দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২৮ বছর আগে খুন হয়েছিলেন কেরলের কোট্টায়ামের এক কনভেন্টের সন্ন্যাসিনী সিস্টার অভয়া। তাঁকে খুনের অপরাধে গতকালই ফাদার টমাস কোট্টুর ও মাদার সেফিকে যাবজ্জীবন জেলের সাজা ঘোষণা করেছে সিবিআইয়ের বিশেষ আদালত। কিন্তু এত বছর পরে এই খুনের কিনারা করার পিছনে যে মানুষটি রয়ে গেছেন, তিনি হলেন রাজু। পেশায় এক জন চোর। অভয়াকে খুনের দিন চুরি করতেই চার্চে ঢুকেছিলেন তিনি, আর সেটাই ঘুরিয়ে দিল এই মামলাকে। ২৮ বছর পরে হলেও বিচার পেলেন সিস্টার অভয়া।
১৯৯২ সালের ২৭ মার্চ। গভীর রাতে কেরলের কোট্টায়ামের সেন্ট পায়াস কনভেন্টের পাঁচিল টপকে নিঃশব্দে ভিতরে ঢুকেছিলেন রাজু ওরফে আদাক্কা। তিনি দেখেন, অত রাতে দুই সন্দেহভাজন ব্যক্তি ঘুরছেন কনভেন্ট চত্বরে। তাদেরই একজনকে পরে ফাদার টমাস কোট্টুর বলে চিহ্নিত করেন এই রাজুই।
কিন্তু আদালতে মামলা শুরু হওয়ার পরে রাজুর খোঁজ পাওয়া গেলেও, তাঁকে সাক্ষী হিসেবে সামনে আনা হলেও, প্রতিপক্ষের তরফে প্রশ্ন তোলা হয়, একজন চোরের জবানি আদৌ কতটা বিশ্বাসযোগ্য। আদালতের দরবারেও তা গৃহীত হয় না। মামলাও এগোয় না আর বেশি দূর।
কিন্তু ২৮ বছর পরে খেলা ঘুরে গেল। অভয়া হত্যা মামলার কৃতীয় সাক্ষী হিসেবে রাজুর জবানবন্দিকেই গুরুত্ব দিল সিবিআইয়ের বিশেষ আদালত।
রাজু আদালতে জানান, তিনি ওই রাতে কনভেন্টের হোস্টেলে ঢুকে চুরি করবেন ভেবেছিলেন। ছাদে কিছু তামার পাত ছিল, সেগুলোই ছিল তাঁর লক্ষ্য। ছাদে যাওয়ার সময়ে তিনি দেখেন, দু'জন ব্যক্তি টর্চ নিয়ে ওপরে উঠছেন। তাঁদের একজন ফাদার টমাস কোট্টুর।
বিচারক বলেন, "রাজু একজন চোর হতে পারেন, কিন্তু তিনি একজন সৎ মানুষ। পরিস্থিতির চাপে পড়ে চুরি করতে হলেও, তিনি সত্যকে বিকৃত করেননি। তাঁর সে দায়ও ছিল না। তিনি ঘটনাচক্রে সেদিন ওখানে উপস্থিত হয়ে যা দেখেছেন তাই বলেছেন, আর সেটা সত্যি কথাই বলেছেন। দু'দিন ধরে আইনজীবীরা ওঁর সঙ্গে কথা বললেও, নানা রকম চাপ দিলেও, উনি ওঁর জায়গা থেকে সরেননি। কারণ একটাই, তিনি যা বলেছেন তা তাঁকে কেউ শিখিয়ে-পড়িয়ে দেয়নি।"
কেরলের কোট্টায়ামে এক কনভেন্টে থাকতেন সিস্টার অভয়া। তাঁর বাবা-মা মারা গিয়েছেন চার বছর আগে। তিন ক্ষমতাশালী ব্যক্তির গোপন সম্পর্কের কথা জেনে ফেলেছিলেন সিস্টার অভয়া। অভিযুক্ত মাদার সেফি সিস্টার অভয়ার সঙ্গেই হস্টেলে থাকতেন। তিনি ছিলেন হস্টেলের দায়িত্বে। সিবিআই জানিয়েছে, কোট্টুর, ফাদার জোসে পুথরিক্কায়াল ও সেফির মধ্যেকার অন্তরঙ্গ সম্পর্কের সাক্ষী ছিলেন সিস্টার অভয়া।
১৯৯২ সালের ২৭ মার্চ ভোর চারটে বেজে ১৫ মিনিট নাগাদ সিস্টার অভয়া হস্টেলের ঘর থেকে রান্নাঘরে যান। ভোর পাঁচটা নাগাদ ভোঁতা কোনও অস্ত্র দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করা হয়। পরে তাঁর দেহটি ফেলে দেওয়া হয় কুয়োয়।
২০০৮ সালের নভেম্বরে সিবিআই অভিযুক্ত তিনজনকে গ্রেফতার করে। সিস্টার অভয়ার খুনিরা যাতে শাস্তি পায়, সেজন্য দীর্ঘদিন ধরে লড়াই চালিয়েছিলেন মানবাধিকার কর্মীরা। তাঁদের মধ্যে একজনই বেঁচে আছেন। তাঁর নাম জোমোন পুথেনপুরাকাল।
পুলিশ ও ক্রাইম ব্রাঞ্চ প্রথমে বলেছিল, সিস্টার অভয়া আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু নানা মহল থেকে প্রতিবাদ জানানোর পরে তদন্তের দায়িত্ব সিবিআইকে দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রথম তিনটি রিপোর্ট নাকচ করে দেয় আদালত। বিচারক বলেন, এই মামলায় আরও খুঁটিয়ে তদন্ত করা দরকার।
গতকাল শুনানি চলার সময়ে আদালত বলে, তদন্ত রিপোর্টে নানা ফাঁক রয়েছে। সিস্টার অভয়া যে রাতে আত্মঘাতী হয়েছিলেন বলে রিপোর্টে লেখা হয়েছে, সেই রাতে হস্টেল চত্বরের কুকুরগুলো চেঁচায়নি। রান্নাঘরের দরজা বাইরে থেকে আটকানো ছিল। সিস্টার অভয়া যদি কুয়োয় ঝাঁপ দিয়ে থাকেন, হস্টেলের অন্যান্য বাসিন্দারা তার শব্দ শুনতে পেতেন। কিন্তু তাঁরা কোনও শব্দ শোনেননি।
শেষমেশ রাজুর সাক্ষ্যই গোটা মামলাকে ঘুরিয়ে দেয় সত্যের দিকে। ২৮ বছর পরে বিচার পেলেন মৃত অভয়া।