
শেষ আপডেট: 15 May 2018 14:36
তিয়াষ মুখোপাধ্যায়: অভিযানে গিয়ে ফের মৃত্যু হল এক শেরপার।
[caption id="attachment_4662" align="alignleft" width="140"]
আং দাওয়া শেরপা[/caption]
সূত্রের খবর, মাকালু অভিযানে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ায়, মঙ্গলবার মৃত্যু হয়েছে আং দাওয়া শেরপার। নেপালের সোলোখুম্বুর বাসিন্দা, ৩২ বছরের আং একটি চিনা অভিযাত্রী দলের সঙ্গে মাকালু অভিযানে গিয়েছিলেন। পর্বতারোহণ আয়োজক সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, ৮৪৬৩ মিটার উঁচু মাকালু শৃঙ্গ ছুঁয়ে নীচে নামার সময়ে, সোমবার দু’নম্বর শিবিরে পৌঁছনোর পর উচ্চতাজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন আং। তাঁকে হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করারও চেষ্টা করা হয় সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।
এর পরে ওই অভিযাত্রী দলের সদস্য-শেরপারা আংকে বেসক্যাম্প পর্যন্ত নামিয়েও আনেন। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। গভীর রাতে মারা যান আং। মঙ্গলবার সকালে হেলিকপ্টারে করে কাঠমাণ্ডুতে মৃতদেহ নামানো হয়। ময়নাতদন্তের পরে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে দেহ।
যদিও আংয়ের মৃত্যুতে অস্বাভাবিকত্ব রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। উচ্চতা বাড়ার সময়ে নানা রকম শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিলেও, শৃঙ্গ ছোঁয়ার পরে নেমে আসার সময় উচ্চতাজনিত অসুস্থতা সাধারণত ঘটে না। শেরপাদের ক্ষেত্রে তো আরওই হয় না এমনটা। তা হলে কি খুব বেশি ক্লান্তিই প্রাণ কেড়ে নিল তরতাজা আংয়ের? ঠিক কী কারণে এমনটা হল, তা ময়না-তদন্তের পরেই জানা যাবে।
[caption id="attachment_4663" align="alignright" width="188"]
হেলিকপ্টারে করে কাঠমাণ্ডু এসে পৌঁছেছে আং-এর দেহ[/caption]
শৃঙ্গ অভিযানে গিয়ে শেরপার মৃত্যু নতুন বিষয় নয়। প্রতি বছর, আরোহণ মরসুমে একাধিক শেরপা মারা যান নেপাল হিমালয়ের সাত-আটহাজারি শৃঙ্গ অভিযানে গিয়ে। ২০১৪ সালে কাঞ্চনজঙ্ঘা অভিযানে গিয়ে নিখোঁজ বাঙালি অভিযাত্রী ছন্দা গায়েনের সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছিলেন দুই শেরপাও। ওই বছরেই এভারেস্ট অভিযানে দক্ষ শেরপার যে দলটি রুট ওপেন করতে (আরোহণের জন্য দড়ি-মই ইত্যাদি আগে থেকে প্রস্তুত করা) এগিয়ে গিয়েছিল, তাদের মধ্যে ১৬ জন শেরপা মারা যান খুম্বু হিমবাহে। ২০১৫ সালে নেপাল ভূমিকম্পে ফের প্রাণ হারান দশ জন শেরপা। এ তো গেল সম্প্রতি, মনে রাখার মতো বড় ঘটনা। এর বাইরেও নানা ছোট-বড় অভিযানে প্রায়ই প্রাণ হারান তাঁরা।
মৃত্যু যেন রুটি-রুজির দায়ে পাহাড় চড়তে আর চড়াতে যাওয়ার বাইপ্রোডাক্ট তাঁদের কাছে। ছোট দুই সন্তানের বাবা আং-ও পেটের দায়েই গিয়েছিলেন অভিযানে। পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সদস্য ছিলেন তিনিই। প্রতিটা অভিযানে কার্যত অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেও, আরোহণ ইতিহাসে ট্র্যাজিক হিরো ছাড়া অন্য পরিচয় জোটে না। এমনকী আরোহী হিসেবেও জোটে না খ্যাতির মুকুট। সহ-অভিযাত্রী হিসেবে নামটুকুও অনেক সময় ওঠে না খাতায়।
[caption id="attachment_4664" align="alignleft" width="300"]
এই অভিযানেই অংশগ্রহণ করেছিলেন আং[/caption]
সহ-অভিযাত্রী! শেরপারা শুনলে হয়তো হাসবেন। পৃথিবীর কোন কোন প্রান্ত থেকে একের পর এক পর্বতারোহী দল নিরন্তর ছুটে আসে হিমালয়ে! বড় ভরসা এই শেরপারাই। কিন্তু ‘অভিজাত’ আরোহী মহল এখনও শেরপাদের সহ-অভিযাত্রীর চোখে দেখে না। তাঁদের পরিচয় স্রেফ শেরপা হিসেবেই। উচ্চতার সঙ্গী। বিপদের উদ্ধারকর্তা। জিনগত ভাবে রক্তে অতিরিক্ত লোহিত কণিকা থাকায় যাঁদের শরীরে অক্সিজেন বেশি প্রবাহিত হয়। তাই পাহাড় চড়াটা যাঁদের কাছে জলভাত। পয়সার বিনিময়ে যাঁদের সঙ্গে নিয়ে, যাঁদের দিয়ে মালপত্র বইয়ে, প্রয়োজনে যাঁদের পিঠে চড়েও উঁচু থেকে আরও উঁচু শৃঙ্গ জয় করে ফেলা যায়। মেলে খেতাব, বাড়ে রেকর্ড। শেরপারা ফিরে যান নিজেদের গ্রামে। অপেক্ষা করেন পরের বছরের আরোহণ-মরসুমের।
এরই মাঝে মাসুল গোনেন কেউ কেউ। দীর্ঘ হয় মৃতের তালিকা। যার শেষতম সংযোজন আং দাওয়া শেরপা।