দ্য ওায় ব্যুরো: একলা মায়েদের সন্তানকে বড় করার চ্যালেঞ্জ যে আর পাঁচ জনের চেয়ে খানিক বেশি, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যেখানে মহিলাদের নিরাপত্তাই প্রতিনিয়ত বিঘ্নিত, সেখানে একজন মহিলার পক্ষে একার দায়িত্বে তাঁর সন্তানকে বড় করা মোটেই সহজ কথা নয়। এখন সে দেশের নাম যদি হয় পাকিস্তান, যেখানে নারীস্বাধীনতার আলো এখনও বেশ আবছা, সে দেশে 'সিঙ্গল মাদার' শব্দবন্ধটিই বিরল এবং চ্যালেঞ্জিং।
সেই চ্যালেঞ্জের মুখেই লড়াই করছেন লাহোরের বাসিন্দা ফারহিন। আর এই লড়াই করতে গিয়ে তাঁকে ধারণ করতে হয়েছে ছদ্মবেশ। পুরুষের মতো পোশাক পরে, পুরুষ সাজতে হয়েছে তাঁকে। তবেই লড়াইয়ের এই পথে সামিল হতে পেরেছেন তিনি।

জানা গেছে, লাহোরের আনারকলি বাজারে একটি দোকান চালান ফারহিন। ৯ বছরের মেয়েকে নিয়েই জগৎ তাঁর। পরিবারে কোনও পুরুষ উপার্জনকারী নেই। ফারহিনকেই পরিশ্রম করতে হয় উদয়াস্ত। কিন্তু বাজারের মতো জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় একজন মহিলা হিসেবে নিরাপদে কাজ করা মোটেই সহজ নয় সেখানে। তাই ফারহিন চুল কেটে ফেলেছেন ছোট করে। প্যান্ট পরে, পুরুষ সেজেই রোজ দোকানে বসেন তিনি। সারাদিন কাজ করে হোস্টেলে ফিরে পোশাক বদলান। ফারহিন একটি হোস্টেলেই থাকেন মেয়েকে নিয়ে।

শুধু তাই নয় সারাদিন বাজারে ব্যবসা করার পরে, সন্ধেবেলায় ট্যাক্সিচালক হিসেবে কাজ করেন ফারহিন। সেই কাজের জন্যও মেয়েরা মোটেই ‘যোগ্য’ নয় পাক সমাজে। তাই ছদ্মবেশ কাজে লেগে যায় সেখানেও। পুরুষরূপী ফারহিনের গাড়িতে উঠতে কেউ আপত্তি করেন না, কেউ প্রশ্ন করেন না, কেউ কোনও অবাঞ্ছিত আচরণও করেন না। এভাবেই ফারহিনের নিজের নিরাপত্তাও বজায় থাকে, আবার মেয়েকে বড় করে তোলার জন্য টাকার সংস্থানও করা হয় পরিশ্রম করে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মাথা উঁচু করে নারীদের বেঁচে থাকার পক্ষে কথা বলি আমরা। আমরা উদাহরণ তৈরি করি, মহাকাশ থেকে যুদ্ধক্ষেত্র— সর্বত্র সফল হওয়া নারীদের কথা বলে। কিন্তু আমাদের আশপাশের সমাজ যে এখনও যে কোনও কাজে মহিলাদের মেনে নিতে পারে না, তার প্রমাণ বারবারই সামনে আসে এভাবেই।
কিন্তু ফারহিন অদম্যদের দলে পড়েন। তাই সমাজের মেনে না নেওয়ার চোখে ধুলো দিতে জানেন তিনি। জীবন যেখানে সুগম নয়, সংগ্রাম যেখানে কঠিন, সেখানে রণসাজও তো পরতে হবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো করেই!
কিছুদিন আগে পাকিস্তানের একটি ফেসবুক পেজ ‘হিউম্যানস অফ লাহোর’-এ লেখা হয়েছে ফারহিনের কথা। তার পরেই নেট-দুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছেন তিনি। এর পরে কিছু মানুষ ফারহিনের লড়াইকে সম্মান জানিয়ে এবং তাঁর মেয়ের পড়াশোনার জন্য কিছু টাকাও তুলেছেন। সে টাকা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে ফারহিনের হাতে। নেটিজেনরা কুর্নিশ করেছে ফারহিনের হার-না-মানা মনোভাবকে।
দেখুন সেই পোস্ট।
https://www.facebook.com/Lahorekeinsaan/posts/2610192609048743
কিন্তু প্রশ্ন এখন একটাই। এর পরে পড়শি দেশে বদলাবে কি ফারহিনদের অবস্থা? তাঁরা কি নারী হিসেবেই নিজের যোগ্যতার বলে পরিশ্রম করে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবেন? উত্তর দেবে সময়ই।