দ্য ওয়াল ব্যুরো: ড্রাগ কন্ট্রোলের অনুমতি পাওয়ার পরে অ্যান্টি-রেট্রোভিয়াল ফ্যাভিপিরাভির ওষুধের জেনেরিক ভার্সন ফ্যাবিফ্লুর ক্লিনিকাল ট্রায়াল শুরু করতে চলেছে সিপলা। দেশের একাধিক ক্লিনিকাল সেন্টারে করোনা থেরাপিতে ফ্যাবিফ্লু ওষুধের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হবে। সরকারি সংস্থা কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (আইসিএমআর)-এর ডিরেক্টর জেনারেল শেখর সি মান্ডে জানিয়েছেন, ফ্যাবিফ্লু শুধু নয়, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রকের অনুমোদনে করোনার আরও চার ওষুধের কম্বিনেশন ট্রায়াল করা হবে। রেমডেসিভির, টোসিলিজুমাব, উমিফেনোভির এবং সেপসিভ্যাক। ভেষজ উদ্ভিদ থেকে তৈরি ফাইটোফার্মাসিউটিক্যাল ড্রাগ এসিএইচকিউ ওষুধের কম্বিনেশনের পরীক্ষা হবে করোনা রোগীদের উপরে।
সিপলা ফার্মাসিউটিক্যালস ও সান ফার্মার সঙ্গে করোনার ওষুধের সলিডারিটি ট্রায়াল করছে সিএসআইআর। শেখর মান্ডে বলেছেন, রেমডেসিভির ও ফ্যাভিপিরাভির তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালে রয়েছে। ড্রাগ কন্ট্রোলের নির্দেশিকা মেনে শুধুমাত্র জরুরি ভিত্তিতেই করোনা রোগীদের চিকিৎসায় এই দুই ওষুধ ব্যবহার করা হবে। মাঝারি সংক্রমণের রোগীদের থেরাপিতেই এই দুই ওষুধ বা তাদের জেনেরিক ভার্সনের প্রয়োগে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। সেপসিভ্যাক ও উমিফেনোভিরও তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালে রয়েছে।
শেখর মান্ডের কথায়, ৬০০-৭০০ জন করোনা রোগীর থেরাপিতে ফ্যাভিপিরাভির ওষুধের ট্রায়াল করছে সিপলা ফার্মাসিউটিক্যালস। তবে আরও বেশি সংখ্যক কোভিড রোগীর উপরে ওষুধের ট্রায়ালের জন্য ড্রাগ কন্ট্রোলের অনুমতি চাওয়া হয়েছে। সিএসআইআরের তত্ত্বাবধানে বিজ্ঞানীদের নিয়ে টিম তৈরি করা হবে। কন্ট্রোলড ট্রায়াল যেমন হবে, তেমনি বিভিন্ন ওষুধের ডোজ ও অনুপাতের মিশ্রণে কম্বিনেশন ট্রায়ালও করা হবে। মু্ম্বইয়ের গ্লেনমার্ক ফার্মাসিউটিক্যালস ইতিমধ্যেই ফ্যাভিপিরাভির ও উমিফেনোভির ওষুধের কম্বিনেশন ট্রায়াল শুরু করেছে। কোভিড রোগীদের দুটি দলে ভাগ করে একটি দলকে শুধুমাত্র ফ্যাভিপিরাভিরের ডোজ দেওয়া হচ্ছে, আর অন্য দলকে দুই ওষুধেন কম্বিনেশনে ডোজ দিয়ে তাদের শারীরিক পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
কী কী ওষুধের কম্বিনেশন ট্রায়াল হবে?
