দ্য ওয়াল ব্যুরো: আজীবন কংগ্রেস রাজনীতি করে এসেছেন যে মানুষটা, কীর্ণাহারের ব্রাহ্মণ সন্তান হয়েও যিনি বরাবর ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদের পক্ষে সওয়াল করেছেন, সোমবার সেই প্রণব মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণের পর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত একটি বড় বিবৃতি করে বসলেন। ভাগবত অকপটেই জানালেন, “সঙ্ঘের প্রতি ওঁর প্রেম ও সদ্ভাবের কারণে উনি আমাদের কাছে এক জন মার্গদর্শক ছিলেন।”
২০১৮ সালের ৭ জুন নাগপুরে সঙ্ঘের সদর দফতরে গিয়েছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। তখনও দেশের রাষ্ট্রপতি তিনি। তাঁর নাগপুর সফর নিয়ে তখন কম বিতর্ক হয়নি সর্বভারতীয় রাজনীতিতে। বিশেষ করে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির কুশীলবরা যারপরনাই সমালোচনা করেছিলেন প্রণববাবুর। এমনকি তাঁর মেয়ে তথা দিল্লি কংগ্রেসের তৎকালীন মুখপাত্র শর্মিষ্ঠা মুখোপাধ্যায়ও হতাশা প্রকাশ করেছিলেন।
বিপরীতে অত্যন্ত আহ্লাদিত ছিল গেরুয়া শিবির তথা বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবার। কারণ, জাতীয় রাজনীতিকে যে সঙ্ঘ পরিবারকে নিয়ে কংগ্রেস ও বামপন্থীরা বরাবর নেতিবাচক মন্তব্য করেন, এক প্রকার অস্পৃশ্য হিসেবে জ্ঞান করেন অনেকে, সেই আরএসএসের সদর দফতরে গিয়ে তাঁদের এক প্রকার স্বীকৃতি তথা লেজিটিমিসি দিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি। ঘরোয়া আলোচনায় পরে সাংবাদিকদের প্রণববাবু জানান, মোহন ভাগবত পরে তাঁকে একবার বলেছিলেন, "আপনার জন্য আমরা গোটা বিশ্বে যে এ বার প্রচার গেয়ে গেলাম, অতীতে কখনও তা হয়নি।"
প্রণববাবুর মৃত্যুর পর এদিন সঙ্ঘ প্রধান যে বিবৃতি দিয়েছেন, তাতেও পরিষ্কার তাঁর প্রতি কতটা কৃতজ্ঞ আরএসএস। বিবৃতিতে মোহন ভাগবত ও সহ কার্যবাহ সুরেশ জোশী লিখেছেন, “কুশল প্রশাসক, রাষ্ট্রহিতকে সর্বোপরি জ্ঞান করে, অস্পৃশ্যতার উর্ধ্বে সব দলের থেকে সম্মান পেয়ে, মিতভাষী, লোকপ্রিয় প্রণব মুখোপাধ্যায় আজ তাঁর জীবনযাত্রা শেষ করে পরম তত্ত্বে বিলীন হয়ে গিয়েছেন। ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে তৈরি হওয়া এই শূন্যতা পূরণ করা সহজ হবে না। ওঁর মৃত্যুতে সঙ্ঘের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল।"

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, সর্বভারতীয় রাজনীতিকে অনেকের ধারণা রয়েছে যে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সবরকম যোগ্যতা থাকলেও তিনি যে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি সে জন্য দশ নম্বর জনপথ তথা গান্ধী পরিবারই দায়ী। প্রণবের সঙ্গে আস্থার সম্পর্কের ঘাটতি ছিল সনিয়ার। সেই পরিস্থিতিতে কৌশলে প্রণববাবুর রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে আপন করে নেওয়ার হয়তো চেষ্টা রয়েছে সঙ্ঘ পরিবারের। তা ছাড়া ভুলে গেলে চলবে না, কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী সরকারের আমলেই ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন প্রণববাবু।
শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কে প্রণবের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো নয়, তাঁকে সেই পরম মর্যাদাও দিয়েছিলেন মোদী। হয়তো এর নেপথ্যে সঙ্ঘ পরিবারেরও দাবি ও আগ্রহ ছিল।