
শেষ আপডেট: 16 May 2023 16:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চলছে বিশাল শোভাযাত্রা। সামনে হুডখোলা গাড়িতে দাঁড়িয়ে প্রার্থী। পাশে দলের কেষ্টবিষ্টু, মেজ-সেজ নেতারা। বিস্তর জাঁকজমক, বাজছে খোল কর্তাল, ঢাক ঢোল। বা বিরাট জনসভা, পেল্লায় মঞ্চ, তাতে ঢালাও আরামের ব্যবস্থা, কাতারে কাতারে লোক এসেছে, তাদের জন্য মজুত বাস! ভোট আসা মানেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের (Regional Political Parties) এ’ এক চেনা দৃশ্য!
কখনও ভেবে দেখেছেন, এই যে এত বিশাল আয়োজন—এর টাকাটা (source of income) আসে কোথা থেকে?
এবার গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বিখ্যাত সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস’ বা ‘এডিআরের’ তরফে প্রকাশিত এক রিপোর্ট (ADR report) বলছে, এই টাকার উৎস বেশিরভাগটাই আদতে ‘অজানা’। এখনকার নিয়ম হচ্ছে, আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলকে কেউ ২০,০০০ টাকার কম টাকা দিলে সেটা প্রকাশ না করলেও চলে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া তাদের ‘ডোনেশন স্টেটমেন্ট’ এবং ‘অডিট রিপোর্ট’ বলছে, এই নিয়মের সুবাদে তাদের কাছে আসা এক বিরাট অঙ্কের টাকা ঠিক কোথা থেকে আসে, সে সম্পর্কে কোনও তথ্য নেই।

জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক দলগুলো যদিও তথ্যের অধিকার আইনের আওতায় এসেছে, কিন্তু তাতেও তারা এই নিয়ে পুরোপুরি স্বচ্ছতা বজায় রাখছে না। ফলে আরটিআই করা ছাড়া নাগরিকের কাছে তথ্য জানার কোনও উপাদানই মজুত নেই।
এডিআরের ২০২১-২২ অর্থবর্ষে বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের আয়ের উৎস বা ‘ফান্ডিং’ বিষয়ক রিপোর্ট বলছে, এই সময়ের মধ্যে ২৭-টি আঞ্চলিক দল যারা তাদের অডিট এবং ডোনেশন দুই রিপোর্টই নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছে, তাদের মোট আয়ের পরিমাণ ১১৬৫ কোটি টাকা। তার মধ্যে জ্ঞাত উৎস বা জানা উৎস থেকে আয় ১৪৫ কোটি টাকা, যা মোট আয়ের মাত্র ১৩%। এছাড়া অন্যান্য জ্ঞাত উৎস, যার মধ্যে পড়ছে সদস্যপদ, চাঁদা, ব্যাঙ্কের সুদ, বিভিন্ন পুস্তিকা থেকে প্রাপ্ত আয় ইত্যাদিতে আয়ের পরিমাণ ১৩২ কোটি টাকা, যা মোট আয়ের ১১%। বাকি প্রায় ৮৮৭ কোটি টাকার উৎসই একেবারে অজানা। অর্থাৎ মোট আয়ের প্রায় ৭৬%-ই আদতে কোথা থেকে আসছে সেই নিয়ে দলগুলি নীরব।

জাতীয় দলগুলোর ক্ষেত্রেও অবস্থা বিশেষ সুবিধের নয়। ২০২১-২২ অর্থবর্ষে জাতীয় দলগুলোর মোট আয়ের ৬৬% এসেছে অজ্ঞাত উৎস থেকে।
এই ২৭ আঞ্চলিক দলের মধ্যে রয়েছে ওড়িশার বিজেডি, তামিলনাড়ুর এআইএডিএমকে, সমাজবাদী পার্টি, রাষ্ট্রীয় লোক দল বা আরজেডি, জেডি(ইউ), জেডি(এস), অকালি দল, টিআরএস, তেলুগু দেশম পার্টি। উল্লেখ্য, এই তালিকায় আছে আম আদমি পার্টিও। কিন্তু আপের স্টেটমেন্ট পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, তাদের স্টেটমেন্ট আর টাকার অঙ্কে গরমিল হচ্ছে। ফলে আপকে ধরা হয়নি।

এই তালিকায় তিনটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম উত্তর-পূর্বের নাগা পিপলস ফ্রন্ট, মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা এবং তামিলনাড়ুর ডিএমকে। তারা ২০,০০০ টাকার নিচের অঙ্কেরও উৎস দেখিয়েছে। স্টেটমেন্টেও কোনও ভুল ধরা পড়েনি।

এই যে ৮৮৭ কোটি টাকা যা অজানা উৎস থেকে এসেছে, তার আবার ৯৩% এসেছে ‘ইলেক্টোরাল বন্ড’ বা নির্বাচনী ঋণপত্র থেকে। কাকে বলে এই ইলেক্টোরাল বন্ড? বস্তুত, এও এক নতুন ‘স্কিম’ যা সামনে এসেছে ২০১৮ সালে। এই বন্ড হল আদতে একধরণের ঋণপত্র, যা সাধারণ নাগরিকরা নাম গোপন রেখে ব্যাঙ্ক থেকে কিনে নিতে পারেন। রাজনৈতিক দলগুলো সেই টাকা পরে ব্যাঙ্ক থেকে তুলতে পারে। বর্তমান আইনে ভারতীয় স্টেট ব্যাঙ্ক এক এবং একমাত্র এই বন্ড বিক্রি করতে পারে। বছরের চারটি ত্রৈমাসিকের শুরুতে, অর্থাৎ জানুয়ারি, এপ্রিল, জুলাই এবং অক্টোবরের শুরুতে দশ দিনের জন্য এই বন্ড বিক্রি হয়। ১ হাজার, ১০ হাজার, ১ লক্ষ, ১০ লক্ষ ও ১ কোটি—এইরকম মূল্যে তা বিক্রি হয়।

এডিআরের ওয়েবসাইট বলছে, এক আরটিআই প্রশ্নের উত্তরে স্টেট ব্যাঙ্ক জানিয়েছে, বেশিরভাগ বন্ড বিক্রি হয়েছে ভারতের চারটি শহরের এসবিআই শাখায়। তার তিনটি—মুম্বই, হায়দরাবাদ, কলকাতা। আর সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৬২% বন্ড বিক্রি হয়েছে নয়াদিল্লি শাখায়।
রিপোর্টের শেষে এডিআর প্রস্তাব দিয়েছে, এইভাবে উৎস গোপন রেখে আয় গণতন্ত্রের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক। প্রতিটি দান বা আয়ের ক্ষেত্রেই উৎস প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা উচিত। পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশে, যেমন জার্মানি, ফ্রান্স, জাপান, আমেরিকা এমনকি পড়শি নেপাল বা ভুটানেও এই নিয়ম রয়েছে। কিন্তু ভারতে নেই। অবিলম্বে পরিস্থিতির বদল ঘটানো উচিত। এমনকি দরকার হলে প্রত্যেকটি স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের আয়ব্যয়ের হিসেব নিয়ে নির্বাচন কমিশন বা ভারতের কেন্দ্রীয় অডিট সংস্থা ‘কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল অফ ইন্ডিয়া’ বা সিএজির তরফে নিযুক্ত কোনও সংস্থাকে দিয়ে অডিট করানো উচিত।
বাবরির দিকেই গড়াচ্ছে জ্ঞানবাপীর ভবিষ্যত? বারাণসীর আদালতের নির্দেশ ঘিরে জল্পনা