
শেষ আপডেট: 24 March 2019 18:30
সাপময় এমন গ্রাম রয়েছে ভারতেই। মহারাষ্ট্রের প্রত্যন্ত এলাকার এই গ্রামের নাম শেতপাল। স্থানীয়রা বলেন সাপের গ্রাম বা ‘দ্য ল্যান্ড অব স্নেক’। কেউটে সাপের গ্রাম নামেও পরিচিত রয়েছে শেতপালের। পুণে থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরত্বে শোলাপুর জেলার এই গ্রামে সাপেদের নিশ্চিন্তের বাস। তাদের জন্য ঘরের দরজা সবসময় খুলে রাখেন গ্রামবাসীরা। সাপেদের বিষদাঁত যে সবসময় ভাঙা হয় তাও নয়। সাপের কারবারিদের বিষ নজর থেকেও পোষ্যদের বুক দিয়ে আগলে রাখেন গ্রামবাসীরা।
‘সাপের ভাষা সাপের শিস, ফিস্ ফিস্ ফিস্ ফিস্’ সত্যজিৎ রায়ের কথামতো শিস দিয়েই সাপেরা মনের ভাব প্রকাশ করে কিনা জানা নেই, তবে লোকে বলে শেতপালের মানুষজন নাকি সাপের ভাষা বোঝেন। সাপের চোখে চোখ রেখে মুখোমুখি বসে কথা বলতে দেখা যায় শিশুদের। সাপের সঙ্গেই এক অদ্ভুত আত্মার বন্ধন। যার বাড়িতে যত বেশি সাপ, গ্রামে তার কদর তত বেশি।

‘‘সাপের গ্রাম নয়, আমাদের এই এলাকা দেবস্থান। এখানে শিবরূপী সাপেদের বাস,’’ গ্রামের বয়স্ক মোড়লের দাবি এমনটাই। মোড়লের বাড়িতেও প্রায় কয়েকশো সাপের নিত্য আনাগোনা। তাদের কেউ কেউ বিছানার নীচে, বা রান্নাঘরে আনাচ কানাচে নিজস্ব ভিটে বানিয়ে নিয়েছে, আবার কেউ অতিথির মতোই রোজ যাতায়াত করে। তাদের আসবার সময় দুধ, কলা, ডিম-সহ নানা ধরনের খাবারে পাত সাজিয়ে রাখেন মোড়লের স্ত্রী। সাপের ডিম ফুটে ছানা বেরোলে তার জন্যও থাকে এলাহি আয়োজন। ঠিক যেন সদ্যোজাত মানব শিশু ভূমিষ্ঠ হয়েছে।
মহারাষ্ট্রের মোদনিম্ব রেল স্টেশন থেকে ক্যাব বুক করে যাওয়া যায় শেতপাল গ্রামে। ৪২০০ একর জায়গা গাছপালা দিয়ে ঘেরা ছবির মতো সুন্দর। প্রায় আড়াই হাজার মানুষের বাস। গ্রামে ঢুকলেই চোখ আটকে যাবে পুরনো বটগাছ তলায়। হয়তো দেখবেন, সারা শরীরে সাপ জড়িয়ে ঝুপসি গাছের নীচে বসে রয়েছেন সাপুড়েরা। চমকের শেষ এখানেই নয়, রাস্তাঘাটে, ঘরবাড়ির আনাচ কানাচে, মেঠো পথে, স্কুল-কলেজে হিলহিলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কেউটে, গোখরো, চন্দ্রবোড়া বা শঙ্খচূড়। পথচলতি বেশিরভাগ মানুষের হাতে বা গলায় সাপ। বাড়ির দাওয়ায় ছোট বাচ্চাদের হাতে কেউটে বা গোখরো দিয়ে খেলতে বসিয়ে দেওয়া হয়। স্কুলের ক্লাসরুমেও নির্দিদ্ধায় ঘুরে বেড়ায় তারা। কেউ তাদের পথ আটকায় না।

