
শেষ আপডেট: 6 May 2023 08:24
নরেন্দ্র মোদী সরকারের বর্তমান বিদেশি মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর হলেন ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাট। ভারতের বিদেশ সচিব ছিলেন তিনি। বিদেশ মন্ত্রী হওয়ার পরেও তাঁর গায়ে যেন সেই জামাই পরা ছিল। শুক্রবার সন্ধেয় দেখা গেল, সেই জয়শঙ্কর শুধু কূটনীতিক নন, এখন পুরোদস্তুর ও খাঁটি রাজনীতিকও। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) এবং জয়শঙ্করের (S Jaishankar vs Bilawal Bhutto)নামে শুক্র সন্ধ্যা থেকেই জিন্দাবাদ ধ্বনিতে মুখরিত সোশ্যাল মিডিয়া।

অনেকের মতে, আহা কী বলেছেন, জয়শঙ্কর! পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রীকে ভারতে ডেকে কসিয়ে দিয়েছেন, একখানা…(S Jaishankar vs Bilawal Bhutto)। পাক বিদেশমন্ত্রী বিলাবল ভুট্টো (Bilawal Bhutto) গোয়া ছেড়ে উড়ে যাওয়ার আগে পষ্টাপষ্টি বলেছেন, “আরে উনি হলেন সন্ত্রাস শিল্পের সাফাই দেওয়ার মুখপাত্র!” (Jaishankar slams Pakistan)
বিলাবল ভুট্টো হলেন প্রয়াত প্রাক্তন পাক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো এবং প্রাক্তন পাক রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারির ছেলে। পাকিস্তান পিপলস পার্টির এই নেতা ভারতের বিরুদ্ধে চরম আগ্রাসী। কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্পর্ক বিলাবল তীব্র কটাক্ষ করার পর থেকেই নয়াদিল্লির রোষানলে পড়েছেন।
বিলাবল বলেছিলেন, “ওসামা বিন লাদেন মারা গিয়েছে, কিন্তু গুজরাতের কসাই বেঁচে আছে, তিনি এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী”। বিলাবলের এই কথার তীব্র আপত্তি জানিয়েছিল, ভারত। বলেছিল, পাকিস্তান হল সন্ত্রাসের আঁতুরঘর। আগে নিজেদের সামলাক ইসলামাবাদ”। সেই বিলাবল সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন তথা এসসিও বৈঠকে যোগ দিতে ভারতে এলে কী অপেক্ষা করছিল, তা প্রত্যাশিতই ছিল।
সাংহাই কো-অপারেশনের সদস্য দেশগুলি হল, ভারত, পাকিস্তান, রাশিয়া, চিন, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরঘিজস্তান ও কাজাকস্তান। ভারত ছিল আয়োজক দেশ। ফলে পাক বিদেশমন্ত্রীকে ভারতে আসতেই হয়েছে।
দেখা যায়, গোয়ায় এসসিও বৈঠকের আয়োজক দেশ তথা ভারতের বিদেশমন্ত্রী পাক বিদেশমন্ত্রীকে যখন স্বাগত জানিয়েছিলেন, তখন করমর্দনও করেননি। দূর থেকে নমস্কার জানিয়েছিলেন। তাতেই বোঝা গিয়েছিল নয়াদিল্লি-ইসলামাবাদ দূরত্ব এখন কতটা। আসলে রাজনীতিতে শরীরের ভাষা খুব খুব গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রনেতাদের পারস্পরিক করমর্দন, কাঁধে হাত রাখা, জড়িয়ে ধরা বা আলিঙ্গন করার মধ্যে দিয়ে বোঝা যায় দু’দেশের মধ্যে সম্পর্কের মাত্রা কেমন। (Jaishankar slams Pakistan)
দুদিন ধরে সেই বৈঠক শেষ হতেই বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর সাংবাদিক বৈঠকে বলেছেন, “পাকিস্তানে বিদেশি মুদ্রা যেভাবে কমে আসছে তার চেয়েও দ্রুত গতিতে কমছে সন্ত্রাস দমনে তাদের সদিচ্ছা। কেউ ওদের বিশ্বাস করে না। কারণ ওরাই সারা দুনিয়ায় এই ধারণা তৈরি করে দিয়েছে যে, সন্ত্রাসবাদ শেষ হোক তা চায় না”। বিলাবল ভারতে আসার আগেই নয়াদিল্লি জানিয়েছিল যে পাক বিদেশমন্ত্রীকে আলাদা করে তোয়াজ করা হবে না। সেটাই হাতে নাতে দেখিয়েছেন জয়শঙ্কর।

