দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতীয় ফুটবলে কিছু কিছু বিদেশী কোচদের আগমন আশীর্বাদের মতো ছিল। চিরিচ মিলোভান থেকে জেরি পেসেকের মতো তারকা কোচদের মতোই আগমন ঘটেছিল রুস্তম আক্রামভের। যিনি ভারতীয় ফুটবলকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন। যাঁর কোচিংয়ে বহু তারকার জন্ম হয়েছিল। বাইচুং ভুটিয়া থেকে শুরু করে দীপেন্দু বিশ্বাস, কিংবা প্রয়াত কার্লটন চ্যাপম্যান থেকে বাসুদেব মন্ডলদের মতো বলপ্লেয়ারদের উত্থান ঘটেছিল তাঁর হাত ধরেই।
সেই নামী উজবেকিস্তানের কোচ আক্রামভ চলে গেলেন ৭৩ বছর বয়সে নিজ দেশে। গত বুধবার মারা গিয়েছেন, এতদিন পরে জানা গেল তাঁর মৃত্যুসংবাদ। সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন টুইট করে এ খবর জানিয়েছে।
আক্রামভ মানে ভারতীয় ফুটবলে অনেক ঘটনা। ১৯৯৫ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতীয় দলের কোচ ছিলেন। তার মধ্যে বহু উন্নতি ঘটেছে। তিনি ভারতের ক্রম তালিকা ফিফায় নিয়ে গিয়েছিলেন ৯৫-এ, যা এখনও রেকর্ড। আক্রামভ যখন ভারতে আসেন, সেইসময় অমল দত্তের ডায়মন্ড সিস্টেমের রমরমা চলছে। তিনি কলকাতায় শিবির করতে এসে মোহনবাগান মাঠে লিগের ম্যাচ দেখতে আসতেন। তিনি নিজে খেতেন ফাইভ ফিফটি ফাইভ সিগারেট। কিন্তু কলকাতার সাংবাদিকরা তাঁকে ছোট চারমিনার দিলেও তিনি তৃপ্তি ভরে সেটি খেতেন। তাঁর মধ্যে কোনও অহংবোধ ছিল না।
আক্রামভের কোচিংয়েই বাইচুংয়ের জাতীয় দলে উত্থান ঘটেছিল। তিনি দীপেন্দু বিশ্বাস, বাসুদেব মন্ডলদের কাছে পরম শ্রদ্ধেয় ছিলেন। দীপেন্দু রবিবার সন্ধ্যায় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগবিহ্ববল। বলছিলেন, ‘‘আক্রামভ স্যার আমাদের কাছে পূজনীয় ছিলেন। তিনি ফুটবলারদের নানারকম উপহার দিতেন। আমাকে যেমন বলেছিলেন, ইরাক ম্যাচে গোল করতে পারলে এক জোড়া বুট দেবেন। আমি সেই ম্যাচে গোল করতে তিনি হোটেলের ঘরে এসে আমাকে তুলে দিয়েছিলেন। আমি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম।’’
https://twitter.com/IndianFootball/status/1495271820937019394
আক্রামভ ভারতের সেই দলের ফুটবলারদের একেকজনের একেকরকম নাম দিয়েছিলেন। দীপেন্দুকে ডাকতেন মিনিস্টার বলে, যেহেতু দীপুর মামা কেরলের মন্ত্রী ছিলেন। বাসুদেবকে ডাকতেন ‘ম্যান্ডেলা’ বলে। প্রশান্ত চক্রবর্তীকে বলতেন ইতালিয়ার। বাসু বললেন, ‘‘আক্রামভ স্যারের মতো কোচের জন্যই ভারতীয় ফুটবলের উত্থান ঘটেছিল। তাঁকে আরও কয়েকবছর দরকার ছিল। কিন্তু তিনিও ছিলেন রাজনীতির শিকার।’’
আক্রমভ তাসখন্দ থেকে অনতিদূরে ইয়াঙ্গিবাজার শহরে ১৯৪৮ সালের ১১ আগস্ট জন্মেছিলেন। ১৯৭০ সালে তিনি ফুটবল কোচ হিসেবে উজবেক স্টেট ইনস্টিটিউট অফ ফিজিক্যাল কালচারের ফুটবল বিভাগ থেকে স্নাতক হন। এছাড়াও তিনি মস্কো ইনস্টিটিউট অফ ফিজিক্যাল কালচারে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন।
১৯৬৭-৭৩ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাঁর ফুটবল-জীবন। ১৯৭৪-এ তিনি কোচিং শুরু করেন। মস্কো সিএসকেএর যুব দলকে কোচিং করান তিনি। ৯০-এর দশকের গোড়ায় তিনি আলজেরিয়ার ইউএসএম আলজিয়ার্স ক্লাবে (১৯৯০-১৯৯১) কোচ ছিলেন এবং আলজেরিয়ান জাতীয় দলের কোচিং স্টাফ ছিলেন। আক্রমভ ফরাসি ফুটবল ক্লাব বোর্দোতে কোচিংকে আরও উন্নত করেছিলেন।
১৯৯২-এ উজবেকিস্তান দলের কোচ হিসেবে নিয়োগ হয়েছিলেন আক্রামভ। তাঁর কোচিংয়ে উজবেকিস্তানের জাতীয় দল সেন্ট্রাল এশিয়ান কাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ১৯৯৪ সালে উজবেকিস্তানের জাতীয় দল ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট জিতেছিল।
বছরের শেষে, জাপানের শহর হিরোশিমায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান সামার গেমসে, উজবেক দল ফাইনালে চিনকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়। আক্রামভ তাসখন্দ ‘পাখতাকোর’-এর কোচ ছিলেন। এক মরশুমের জন্য এই ক্লাবে কোচ হিসাবে কাজ করেছিলেন। উল্লেখ্য, এই ক্লাবে ফুটবলার হিসাবেও খেলেছিলেন তিনি।
১৯৯৫ সালে ভারতীয় জাতীয় ফুটবল দলের কোচ হওয়ার জন্য আমন্ত্রিত হন। আক্রামভ ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ভারতীয় জাতীয় দলের কোচ ছিলেন। এরপর উজবেকিস্তানে ফিরে আসেন। দীর্ঘদিন এএফকে-র টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেন।
১৯৯৫ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত ভারতীয় ফুটবল দলের দায়িত্বে ছিলেন রুস্তম। তাঁর অধীনেই প্রথম বার জাতীয় দলের হয়ে খেলেন কিংবদন্তি ফুটবলার বাইচুং। ১৯৯৫-এর মার্চে নেহরু কাপের সময় তিনি দায়িত্ব নেন। পরের বছর সেপ্টেম্বরে বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর অধীনেই ১৯৯৫ সালে সাফ গেমসে সোনা জেতে ভারত। সাফ কাপে রানার্স হয়।