মাহিন্দ্র পেশায় সাপুড়ে। বংশপরস্পরায় সাপের খেলা দেখান তাঁর পরিবারের লোকজন। শেতপালে তো ঘরে ঘরে সাপ, তাই খেলা দেখাতে আশপাশের গ্রামে নিত্য যাতায়াত মাহিন্দ্রর। তিনি বললেন, ‘‘সাপকে এখানে দেবতার মতো পুজো করা হয়। এই গ্রামের সাপের কামড়ে মারা গেছে, বা সাপে কেটেছে এমন ঘটনা কখনও শোনা যায়নি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সাপ এখানকার মানুষের ঘরে ঘরে বেড়ে উঠছে।’’
https://www.youtube.com/watch?v=jNLZvQOB8u4
নাগ পঞ্চমী খুব ধূমধাম করে পালিত হয় শেতপালে, জানালেন মীরা। ‘‘বিয়ে হয়ে আসার পর প্রথম প্রথম ভয় করতো। ঘরে, বিছানায় সাপ ঘোরাঘুরি করতো। জানলা দিয়ে সাপ ঢুকে আসত যখন তখন। ভয়ে সিঁটিয়ে যেতাম। এখন আর ভয় করে না, দেখেছি এই সাপেরা কখনও ছোবল মারে না। শুধু পায়ে পায়ে ঘোরে। রেখে দেওয়া খাবার খেয়ে চুপচাপ চলে যায়।’’

কবে থেকে সাপদের প্রতি এমন ভালোবাসা জন্মেছে সেটা মনে করতে পারেন না গ্রামবাসীরা। মোড়লের কথায়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম এমনটাই চলে আসছে। সাপেরাও সখ্য তৈরি করে ফেলেছে মানুষদের সঙ্গে। শিশুদের প্রতি তাদের ভালোবাসা বেশি। গ্রামবাসীদের প্রচলিত ধারণা মতো এই সাপেরা ঈশ্বরের রূপ কিনা জানা নেই, তবে সাপেরা হয়তো নিশ্চিত বুঝেছে, এই গ্রামে তারা নিরাপদ। চোরাশিকারিদের বিষাক্ত নজর শেতপাল গ্রামে ঢুকতে ভয় পায়।
[caption id="attachment_89767" align="aligncenter" width="525"]
কেরলের আলাপ্পুঝায় নাগরাজের মন্দির[/caption]
শুধু শেতপাল নয়, সাপের পূজারীদের দেখা মেলে কেরলের আলাপ্পুঝা জেলাতেও। হরিপদের প্রাচীনতম নাগ দেবতার মন্দিরে উপচে পড়ে ভক্তদের ভিড়। ৩০০০ বছরের পুরনো বিগ্রহ (নাগরাজ) ঘিরে ছড়িয়ে রয়েছে নানা রহস্য, প্রচলিত গল্পকাহিনী। ৩০,০০০ রকমের নাগ মূর্তি রয়েছে মন্দিরে।

থাইল্যান্ডের খন কায়েন গ্রাম
সাপে কাটা নিয়ে এখনও আমাদের দেশে বহু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে, নেহাত ভয় ও আতঙ্কের কারণেই সাপ নিধন চলে যথেচ্ছ ভাবে, এমনটাই জানালেন অর্কপ্রভ ঘোষ। সাপ ভালোবাসেন, সাপ নিয়ে পড়াশোনাও করেন অর্কপ্রভ। সবচেয়ে বড় কথা, সাপ নিধন রুখতে বর্তমানে নানা জায়গায় প্রচার চালাচ্ছেন তিনি। জানিয়েছেন, সাপ নিয়ে অনেক গালগল্প ও জনশ্রুতি রয়েছে দেশে। এই প্রাণীদের ভালো দিকটা তাই নজরের আড়ালে চলে গেছে। বিশেষত শহরের নানা জায়গায় সাপেদের বাসযোগ্য জমির অভাব রয়েছে। বড় বড় অট্টালিকার ভিড়ে মানুষ-বন্যপ্রাণের মধ্যে সংঘাত চলছে অবিরত।

অর্কপ্রভর তোলা কিছু ছবি