দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশের প্রতিটি কোণা যেন ফুঁসছে হাথরাসের ঘটনায়। বছর ২০র দলিত মেয়েটির নারকীয় হত্যাকাণ্ডে দিকে দিকে জ্বলে উঠেছে প্রতিবাদের আগুন। অভিযুক্তদের ফাঁসির দাবি উঠেছে সর্বত্র। এরই মধ্যে উত্তরপ্রদেশ পুলিশকর্তা মন্তব্য করে বসলেন, “এক সপ্তাহ পরে ধর্ষণের কথা জানিয়েছিলেন ওই তরুণী!”
হাথরাসের ঘটনায় প্রথম থেকেই পুলিশের বিরুদ্ধে অসহযোগিতা ও অসংবেদনশীলতার অভিযোগ উঠেছে। নিহত তরুণীর পরিবার অভিযোগ করেছিলেন, ঘটনার দিন রাতে বাড়ি না ফেরায় তাঁরা স্থানীয় থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেছিলেন। কিন্তু পুলিশ কোনও গা করেনি। আরও আগে যদি মেয়েকে উদ্ধার করা যেত তাহলে হয়তো প্রাণে মরতে হতো না। এর পরে পুলিশের বিরুদ্ধে ফের অভিযোগ ওঠে, বাড়ি থেকে জোর করে মৃতার দেহ নিয়ে গিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়ার।
এখানেই শেষ নয়। উত্তরপ্রদেশ পুলিশের এক সিনিয়র অফিসার প্রশান্ত কুমার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ফরেন্সিক রিপোর্টে নাকি কোথাও ময়নাতদন্তের প্রমাণ মেলেনি। বলা হয়েছে তরুণীর গোপনাঙ্গে আঘাতের চিহ্ন ছিল। প্রশান্ত কুমার বলেন, “ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বলছে গলায় আঘাতের জন্য মৃত্যু হয়েছে নির্যাতিতার। ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির রিপোর্টে বলা হয়েছে কোথাও বীর্য পাওয়া যায়নি। এর থেকেই প্রমাণিত কিছু মানুষ ইচ্ছে করে এই ঘটনাকে উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের রূপ দিতে চাইছে। এই ধরনের মানুষকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
[caption id="" align="alignnone" width="770"]

পুলিশকর্তা প্রশান্ত কুমার।[/caption]
এর পরে তিনি বলেন, “আমরা প্রথম থেকেই আক্রান্ত তরুণীর কথা বিশ্বাস করেছি। ১৪ সেপ্টেম্বর সে যখন মা এবং ভাইয়ের সঙ্গে এসে এফআইআর দায়ের করে, আমরা তখনই তা নথিভুক্ত করি ও হাসপাতালে পাঠাই। এর পরে ২২ তারিখে সে প্রথম ধর্ষণের কথা বলে। এক সপ্তাহ পরে কেন বলল। যদিও অভিযোগ শুনেই সঙ্গে সঙ্গে আমরা সেই ধারা যোগ করি মামলায় এবং অভিযুক্তদের গ্রেফতারও করি। এর পরে ২৫ তারিখে দিল্লির হাসপাতালে পাঠানো হয় তাকে। তদন্ত এখনও চলছে, আমি কোনও সিদ্ধান্ত নিচ্ছি না। তবে এটা জানানো আমার কর্তব্য, ফরেনসিক রিপোর্টে ধর্ষণের প্রমাণ মেলেনি।”
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বলছে, নির্যাতিতা তরুণীর গলার কাছের হাড় ভেঙে গিয়েছিল। ময়নাতদন্তের দায়িত্বে থাকা তিন জন ডাক্তারই বলেছেন, গলা টিপে প্রথমে মারার চেষ্টা হয়। পরে দড়ি বা কাপড় পেঁচিয়ে বারে বারে ফাঁস দেওয়া হয় গলায়। তার কারণ একাধিক ফাঁসের দাগ ছিল মেয়েটির গলার চারপাশে। ফাঁসের দড়ি বা কাপড় টাইট করে পেঁচিয়ে দমবন্ধ করে খুন করার চেষ্টা করে অপরাধীরা। এই প্যাঁচের কারণেই মেয়েটির গলার কাছের হাড় ভেঙে যায়। ঘাড় বেঁকে যায়।

মারধরের চিহ্নও ছিল মেয়েটার সারা শরীরে। ডাক্তাররা বলেছেন, স্পাইনাল কর্ড বা মেরুদণ্ডের উপরের দিকে হাড়গুলো মারাত্মকভাবে জখম ছিল। বিশেষত, সার্ভাইকাল ভার্টিব্রার সি৬ অস্থি ভেঙে গিয়েছিল। শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল তরুণীর। মানুষের দেহের মেরুদণ্ড অনেকগুলো কশেরুকা নিয়ে তৈরি হয়। মোট ৩৩টি কশেরুকা থাকে। মেরুদণ্ডের উপরের দিকে গলার কাছাকাছি যে কশেরুকাগুলি থাকে তাকে সার্ভাইকাল ভার্টিব্রা বলে। এতে সাতটি অস্থি থাকে। ডাক্তাররা বলছেন, এই অস্থিগুলোতে মারাতমকভাবে জখমের ছাপ ছিল তরুণীর। কয়েকটি ভেঙে গিয়েছিল মারের চোটে। যে কারণে মেয়েটার সারা শরীর প্যারালাইসিস হয়ে গিয়েছিল। হাত-পায়ের সাড় চলে গিয়েছিল।
এর পরেও যোগীরাজ্যের পুলিশের ধর্ষণ না হওয়ার দাবি এবং এক সপ্তাহ পরে জানানো নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ তুলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, নির্যাতিতার শরীর থেকে ঘটনার অনেক পরে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। তাহলে সেখানে বীর্য না থাকারই কথা। কিন্তু তা ছাড়াও যে প্রমাণ মিলেছে তা থেকে ধর্ষণের ও নারকীয় নির্যাতনের চিহ্ন স্পষ্ট। তাহলে কী ভাবে পুলিশ এই দাবি করছে, প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের।
২৫ সেপ্টেম্বর জওহরলাল নেহরু হাসপাতালে প্রথমে ভর্তি করা হয় তরুণীকে। কিন্তু শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় সফদরজং হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানেই ১৪ দিন বাঁচার লড়াই চালিয়েছিলেন নির্যাতিতা। কিন্তু জখম এতটাই বেশি ছিল এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হচ্ছিল যে শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।