বিলাবল পাকিস্তানের খানদানি পরিবারের ছেলে। যেমন ভারতের রাহুল গান্ধী। তাঁর দাদু ছিলেন পাক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো। প্রথমে ইসলামাবাদে পরে দুবাইতে ও তার পর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন। কূটনীতিকরা মনে করছেন, আসলে বিলাবল পুরোটাই রাজনীতি করছেন। মোদীর উদ্দেশে খারাপ কথা বলার নেপথ্যে তাঁর ষোলো রাজনীতি রয়েছে। কারণ, ওটাই তাঁর জিয়নকাঠি। এর মাধ্যমে উগ্র জাতীয়বাদের হাওয়া তাঁর পিপলস পার্টির দিকে টানতে সচেষ্ট বিলাবল। ১৯৬৫ সালে এই বিলাবলের দাদু জুলফিকার আলি ভুট্টো রাষ্ট্রপুঞ্জে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ভারতের বিরুদ্ধে হাজার বছর ধরে যুদ্ধ করবে পাকিস্তান। ভুটো সাহেবের সে কথার পিছনে যেমন উগ্র জাতীয়তাবাদের কেমিস্ট্রি ছিল, তেমনই তাঁর যোগ্য উত্তরসূরী হতে চাইছেন বিলাবল।
আবার এটাই জয়শঙ্কর তথা ভারতের বর্তমান শাসক দলের জন্যও ইতিবাচক। বিলাবল সম্পর্কে চড়া মন্তব্য করে (S Jaishankar vs Bilawal Bhutto) ভারতে উগ্র জাতীয়তাবাদের হাওয়া নিজেদের দিকে টানতে চাইছে বিজেপি সরকার। কারণ, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও স্বাভিমানের বিষয়টি এমনই যে সব সময়ে রাজনৈতিক রসায়নে ভাল ফল দিয়েছে। ডান পন্থী রাজনীতিকদের এটা একটা বড় অস্ত্র। অতীতে পাকিস্তানকে পরাস্ত করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে মা দুর্গার মর্যাদা পেয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। মুম্বই সন্ত্রাসের পর ভারতের তৎকালীন বিদেশ মন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় লাগাতার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শব্দ বাণ ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চেয়েছিলেন। পরে তিনি বলেছিলেন, পাকিস্তানকে শায়েস্তা করতে ক্ষেপনাস্ত্র দরকার নেই, কতগুলি শব্দই যথেষ্ট। এবার জয়শঙ্কররাও তাই করছেন (Jaishankar slams Pakistan)।
ইসলামাবাদ ও নয়াদিল্লির এই পরস্পর বিরোধী কূটনীতির মাঝে ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে বাজপেয়ী-মনমোহন ঘরানার কূটনীতি। যাঁরা বলেছিলেন, বন্ধুত্ব এমন করতে হবে যাতে সীমান্তই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। কারণ, পাকিস্তান ও ভারত প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকেই যাবে। শত চাইলেও তা বদল করা যাবে না। পাশাপাশি যখন থাকতেই হবে তখন বন্ধু হয়েই থাকা ভাল কিনা! কিন্তু ঘটনা হল, সেই কূটনীতি বর্তমান রাজনীতির কাছে অচল পয়সা। তাই লহৌর বাস যাত্রা ভেস্তে যায়। তাই মোহালির মাঠে ক্রিকেট পিচে বল পড়লেও শান্তির দরজা সহজে খোলে না। তাই বিলাবল ভুটো সংঘাতের সম্ভাবনা জেনেই সপাটে বলে দেন, যো ম্যায় আপকে সাথ করুঙ্গা ও আপ ভুলেঙ্গে নেহি…
‘সন্ত্রাস শিল্পের মুখপাত্র’, ভারতে আসা পাক মন্ত্রী ভুট্টকে বিঁধলেন মোদীর বিদেশমন্ত্রী