
শেষ আপডেট: 6 June 2023 15:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভেসে যাচ্ছিল বিলাসী ক্রুজ। বৈভবের জমক চলকে পড়ছিল সেই প্রমোদতরী থেকে। মুম্বই থেকে রওনা দেওয়া সেই প্রমোদতরীর গন্তব্য গোয়া। ঢেউ ভেঙে ভেঙে এগোচ্ছে প্রমোদতরী। কিন্তু তা যে এমন সমুদ্রমন্থন ঘটাবে কে জানত।
২০২১ সাল। মুম্বই থেকে গোয়াগামী ওই প্রমোদতরী থেকেই মাদক মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছিল শাহরুখ খানের ছেলে আরিয়ান-সহ তাঁর ছ’জন বন্ধুবান্ধবকে। সেই অপারেশনের হোতা ছিলেন নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরোর তৎকালীন মুম্বইয়ের ডিরেক্টর সমীর ওয়াংখেড়ে। আরিয়ান সেই মামলায় বেকসুর খালাস পেয়েছেন। তাঁর কাছে মাদক ছিল বা তাঁরা নিষিদ্ধ মাদক নিচ্ছিলেন—এরকম কোনও প্রমাণ মেলেনি। উল্টে যেটা হয়েছে সেটা হল, সমীর ওয়াংখেড়ের বিরুদ্ধে এখন সিবিআই তদন্ত শুরু হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ, আরিয়ানকে এনসিবি হেফাজতে রাখার সময়ে শাহরুখের কাছে তিনি ২৫ কোটি টাকা ঘুষ চেয়েছিলেন। এ হেন পরিস্থিতিতে যখন সমীরকে এনসিবি থেকে সরিয়ে চেন্নাইয়ে রেভিনিউ ইন্টালিজেন্সে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে তখন দেখা যাচ্ছে এই আইপিএসের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ওতপ্রোত যোগ রয়েছে।
সমীরের বেড়ে ওঠা ও কেরিয়ার
বাবা ছিলেন পুলিশ কর্তা। মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ রিজিওনের ওয়াশিম জেলার ভূমিপুত্র সমীর। তবে তাঁর পড়াশোনা মুম্বইতেই। কারণ বাবা কর্মসূত্রে বাণিজ্যনগরীতেই কর্মরত ছিলেন। সমীর ও তাঁর বোনের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়—সবই মুম্বই কেন্দ্রিক।
২০০৬ সালে অন্ধ্রপ্রদেশে সেন্ট্রাল আইবি-র চাকরিতে যোগ দেন সমীর। তারপর ২০০৮ সালে তিনি সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। মারাঠি অভিনেত্রী ক্রান্তি রেডকরের সঙ্গে বিয়ে হয় সমীরের। তাঁদের যমজ দুই মেয়ে রয়েছে।
মাদক মামলা, সেলিব্রেটি ও সমীর ওয়াংখেড়ে
মাদক মামলায় সেলেব্রিটিদের যোগ খুঁজে পাওয়া, তাঁদের গ্রেফতার করায় গত কয়েক বছরে কার্যত মাইলফলক তৈরি করেছেন সমীর। অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর মাদকের বিষয়টি বড় করে উঠে এসেছিল। সেই তদন্তভার ছিল এনসিবি কর্তা সমীর ওয়াংখেড়ের কাঁধেই। তাতেই সুশান্তের বান্ধবী রিয়া চক্রবর্তী ও তাঁর ভাই শৌভিককে গ্রেফতার করেছিলেন ওয়াশিমের ছেলে সমীর।
আরিয়ানের আগে কমেডিয়ান ভারতী সিং ও তাঁর স্বামী হর্ষ লিম্বাচিয়াকেও গাঁজা কেসে গ্রেফতার করেছিলেন এই সমীর ওয়াংখেড়েই। তারপর আসে আরিয়ান পর্ব। মজার বিষয় হল, এই কোনও ক্ষেত্রেই ধৃতদের বেশি দিন আটকে রাখা যায়নি। প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাস হয়ে যান সবাই।
সমীর সম্পর্কে প্রথম মুখ খুলেছিলেন নবাব মালিক
এখন তিনি জেলবন্দি। কিন্তু আরিয়ান কাণ্ডে যখন মারাঠা মুলুক উত্তাল, বলিউড আন্দোলিত তখন প্রবীণ এনসিপি নেতা তথা শরদ পাওয়ারের বিশ্বস্ত নেতা নবাব মালিক রোজ নিয়ম করে বলতেন—এই লোকটা টাকা তোলার জন্য বেছে বেছে বড় লোকের ছেলেমেয়ে ও তাঁদের আত্মীয়দের মিথ্যা মামলায় ফাঁসায়। আসল উদ্দেশ্য টাকা লোটা। আজ যখন সমীরের বিরুদ্ধে সিবিআই তদন্ত শুরু হয়েছে তখন অনেকেই বলেন, নবাব সেদিন এটাই বলেছিলেন।
নিজের এলাকায় নায়ক সমীর
গত দীপাবলিতে ওয়াশিম জেলার সংবাদপত্রের প্রথম পাতাজুড়ে ছাপা হয়েছিল সমীর ওয়াংখেড়ে ও তাঁর স্ত্রীর ছবি। না কোনও প্রতিবেদন নয়। সেটা ছিল বিজ্ঞাপন। সমীর নিজেই দিয়েছিলেন। জেলার মানুষকে দীপাবলির শুভেচ্ছা জানাতে।
এক কংগ্রেস নেতা তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, ‘সমীরদাদা আমাদের এখানে আইকন। সবাই এখানে সমীরদাদার মতো হতে চায়।’ যাঁরা সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষায় অংশ নিতে চান, তাঁদের বইপত্র কিনে দেওয়া, কোচিং দেওয়ানোর ব্যবস্থা করা সমীর ওয়াংখেড়ের রুটিন।
সমীরের সঙ্ঘ যোগ
বছরে একবার নাগপুরে আরএসএস সদর দফতরে যাওয়া তাঁর রুটিন। আরএসএস ঘনিষ্ঠ মহারাষ্ট্রের রাজ্যপাল ভগৎ সিং কোশিয়ারিও সন্তান স্নেহে দেখেন সমীর ওয়াংখেড়েকে। বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তরফে সমীর পুরস্কৃত হয়েছেন। কখনও সমীরের হাতে স্মারক তুলে দিয়েছেন ভগৎ সিং কোশিয়ারি কখনও কেন্দ্রের মন্ত্রী রামদাস আটোয়ালে।
এ হেন সমীর এখন সিবিআইয়ের আতস কাচের তলায়। কী হয় তাঁর ভবিষ্যৎ এখন সেটাই দেখার।
একশ দিনের অস্বস্তি, আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যাবে না, বললেন জয়রাম