দ্য ওয়াল ব্যুরো: মানুষ নয়, কোনও পশুর শরীর থেকেই প্রথম ছড়িয়েছে প্রাণঘাতী করোনাবাইরাস। এ কথা আগেই নিশ্চিত করেছেন বিজ্ঞানী-গবেষকরা। এ-ও জানিয়েছেন, পশুর শরীরের অসুখ মানুষের শরীরে হওয়ার কারণেই এর তীব্রতা এবং ভয় এত বেশি। সেই কারণেই সামাল দেওয়া যাচ্ছে না এই অসুখ। কিন্তু ঠিক কোন প্রাণীটি থেকে ছড়াল এই ভাইরাস, সেই অনুসন্ধান এখনও চলছে।
সরাসরি নয়, চক্রাকারে ছড়িয়েছে করোনাভাইরাস
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, প্রাণীর দেহে করোনাভাইরাসের আক্রমণও হঠাৎ করে ঘটেনি। তারও একটা নির্দিষ্ট চক্র আছে। যেমন ধরা যাক, চিনের কোনও এলাকার আকাশে উড়ে বেড়াতে বেড়াতে মলত্যাগ করল কোনও একটি বাদুড়। তার মলে মিশে ছিল করোনাভাইরাস। সেই করোনাভাইরাস হয়তো তার শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর ছিল না। এখন কোনও বন্যপ্রাণী, ধরা যাক একটি প্যাঙ্গোলিন, ঝোপঝাড়ের মধ্যে খাবার অর্থাৎ পোকামাকড়ের খোঁজে করতে করতে ওই বাদুড়ের বিষ্ঠা থেকে সংক্রমিত হয়ে পড়ল। এর পরে আক্রান্ত সেই প্যাঙ্গোলিনকে ধরে বাজারে বিক্রি করা হল মাংস কেটে। সেই বাজারের কর্মীদের মধ্যে হয়তো ছড়িয়ে পড়ল করোনাভাইরাস। সেই মাংস খেয়ে হয়তো আক্রান্ত হল আরও বেশি মানুষ।
গোয়েন্দা গল্পের মতো অনুসন্ধান
এই সবটাই বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক ধারণা হলেও, গবেষণা যত এগোচ্ছে, সেই ধারণায় সিলমোহর পড়ছে তত বেশি। মনে করা হচ্ছে, ঠিক এইভাবেই করোনাভাইরাসের সূত্রপাত হয়েছে চিনে। করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার এ চক্রটি প্রমাণের জন্য বিজ্ঞানীরা ভাইরাস আক্রান্ত প্রথম প্রাণীটি খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এই গবেষণায় যুক্ত বিজ্ঞানী, লন্ডনের জুলজিক্যাল সোসাইটির অধ্যাপক অ্যান্ড্রু কানিংহ্যাম বলেন, "কোন ঘটনার ধারাক্রম খুঁজে বের করাটা কিছুটা গোয়েন্দা গল্পের মত। এতে কিছু বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে বাদুড়ের কয়েকটি প্রজাতি, যারা বিভিন্ন ধরনের করোনাভাইরাসের বাহক হতে পারে তাদেরকে চিহ্নিত করে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে।"
বাদুড়ই কেন?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, যখন কোনও রোগীর শরীর থেকে নতুন কোনও ভাইরাসের কোড শনাক্ত করা যায়, তখন প্রথমেই ভাইরাস ছড়ানোর জন্য সন্দেহের তির তাক করা হয় বাদুড়ের দিকে। কারণ স্তন্যপায়ী এই প্রাণীরা দল বেঁধে থাকে। এরা অনেক দুর পর্যন্ত উড়ে যেতে পারে, এবং পৃথিবীর সব অংশেই তাদের বিচরণ রয়েছে। এই প্রাণী প্রায় কখনওই নিজে অসুস্থ হয় না, কিন্তু দূর দূরান্ত পর্যন্ত রোগের জীবাণু ছড়িয়ে বেড়ায়।

ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যামের আর এক অধ্যাপক জোনাথন বল বলছেন, স্তন্যপায়ী প্রাণী হওয়ার কারণে মানুষের মধ্যে সরাসরি অথবা মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কোন প্রাণীর মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াতে পারে বাদুড়। কিন্তু করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে আরও একটি রহস্যময় প্রাণী রয়েছে, যে নিজের শরীরে সেই ভাইরাসকে পুষেছে এবং উহানের সি ফুড বাজারে পৌঁছে দিয়েছে। কারণ বাদুড়ের মাংস সেখানে বিক্রি হয় না।
প্যাঙ্গোলিনেই প্রথম সংক্রমণ
এই ক্ষেত্রে সন্দেহভাজন প্রাণীটি হচ্ছে প্যাঙ্গোলিন। শক্ত আঁশযুক্ত, স্তন্যপায়ী এই প্রাণীটির মুল খাবার পিঁপড়ে। বনেজঙ্গলে ঝোপেঝাড়ে ঘুরে খাবার খোঁজে তারা। এই মুহূর্তে এই প্রাণীটি বিপুল পরিমাণে চোরাপাচার হয় চিন থেকে। প্যাঙ্গোলিনের আঁশ থেকে ঐতিহ্যবাহী চিনা ওষুধ তৈরি হয় বলে এশিয়া জুড়ে এর কদর। প্যাঙ্গোলিনের মাংসও দারুণ সুখাদ্য।

