সরবরাহের জন্যও সরকারকে জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ শিবির কর্তৃপক্ষের চেষ্টায় বা ব্যবস্থাপনায় কোনও ত্রুটি নেই। কিন্তু সবকিছুর পরেও একসঙ্গে কয়েক লক্ষ মানুষের বাস করার বিষয়টি এড়ানো সম্ভব নয়। তাই যতই বাইরে থেকে কারও আসা বন্ধ করা হোক, শিবিরের ভিতরে কোনও ভাবে যদি একবার কেউ সংক্রামিত হয়ে পড়েন, তবে বাকিদের রক্ষা করা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

একটি সূত্র আবার দাবি করছে, মায়ানমারের সঙ্গে করোনাভাইরাসের জন্মস্থান চিনের সীমান্ত রয়েছে। বহু রোহিঙ্গাই চোরাপথে মায়ানমার-চিন আসা যাওয়া করেন। তাঁদেরই কেউ আবার বাংলাদেশের শিবিরেও এসে পৌঁছতে পারেন। যদিও গত কয়েক দিন ধরে শিবিরে কোনও রোহিঙ্গাকে আসতে দেওয়া হচ্ছে না, তবু কয়েক সপ্তাহ আগে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে কেউ সংক্রামিত থেকে গেছেন কিনা, সে ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

ইতিমধ্যেই সারা বিশ্বে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা পেরিয়েছে দশ লক্ষ। মারা গেছেন ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ। হু হু করে বাড়ছে সংক্রমণ। একবার যেখানে একটি মানুষের সংক্রমণ ঘটছে, তা থেকে ছড়িয়ে পড়তে একটুও সময় লাগছে না। গোটা এলাকা উজাড় হয়ে যাচ্ছে দফায় দফায়। কোনও প্রতিষেধকও আবিষ্কার হয়নি। এমন অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব বজায় রাখাই এক ও একমাত্র উপায়। সেখানে ঘনজনবসতিপূর্ণ রোহিঙ্গা শিবিরের নিরাপত্তা সারা বিশ্বের প্রশ্নের মুখে।