দ্য ওয়াল ব্যুরো: যমজ কন্যা সন্তানের মা হলেন মণিপুরের ‘লৌহমানবী’ ইরম চানু শর্মিলা৷ রবিবার বিকেলে, বেঙ্গালুরুর এক বেসরকারি হাসপাতালে সন্তানদের জন্ম দেন শর্মিলা৷ হাসপাতাল সূত্রের খবর, মা ও সন্তানেরা সকলেই সুস্থ রয়েছে৷ আন্তর্জাতিক মাতৃ দিবসে শর্মিলার মা হওয়ার ঘটনায় অভিনন্দন জানিয়েছেন সকলে।
শর্মিলার লৌহমানবী হয়ে ওঠার সূত্রপাত ২০০০ সালে। তখন রাজনৈতিক অশান্তি ও সামাজিক অস্থিরতায় জর্জরিত গোটা মণিপুর। সেনার অত্যাচার তুমুল রূপ নিয়েছে। রক্তাক্ত পাহাড়ি রাজ্যটি জুড়েলযেন সহ্যশক্তির পরীক্ষা দিচ্ছিলেন সাধারণ মানুষ। কেউ আবার টিকে থাকার জন্য রাজনীতির লড়াইয়ে হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলিয়ে ছিলেন। কিন্তু প্রতিবাদে ঠিকরে উঠেছিলেন এক জনই। শর্মিলা চানু।
আর তিনি বুঝেছিলেন, এই প্রতিবাদ শুধু মিছিল-মিটিং দিয়ে করা সম্ভব নয়, আন্দোলন প্রয়োজন। কিন্তু তৎকালীন মণিপুরে সুসংহত আন্দোলন তৈরি করার মতো অবস্থাও ছিল না। তাই একাই শর্মিলা শুরু করেছিলেন অনশন। কোনও হিসেব-নিকেশ না করেই ঝাঁপ দিয়েছিল আমরণ অনশনে৷ তার পর কেটে গেছে ১৬ বছর! নিশ্চুপ আন্দোলন চলেছে খালি পেটে৷
২০০০ সালে মণিপুরের জঙ্গি কবলিত এলাকায় নিয়মিত চলত সেনা টহলদারি৷ তবে তা শুধুই টহলদারি নয়৷ আইনের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সেনারা নির্মম অত্যাচারও চালাত মণিপুরবাসীর উপর৷ আর এই অত্যাচারের ফলে ইম্ফলের কাছে মালোম এলাকায় অসম রাইফেলসে সেনার গুলিতে শিশু-সহ মারা যায় ১০ জন৷ এরই প্রতিবাদে সে সময় মুখর হয়ে ওঠে গোটা মণিপুর৷ ওই ঘটনার পরেই আফস্পা আইনের প্রতিবাদে আমরণ অনশনের ডাক দিয়েছিলেন শর্মিলা৷
তবে শর্মিলার এই অনশন মোটেও সহজ ও মসৃণ হয়নি। প্রচুর বাধা এসেছে৷ মণিপুর প্রশাসনের জোর-জবরদস্তিতে তাঁকে ভর্তি করা হয় নার্সিং হোমেও৷ মুখে নল ঢুকিয়ে তাঁকে জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টাও করা হয়েছিল৷ আদালতে আত্মহত্যার অভিযোগও দায়ের হয়৷ গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে হাসপাতালের বেডে নাকে রাইলস টিউব গোঁজা শর্মিলার ছবি ৷ শর্মিলার ১৬ বছরের অনশন জায়গা করে নিয়েছে রেকর্ড বুকেও৷
অবশেষে ২০১৬ সালের ৯ অগস্ট ১৬ বছরের অনশন সরকারি ভাবে ভেঙে ফেলেছিলেন শর্মিলা৷ রাইলস টিউব খুলে দেন নাক থেকে। যোগ দেন রাজনীতিতেও। নির্বাচনেও দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি৷ ২০১৭ সালে নতুন সংসার পাতেন ভালবাসার মানুষকে বিয়ে করে।
অবশ্য সেই সময়ে তাঁর এই সিদ্ধান্ত নিয়েও কম সমালোচনা হয়নি। 'লৌহমানবী'র সাংসারিক রূপ অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। নানা ভাবে সমালোচনা করেছিলেন অনেকে। কিন্তু আবার একটা বড় অংশ শর্মিলার পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, নিজের মতো বাঁচার অধিকার সকলের আছে। কেউ অনশন শুরু করেছেন মানে তাঁকে তা আমৃত্যু বয়ে যেতে হবে, এমন কোনও কথা নেই।
শেষমেশ বিতর্কের অবসান ঘটে। নিজের মতো সাংসারিক জীবন শুরু করেন শর্মিলা। ৪৬ বছর বয়সে, আজ দুই সন্তানের জন্ম দেওয়ায় তা যেন পূর্ণতা পেল।