নিওক্লিওটাইড অ্যানালগ রেমডেসিভিরের দুই জেনেরিক ভার্সন সিপ্রেমি ও কোভিফোর তৈরি করেছে সিপলা ও হেটেরো ল্যাব। এদের কাজ হবে রেমডেসিভিরের মতোই। ভাইরাসের প্রতিলিপি তৈরি করে সংখ্যায় বাড়ার ক্ষমতাকে রুখে দিতে পারবে বলেই আশা গবেষকদের। রেমডেসিভিরের নির্মাতা সংস্থা গিলিয়েড সায়েন্সের সঙ্গে চুক্তি করে এই ওষুধের মূল উপকরণ তৈরি করছে সিএসআইআরের অধীনস্থ ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব কেমিক্যাল টেকনোলজি ল্যাব।
জাপানি ফার্মাসিউটিক্যালস ফুজিফিল্মের বানানো
ফ্যাভিপিরাভিরের জেনেরিক ভার্সন ফ্যাবিফ্লু ব্র্যান্ড বাজারে এনেছে মুম্বইয়ের গ্লেনমার্ক ফাউন্ডেশন। ফ্যাভিপিরাভির হল প্যারাজাইকার্বোক্সামাইডের ডেরিভেটিভ। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, হলুদ জ্বর, হাত ও পায়ের যে কোনও ভাইরাল ইনফেকশন কমাতে পারে এই ওষুধ। তার জেনেরিক ভার্সন ফ্যাবিফ্লুও একইভাবে কাজ করবে। সার্স-কভ-২ ভাইরাসের সংক্রামক আরএনএ স্ট্রেন কোষের ACE-2 রিসেপটরের মাধ্যমে ভেতরে ঢুকে বিভাজিত হতে শুরু করে। এই বিভাজন প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দিতে পারে অ্যান্টি-রেট্রোভিয়াল ওষুধ ফ্যাভিপিরাভির।

করোনা থেরাপিতে সেসপিসের ওষুধ
সেপসিভ্যাকের ট্রায়ালও করেছে সিএসআইআর। চণ্ডীগড়ের ‘পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ’ (PGIMER)-এ সেপসিভ্যাকের ট্রায়াল চলছে। সেপসিভ্যাক আসলে ‘
ইমিউনোমডিউলেটর’ (Immunomodulator) । যার কাজ হল শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো। সেপসিভ্যাক মূলত ইমিউনো থেরাপির জন্যই কাজে লাগে।
লখনৌতে সিএসআইআরের সেন্ট্রাল ড্রাগ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিডিআরআই) ল্যাবরেটরিতে
উমিফেনোভির ওষুধ নিয়ে গবেষণা চলছে। এই ওষুধের ফেজ-৩ ট্রায়াল চলছে লখনৌয়ের কিং জর্জ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি, ড. রাম মনোহর লোহিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্স এবং লখনৌ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে। উমিফেনোভিরের ব্র্যান্ড নাম হল
আরবিডল (Arbidol) । এটি মূলত অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ যা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো সংক্রমণ সারাতে কাজে লাগে। উমিফেনোভিরের কাজ হল ভাইরাসের লিপিড-প্রোটিন মেমব্রেনকে মানুষের দেহকোষের কোষপর্দার সঙ্গে যুক্ত হতে বাধা দেওয়া। অর্থাৎ ভাইরাল ক্যাপসিড এবং দেহকোষের রিসেপটরের মধ্যে যে যোগসূত্র তৈরি হয়, তাকেই ভেঙে দিতে পারে এই ওষুধ। ফলে ভাইরাস আর কোষে ঢুকে প্রতিলিপি তৈরি করে সংখ্যায় বাড়তে পারে না। শরীরে ভাইরাসের বিভাজন যদি কমে যায় তাহলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও কমে।
করোনার চিকিৎসায় আর্থ্রাইটিসের ওষুধ
টোসিলিজুমাবের ট্রায়ালে সবুজ সঙ্কেত দিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর) ও কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. হর্ষ বর্ধনের অনুমোদন সাপেক্ষেই টোসিলিজুমাবের ক্লিনিকাল ট্রায়াল চলছে দেশের একাধিক মেডিক্যাল সেন্টারে। টোসিলিজুমাবের ট্রায়ালের দায়িত্বে রয়েছেন পদ্মশ্রী সম্মানপ্রাপ্ত ডাক্তার অরভিন্দর সিং সয়েন। ইমিউনোসাপ্রেস্যান্ট ড্রাগ টোসিলিজুমাব কোভিড সংক্রমণ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া থেকে আটকাতে পারে। ভাইরাসের সংক্রমণ হলে শরীরে যে অধিক প্রদাগজনিত রোগ তৈরি হচ্ছে তাকে থামিয়ে দিতে পারবে এই ইমিউনোসাপ্রেস্যান্ট। ডাক্তারদের দাবি, নির্দিষ্ট সময়ের ডোজে টোসিলিজুমাব থেরাপি প্রয়োগ করলে কোভিড রোগীর ফুসফুসের সংক্রমণ কমানো যাবে, ফলে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়ার দরকার পড়বে না।