চিনের করোনা-গবেষণায় প্যাঙ্গোলিনের শরীরে যে করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, এবং তার যে ধরণের নমুনা পাওয়া গেছে তার সঙ্গে নোভেল হিউম্যান ভাইরাসের খুবই মিল রয়েছে বলে বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ বলছেন।
চলছে প্যাঙ্গোলিন-গবেষণা
তাহলে কি বাদুড়ের ভাইরাস প্যাঙ্গোলিনের মাধ্যমে মানুষের শরীরে এসে পৌঁছেছে? বিশেষজ্ঞরা এখুনি কোন উপসংহারে পৌঁছতে রাজি নন। কারণ চিনের প্যাঙ্গোলিনের ওপরে করা সমস্ত গবেষণার ফলাফল এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

এই বিষয়ে অধ্যাপক কানিংহ্যাম বলছেন, কোথাকার কতগুলি প্যাঙ্গোলিনের ওপর গবেষণা চালানো হয়েছে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গবেষণার জন্য কি একাধিক বন্য প্যাঙ্গোলিনকে পরীক্ষা করা হয়েছে, নাকি বন্দি থাকা পোষা প্যাঙ্গোলিনের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়েছে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ের অনেকগুলো ভাইরাস ছড়িয়েছে প্রাণীদেহ থেকেই। যেমন ইবোলা, সার্স ভাইরাস, এইচআইভি এবং নতুন করোনাভাইরাস—এই সবক’টিই এসেছে বুনো প্রাণী থেকে।
ঝুঁকির উৎস জানা জরুরি
যে কোনও রকম বিশেষ বা নতুন সংক্রামক অসুখের ক্ষেত্রেই রোগে আক্রান্ত প্রথম প্রাণীটিকে চিহ্নিত করা খুবই জরুরি বলে মনে করেন চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীরা। কারণ সেই প্রাণীকে ভাল ভাবে স্টাডি করলে, কেন, কীভাবে এবং কোথায় এই সংক্রমণের সূচনা হয়েছিল, তা জানা সহজ হয়। তাই ঝুঁকির জায়গাটি যদি সঠিক ভাবে চিহ্নিত করা যায়, তাহলে মানুষ সংক্রামিত হবার আগেই রোগ প্রতিরোধের জন্য শক্ত ব্যবস্থা নিতে পারা যাবে।

তাই সংক্রমণের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করা এবং ভবিষ্যতে এই অসুখের প্রাদুর্ভাব ঠেকানো—এই দু’টি কারণেই প্রথম আক্রান্ত প্রাণীটিকে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি। জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির একটি রিপোর্ট বলছে, চিনে যে ৭৫ হাজারেরও বেশি লোকের দেহে এখনও পর্যন্ত এই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে, তার ৮২ শতাংশই হুবেই প্রদেশের ঘটনা। এবং অসুখ ছড়ানোর প্রথম দিকে যে ৪১ জন সংক্রমণের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ২৭ জনই উহানের সেই বাজারের সংস্পর্শে এসেছিলেন।
ইবোলার ক্ষেত্রেও দায়ী ছিল বাদুড়
এই প্রসঙ্গে বিজ্ঞানীরা মনে করিয়ে দিয়েছেন ইবোলা রোগের কথা। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলার প্রাদুর্ভাব হয় ভয়ঙ্কর ভাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী এতে মারা যায় ১১ হাজারেরও বেশি মানুষ, সংক্রমিত হন ২৮ হাজার।

দু’বছর ধরে চলা এই সংক্রামক অসুখে আক্রান্ত লোকের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল বিশ্বের ১০টি দেশে। এর মধ্যে আফ্রিকান দেশগুলি ছাড়াও আমেরিকা, ইংল্যান্ড, স্পেন এবং ইটালি ছিল। সে সময়ে বিজ্ঞানীরা নানা পরীক্ষা ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছেন যে, এই অসুখের উৎস ছিল গিনির মেলিয়ান্দো গ্রামের একটি গাছের কোটরে জমে থাকা বাদুড়ের বিষ্ঠা। সেখানেই ঢুকে খেলতে গিয়েছিল দু’বছর বয়সের একটি শিশু। সেখান থেকেই সে সংক্রমিত হয়েছিল। তার পরে তার থেকে ছড়িয়ে পড়ে এই মারণ অসুখ।