দ্য ওয়াল ব্যুরো: পাহাড়ি পথে হু হু করে ছুটছিল গাড়ি। চালাচ্ছেন মধ্য কুড়ির তরুণ। পাশে প্রায় একই বয়সি দু’জন সঙ্গী। গাড়ি চলছে, চলছে ফোনের ভিডিও ক্যামেরাও। ভিডিওয় হাসছেন তাঁরা, কথা বলছেন, বর্ণনা দিচ্ছেন আনন্দভ্রমণের। চালকের আসনে বসা তরুণও চালাতে চালাতেই মাঝে মাঝে ঘাড় ঘোরাচ্ছেন ক্যামেরার দিকে। হঠাৎ প্রচণ্ড নড়ে গেল ক্যামেরা, আবছা হয়ে গেল দৃশ্য। শোনা গেল আর্ত চিৎকার, “মরে গেলাম!” তার পরেই সব অন্ধকার। পুলিশের অনুমান, ওই মুহূর্তেই স্টিয়ারিংয়ের নিয়ন্ত্রণ হারান বীরেন্দ্র কুমার, সেনাবাহিনী থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি এসে, বন্ধুদের সঙ্গে নৈনিতাল ঘুরতে যাওয়া তরুণ।
বীরেন্দ্র মারা গিয়েছেন। সঙ্গে থাকা তাঁর ভাই সঞ্জু কুনওয়ার এবং বন্ধু দীপু দানি গুরুতর জখম। পুলিশ জানিয়েছে, বুধবার নৈনিতাল থেকে পাহাড়ি পথে গাড়ি চালিয়ে কালাদুঙ্গি যাচ্ছিলেন তাঁরা। অনুমান, সেই সময় সেলফি-ভিডিও তুলতে গিয়ে অন্যমনস্কতার জেরেই ঘটে গিয়েছে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
এ দেশে সেলফি-অ্যাকসিডেন্ট অবশ্য এই প্রথম নয়। নতুন কিছুও নয়। বরং সম্প্রতি বেশ কম দিনের ব্যবধানে বারবার সেলফি তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পডে়ছেন অনেকে। তার মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রাণঘাতী হয়েছে।
গত মাসের ২১ তারিখেই মাথেরানে বেড়াতে গিয়ে খাদের ধারে সেলফি তোলার সময়ে ৫০০ ফিট গভীরে পড়ে যান দিল্লির এক তরুণী। মৃত্যু হয় তাঁর। তার তিন দিন আগে, ১৮ তারিখে গোয়ার বিচে সেলফি তুলতে গিয়ে ডুবেই গিয়েছেন ভেলোরের ২৮ বছরের তরুণ।
এ ছাড়াও আরও অজস্র ঘটনা রয়েছে এই সেলফি-মৃত্যুর। রেললাইনে দাঁড়িয়ে সেলফি বা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে সেলফি তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনার কথা প্রায়ই সামনে আসে। শুধু নিজের বিপদ নয়, এই সেলফির নেশায় প্রায়ই অবহেলিত হন দুর্ঘটনাগ্রস্ত মানুষও। প্রায় ক্ষেত্রেই অভিযোগ ওঠে, সামনেই ঘটে যাওয়া চরম কোনও সঙ্কটে সাহায্যের হাত এগিয়ে আসে না, আগে তাক হয়ে যায় মোবাইল।
মনোস্তত্ত্বের কারবারিদের ব্যখ্যা, মানুষের আত্মপ্রিয়তা এবং নিজের প্রতিটা প্রিয় মুহূর্তকে লেন্সে বেঁধে ফেলার চেষ্টা বিপজ্জনক রকম ভাবে বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠার নানা উপাদানের খোঁজ। নানা রকমের চোখধাঁধানো সেলফি তার মধ্যে অন্যতম। এই সেলফি আহরণ করতে গিয়ে প্রায়ই পেরিয়ে যাচ্ছে বিপদসীমা।
নৈনিতালের ওই তরুণরাও হয়তো এভাবেই দুর্ঘটনার শিকার হলেন। যাত্রাপথের আনন্দ ধরে রাখতে তা রেকর্ড করছিলেন মোবাইলে। কিন্তু শুধু যাত্রাপথ নয়, তাতে থাকতে চেয়েছিলেন নিজেরাও। বোঝাতে চেয়েছিলেন আনন্দের মাত্রা। পাহাড়ের বিপদসঙ্কুল পথে গাড়ি চালাতে চালাতেও এই নেশা কাটাতে পারেননি তরুণ চালক বীরেন্দ্র। পরে হয়তো এই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে অনেককে তাক লাগিয়ে দিতেন তাঁরা। কিন্তু সেটা আর হল না। মুহূর্তের অসতর্কতায় ঘটে গেল চরম বিপদ।