
শোভন চট্টোপাধ্যায়।
শেষ আপডেট: 13 July 2024 11:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কথায় বলে দেওয়ালেরও কান আছে।
গোল পার্কে ফোর্ট লিজেন্ড বহুতলে বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে থাকেন শোভন চট্টোপাধ্যায়। আর থাকেন বৈশাখীর একমাত্র মেয়ে। কদিন আগে সেই ফ্ল্যাটে এক অতিথি আসেন। তিনি ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দূত। চার দেওয়ালের মধ্যে শোভন-বৈশাখীর সঙ্গে তাঁর কিছু কথা হয়। আর তা প্রথমে শুনতে পেয়ে যায় দ্য ওয়াল। এবং সেই খবর প্রকাশিত হতেই আন্দোলিত হয়ে ওঠে গোটা তৃণমূল।
কেন?
কারণ, ফোর্ট লিজেন্ডের সেই বৈঠক ছিল ইঙ্গিতবহ। শেষমেশ কী হবে এখনই বলা মুশকিল। তবে অনেকে মনে করছেন, শোভনের ঘর ওয়াপসির একটা অলিখিত দেওয়াল লিখনের ছবি ধরা পড়েছিল সেদিনের চিত্রনাট্যে।
প্রথম পর্ব শেষ হয়েছিল এভাবেই। এখন দ্বিতীয় পর্ব যেন আরও জমজমাট হয়ে উঠেছে। ‘দক্ষিণ কলকাতার’ আবহাওয়া বলছে, শোভনের ঘর ওয়াপসি আটকাতে এক বিরল ঐক্য তৈরি হয়েছে তৃণমূলে। যাঁরা এক, দুই করে পাল্টা যুক্তির বহুতল গড়তে শুরু করেছেন শোভনের বিরুদ্ধে। সেগুলি মোটামুটি এরকম—
এক, ‘ফিরহাদ হাকিম দলের সংখ্যালঘু মুখ। আগামী বছর কলকাতা পুরসভার ভোট। তার আগে ববিকে মেয়র পদ থেকে সরানো কি ঠিক হবে? সংখ্যালঘুদের মধ্যে কী বার্তা যাবে?’
ঘটনাচক্রে এসবের মধ্যে ববি হাকিমের একটি বক্তৃতা ভাইরাল হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, বেশ মৌলবাদী কথা বলছেন তিনি। আর তাতে উৎসাহের সঙ্গে হাততালি পড়ছে।
দুই, ‘বিজেপিতে গিয়ে শোভন-বৈশাখী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কেও সমালোচনা করেছিলেন। সেটা কি লোকে ভুলে গেছে?’
তিন, ‘শোভন বেহালা পূর্ব বিধানসভা আসন চাইছেন, বৈশাখী চাইছেন বেহালা পশ্চিম—এটা কি মানা যায়?’
শোভন-বৈশাখীর সঙ্গে কথা বলতে তাঁদের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন কুণাল ঘোষ। ঘর ওয়াপসির শর্ত হিসাবে শোভন-বৈশাখী বেহালার দুটি আসনই চেয়েছেন কিনা তা পরিষ্কার নয়। কিন্তু দলের মধ্যে অদ্ভূত ভাবে রটে গেছে যে তাঁরা দুটি আসনই চান। ঘটনা হল, তৃণমূলের এক নেত্রী তাঁর ছেলের জন্য বেহালার একটি আসনের আশায় রয়েছেন বলে খবর। তাই শোভনের ঘর ওয়াপসির খবর রটতেই তিনিও সিঁদুরে মেঘ দেখছেন বলেও দলের মধ্যে জল্পনা।
এ বিষয়ে বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ও দ্য ওয়ালকে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, কুণাল ঘোষ তাঁদের ফ্ল্যাটে গেলে আতিথেয়তা করা ছাড়া সেই চিত্রনাট্যে আর কোনও ভূমিকা ছিল না তাঁর। বৈশাখীর কথায়, “কোনও শর্তই দেওয়া হয়নি। বেহালা পূর্ব-পশ্চিম ইত্যাদিও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রটনা। আমার রাজনীতিতে আসা না আসার ব্যাপারে সেদিন কোনও আলোচনা হয়নি। এ নিয়ে আমার কোনও আগ্রহও নেই। তবে হ্যাঁ, আমি চাই শোভন রাজনীতিতে ফিরুক।”
চার, ‘কলকাতার মানুষ পরচর্চা ভালবাসে ঠিকই, কিন্তু পরকীয়া মেনে নেবে না। মহিলাদের মধ্যে ঘোর প্রতিক্রিয়া হতে পারে’।
এবং পাঁচ, ‘অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কি শোভনের ঘরওয়াপসি মেনে নেবেন?’
বলে রাখা ভাল, যাঁরা শোভনের ঘর ওয়াপসি আটকাতে চাইছেন, তাঁরা এগুলো সবই ঘরোয়া স্তরে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন। তৃণমূলের কেউই প্রকাশ্যে শোভনের ঘর ওয়াপসির সম্ভাবনা নিয়ে নেতিবাচক কথা বলেননি। মহানাগরিক ফিরহাদ হাকিম বলেছেন, “শোভন আমার বন্ধু। ও যদি দলে ফেরে তো ভাল কথা। আমিও চাইব ও দলে ফিরে আসুক। নিজের পরিবারের কাছেও ফিরে আসুক।”
ববির এই সাদামাটা কথার মধ্যেও প্যাঁচটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি শোভনের। সূত্রের মতে, ফোর্ট লিজেন্ডে বৈঠকের পর শোভন ও বৈশাখী দুজনেই উজ্জীবিত। তাঁরাও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা দেখছেন। এহেন পরিস্থিতিতে মহেন্দ্র সিং ধোনির মতো যেন হেলিকপ্টার শট খেলতে চাইছেন শোভনও। তিনি বলেছেন, আমার তৃণমূলে ফেরার কথা উঠলেই ববিদা আমার পরিবারের কথা তোলে। এখানে তো ব্যক্তিগত বিষয় আলোচনা হচ্ছে না। রাজনীতির কথা হচ্ছে। গত সাত বছরে কেউ তো আমাকে এসে বলেনি, শোভন তুমি তৃণমূলে ফিরে এসো।
শোভন সম্ভবত বোঝাতে চাইছেন যে তিনি দলে ফিরুন, সেটা দক্ষিণ কলকাতার নেতারা চাননি বলেই গত সাত বছরে তাঁকে কেউ সেই প্রস্তাব দেননি। বরং শোভনের বিদায়ের কারণে অনেকেরই খেলার মাঠের আয়তন বেড়েছে। এবার ফের মাঠ ছোট হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন তাঁরা।
সূত্রের খবর, আপাতত পরিস্থিতি এই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাকিটা জানেন একজনই। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দিদি মনে মনে কী ঠিক করে ফেলেছেন এখনও কেউই স্পষ্ট করে বুঝতে পারছেন না।